সিটিনিউজবিডি : বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ডায় অ্যামোনিয়া ফসফেট ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) বিস্ফোরিত অ্যামোনিয়া ট্যাংক ও ডিএপি প্ল্যান্ট দেখতে এসেছে ১২ সদস্যের চীনা প্রতিনিধি দল। ২০০৬ সালে চায়না কমপ্ল্যান্ট নামের চীনা প্রতিষ্ঠান ডিএপি প্ল্যান্টটি তৈরি করে দিয়েছিল।
রোববার (২৮ আগস্ট) সকাল সাড়ে আটটার দিকে চায়না কমপ্ল্যান্টের ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি কর্ণফুলীর দক্ষিণপাড়ে দুর্ঘটনাকবলিত ডিএপি প্ল্যান্টে আসেন। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন বিসিআইসির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও। রাত নয়টায় চট্টগ্রাম থেকে বিমান যোগে প্রতিনিধিদলটি ঢাকা যাওয়ার কথা রয়েছে।
ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) মোফাজ্জল হোসেন এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অমল কান্তি বড়ুয়া, সব বিভাগীয় প্রধানরা কারখানায় রয়েছেন। তবে কোনো তদন্ত টিম নেই।
২২ আগস্ট (সোমবার) রাতে ডিএপি-১ প্ল্যান্টের ৫০০ টন ধারণক্ষমতার একটি অ্যামোনিয়া রিজার্ভ ট্যাংক বিস্ফোরত হয়ে ৫০ ফুট দূরে উড়ে পড়ে। এ সময় অ্যামোনিয়া গ্যাসের বিষক্রিয়ায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ শ্বাসকষ্ট নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই গ্যাস বাতাসের ধাক্কায় কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কাঠগড়, ইপিজেড, হালিশহর এলাকায় চলে আসে এবং মানুষ শ্বাসকষ্টে ভোগেন। এ সময় আতঙ্কের শহরে পরিণত হয় চট্টগ্রাম। বিস্ফোরণের পরদিন ডিএপি কারখানার আশপাশের বেশ কিছু মাছচাষের ঘেরে প্রচুর মাছ মারা যায়। মাছচাষিদের দাবি, কয়েক কোটি টাকার মাছ মারা গেছে। গবাদিপশুসহ জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মো. বদরুল হুদা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার (২৩ আগস্ট) সকাল ১১টা থেকে রাত সাড়ে সাতটা পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সিনিয়র কেমিস্ট মো. কামরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি টিম কাজ করেছে। তারা ডিএপি কারখানার পূর্ব ও উত্তর পাশে যে দুটি পুকুরের মাছ মারা গেছে সেখান থেকে এবং কারখানার প্রধান নালার পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনা বুধবার অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম গবেষণাগারে বিশ্লেষণ করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কারখানার পূর্ব ও উত্তর পাশের পুকুরের পানির নমুনায় পিএইচ যথাক্রমে ৯ দশমিক ৯৪ এবং ৮ দশমিক ৫৪, যেখানে আদর্শমান ৬ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫। যা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ বহির্ভূত। দুটি পয়েন্টের পানির নমুনার ডিও যথাক্রমে ১ দশমিক ৩৯ এবং ৪, আদর্শ মান ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫। সিওডি যথাক্রমে ৩২৪ ও ২৬৪, আদর্শমান যেখানে ২০০ এর কম। যা পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ বহির্ভূত। তবে সংগৃহীত নমুনা পানির অন্য প্যারামিটার বিধিমালা অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, পরিবেশ অধিদপ্তর দুর্ঘটনাস্থল থেকে আনুমানিক ১৭০ মিটার উত্তর-পশ্চিমে হাই ভলিয়্যুম স্যাম্পলার স্থাপন করে বায়ুর নমুনা (অ্যামোনিয়া) সংগ্রহ করে। ওই নমুনা বিশ্লেষণ অনুযায়ী আট ঘণ্টার গড় অ্যামোনিয়া পাওয়া যায় ৯২ পিপিএম।
২৩ আগস্ট (মঙ্গলবার) বিসিসিআইসি চেয়ারম্যান কারখানা পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের জানান, দুর্ঘটনার কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, দায়দায়িত্ব নির্ধারণ, প্ল্যান্টের বাকি ট্যাংকগুলোর ঝুঁকি পরীক্ষা করে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার জন্যে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তিন দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট দেবে।
বিসিআইসির পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশল) আলী আক্কাসকে আহ্বায়ক ও সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবু তাহের ভূঁইয়াকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। এ ছাড়া কাফকোর সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ সাবের আলী, বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. একেএমএ কাদের, কাফকোর সাবেক সিওও শেখ শফি আহমেদ, বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের প্রধান ড. এমএএ শওকত চৌধুরী, সিইউএফএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বজলুর রহমান খানকে সদস্য করা হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি থাকবে কমিটিতে।
ওই দিন কারখানাটি পরিদর্শন করেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বিগ্রেডিয়ার আলী আহমদ খান, জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন প্রমুখ।
এ ছাড়া দুর্ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুর রশিদকে আহ্বায়ক এবং আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গৌতম বাড়ৈ ও কর্ণফুলী থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি পরিদর্শন টিম দুর্ঘটনাকবলিত স্থান পরিদর্শন করেছে।
২৪ আগস্ট বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।
বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিআইসি) প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালের ২৮ মার্চ পরিবেশগত ছাড়পত্র লাভ করে এবং ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত নবায়ন করা আছে। ডিএপিএফসিএলে বছরে ১ লাখ টনের বেশি ডিএপি সার উৎপাদন হয়।
