অর্ধকোটি টাকা দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য কষ্টসাধ্য হবে

ঢাকা : ভুল আইনে বিচারের কারণে আসামিকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়াটা রাষ্ট্রপক্ষের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ধর্ষণের এক মামলায় ১৫ বছর আগে ‘ভুল আইনে’ বিচার করায় ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার আব্দুল জলিলকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর বুধবার (২৫ মে) অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের রাষ্ট্রপক্ষের চিন্তা এই জায়গাতেই, রাষ্ট্রপক্ষকে ওই আসামিকে ৫০ লাখ টাকা দিতে বলা হয়েছে। এটা দেওয়া রাষ্ট্রপক্ষের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার হবে। এ ধরনের মামলায় এখানে রাষ্ট্রের কোনো ভুল নাই। কমপ্লেইন হয়েছে, বিচার হয়েছে ভুল করলে বিচারক করে থাকতে পারেন বা প্রসিকিউটর করে থাকতে পারেন। এটার জন্য আসামি অবশ্যই খালাস পাওয়ার যোগ্য এবং তাকে যদি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে জরিমানাটা তার প্রতি আরোপ করা উচিত মিথ্যা মামলা যে করেছে। মাহবুবে আলম বলেন, আমার মনে হয় রাষ্ট্রপক্ষের থেকে অন্য বিষয় না, শুধু অর্থদণ্ডটা রাষ্ট্রের উপর চাপানো হয়েছে। এক্ষেত্রে আপিল করা উচিত। কিন্তু রায়ে যে অন্যান্য পর্যবেক্ষণ আছে সেগুলো সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো বক্তব্য নেই।

২০০১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশীর পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে পরদিন চরফ্যাশন থানায় ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধারায় মামলা করা হয়। ওই মামলায় ভোলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইবুনাল ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট আবদুল জলিলকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আবদুল জলিল হাইকোর্টে জেল আপিল করেন। হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ওই আপিল মঞ্জুর করে জলিলের দণ্ডাদেশ বাতিল করে মামলাটি পুনঃবিচারের জন্য বিচারিক আদালতে পাঠান।

রায়ে আদালত বলেছেন, স্বীকৃত মতে অপরাধ সংগঠনের তারিখে আব্দুল জলিলের বয়স ছিল ১৬। তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত অনুযায়ী অভিযোগপত্র দাখিলের দিন আসামির বয়স ছিল ১৫ বছর। সংশ্লিষ্ট সময়ে কার্যকর শিশু আইন ১৯৭৪ এর ধারা ২(জি) অনুযায়ী ১৬ বছরের নিচের ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ কারণে দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি জলিল শিশু আইন ১৯৭৪ এর বিধান অনুযায়ী তার প্রকৃত বয়স নির্ধারণ পূর্বক বিচার প্রাপ্তির অধিকারী ছিল। কিন্তু তাকে তার এই অধিকার হতে বঞ্চিত করে সাধারণ আইনে তার বিচার সংগঠন করায় সে (জলিল) সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ প্রদত্ত আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার হতে বঞ্চিত হয়েছে। রায়ে আরও বলা হয়, ২০০১ সালে ১৩ নভেম্বর থেকে আজ অবধি (রায় ঘোষণার দিন) আব্দুল জলিলকে ১৪ বছর ধরে জেল হাজতে আটক রেখে তার জীবনের যে ক্ষতি করা হয়েছে, তা পূরণ হবে কীভাবে? বিচার কার্যক্রম চলাকালে আব্দুল জলিল জেল-হাজতে আটক থাকলে প্রসিকিউশন পক্ষ মামলার সাক্ষী আনতে ব্যর্থ হলে প্রতিটি ধার্য তারিখে সময় মঞ্জুরের প্রার্থনা করা হলে তা অবলীলায় মঞ্জুর করে দেওয়া হত।

ফৌজদারি কার্য্যবিধি আইন ১৮৯৮ অনুযায়ী এই মামলার প্রসিকিউটর হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র যেকোনো প্রকারে এর অধীনস্থ বিচারিক আদালত কিংবা ট্রাইব্যুনাল হতে অবিচার পূর্ণ রায় হাসিল করলে এর দায় থেকে রাষ্ট্রপক্ষ অব্যাহতি পাওয়ার যোগ্য নয়। ফলে জলিলকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে তার জীবনের দুঃখ ঘোচানার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ বাধ্য। রায়ে আদালত বলেন, এই আদালত মনে করে, রাষ্ট্রপক্ষ কর্তৃক আসামি আব্দুল জলিলকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করাই যুক্তিযুক্ত।

রায়ে বলা হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক অপরাধ সংগঠনের তারিখে আসামি নাবালক ছিল বলে বিশ্বাস করেননি। অভিযোগকারী এজহারে বলেছে আসামির বয়স ১৬। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে আসামির বয়স উল্লেখ করেছে ১৫। ২০০১ সালের ২৮ নভেম্বর অভিযোগপত্রটি বিচারিক আদালতে দাখিল করা হয়। এমনকি ভোলার জেলা ও দায়রা জজ ২০০২ সালের ২১ জানুয়ারি জলিলকে তার সামনে উপস্থিত পেয়ে নিশ্চিত হন জলিল একজন শিশু। ফলে তিনি আসামির বিচারের জন্য জুভেনাইল কোর্ট গঠন করেন।

জেলা ও দায়রা জজ আদালত কর্তৃক জুভেনাইল কোর্ট গঠন করার সত্ত্বেও চিলড্রেন অ্যাক্ট ৭৪ এর বিধান পরবর্তীতে প্রতিপালন করা হয়নি। পরে জুভেনাল কোর্টে নয়, বরং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলাটির বিচার করেছে ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এ বিভাগের আরও খবর

Comments are closed.