সকালের নাস্তা সেরে দৈনিক পত্রিকাটা হাতে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসলাম। আজকাল পত্রিকাগুলিতে ভালো খবর নজরে পড়েনা। জঙ্গিবাদ, জেএমবি, খুন, গুম ইত্যাদি লাল-কালো খবর। কাগজে ঐ একই মশল্লার নিত্য তরকারি। একটা খবরের শিরোনামে চোখ আটকে গেলো। ‘আদালতে মামলা। ঘুষের বিচার চাইতে থানায় গিয়ে ছাড়া পেলো ঘুষ দিয়ে’। অবাক হলাম না। কারন এই ঘটনা হামেশা সংঘটিত হলেও সংবাদ শিরোনাম খুব একটা হয়না। ঘুষ একটি অনৈতিক সামাজিক অপরাধ। ধর্মেও এটা কঠিন ভাবে নিষিদ্ধ। যেই সমাজে ঘুষের বিরুদ্ধে বিচার চাইতে থানায় গিয়ে উল্টা ঘুষ দিয়েই প্রানে বেঁচে আসতে হয়, সে সমাজে মানুষ কতটা অসহায় তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
এরকম সমাজ থেকে ঘুষ নির্মুল করতে কী পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় তা সমাজ বিজ্ঞানীদের ভেবে দেখা দরকার। আমার এক লেখক বন্ধু যৌবন থেকে নয় কৈশোর থেকে দেখছি, এমন অনেস্ট আমি আর দ্বিতীয়জন দেখিনি। হয়তো আছে, আমার নজরে পড়েনি। কাস্টমস আর পুলিশে যারা চাকুরি করে থাকেন, তাদের অধিকাংশরা বাড়ি-গাড়ি সহ নামে-বেনামে সম্পত্তির পাহাড় গড়ে থাকেন। কিন্তু আমার এই বন্ধুটি এমন একটি জায়গায় চাকুরি করেও বাকি দোকান থেকে সস্তা সিগারেট খান।
যার পাশের টেবিলের কলিগেরা পকেট ভর্তি টাকা বিদেশি সিগারেট, মদের বোতল আরও কতো কী নিয়ে ঘরে ফেরেন। আর তিনি বাসে করে যাতায়াত করেন। নিজের এফডিআর ভেঙ্গে অত্যান্ত সাদা-সিধা ভাবে মেয়ের বিয়ে দেন। বিয়েতে কারো কাছ থেকে কোন উপহার তিনি গ্রহন করেননি। অথচ তিনি ধর্ম-কর্মে উদাসীন। পৃথিবীতে কতো ধরনের লোক দেখা যায়। কেউ অর্থ বানাতে অনর্থ কর্ম করে থাকে। কেউ অনর্থ কর্ম থেকে দুরে থাকতে অর্থ পায়ে ঠেলে । এ গুলো দেখে আমি ভোরে উঠে ‘সুপ্রভাত’ বলতে পারিনা।
সরকার দরিদ্র মানুষের মাঝে ১০ টাকা দরে চাল বিক্রির কর্মসুচি আরম্ভ করেছে। এটা সরকারের দরিদ্র জনগোষ্ঠির প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু আমল ভালো হলেও সরকারি দলের লোকদের কথা-বার্তায় মনে হচ্ছে নিয়তে গড়মিল আছে। সরকারের কোন কোন মন্ত্রী-এমপি বলে বেড়াচ্ছেন -সরকার কথা রেখেছে। ১০ টাকা দরে চাল খাওয়াবে বলেছিল তা এখন খাওয়াচ্ছে। গরীবদের নিয়ে রাজনীতি সবসময় হয়েছে এখনো হচ্ছে এ আর এমন নতুন কী ?
পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানি নেতাদের মুখে স্লোগান শুনতাম -‘গরীবি হঠাও’। অর্থাৎ দারিদ্রতা দুর করো। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে দেখা যেতো গরীবি হঠাও নয়, গরীব হঠাও (দরিদ্র দুর করো) এর পুরো বন্দোবস্ত হয়ে যেত। সোজা কথায় ক্ষমতার আগে যা গরীবি হঠাও ছিল তা ক্ষমতার পরে হয়ে যায়-গরীব হঠাও। পটিয়ায় ১০ টাকা দরে চাল দিতে এসে দারিদ্রতা না দরিদ্রদেরকেই দুর করতে দেখা গেছে স্থানীয় যুবলীগ নেতার ভাইকে। ৩০ কেজির স্থলে ২০/২৫ কেজি করে চাল দিয়ে দরিদ্র মানুষদের দুর করে দিচ্ছিলেন বলে সংবাদে প্রকাশ।
চট্টগ্রামে একটা আঞ্চলিক প্রবাদ আছে-‘ফইর মারি বাইর হারি লন’ (ভিক্ষুককে প্রহার করে তার ভিক্ষার ঝুলি কেড়ে নেয়া)। জনপ্রিয় দল আওয়ামীলীগের এই কুলাঙ্গারেরা সরকারের ভাবমুর্তিতে গোবর লেপন পুর্বক আওয়ামীলীগের পুকুরে হাত ধৌত করছে। সরকার তার কথা রেখেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই বুঝলাম। কিন্তু ১০টাকা দরের চাল বিক্রির সাথে সাথে বাজারে চালের দাম বস্তা প্রতি দুই/তিনশ টাকা করে বেড়ে যাওয়ার মাজেজা তো আমাদের বোধগম্য হচ্ছেনা। আর ১০টাকা দরে শুধুমাত্র কিছু সংখ্যক লোককে চাল দেয়ার মধ্য দিয়ে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে বলে কী বিশ্বাস করতে বলেন ?
১০টাকা চাল দেয়ার প্রতিশ্রুতির কথা মানুষ ভুলে গিয়েছিল। এ যেন ‘ও পাগলি সাঁকো নাড়াইস না’র মত কথা’। রাজনীতিবিদদের শত দোষের মাঝে এটাও একটা দোষ’যে তারা সাধারন মানুষদেরকে বোকা মনে করে থাকেন। তাই নানা সময় নানা কথা বলে থাকেন। পরবর্তীতে এই কথাগুলিই একেকটা কৌতুকের জন্ম দেয়। একসময় চালের দাম বৃদ্ধিতে জনগণকে ভাতের বদলে আলু খেতে, কাঁঠাল খেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন সমসাময়িক সরকারের মুখপাত্ররা।
ওটা শুনে আমার এক লেখক বন্ধু রস করে বলেছিলেন- ‘লতা খেলাম, পাতা খেলাম, ভাতের সমান না। পরের মাকে মা ডাকলে মায়ের সমান না’। কিছু কিছু দায়িত্বশীল মন্ত্রী ‘বোগাস’ বলে তুড়ি মেরে সত্যিকে উড়িয়ে দেন। ‘রাবিশ’ বলে গালি দেন। আন্দোলন-ফান্দোলন করে কোন লাভ নেই বলে শাসিয়ে দেন। কেউ কেউ বলেন-গরু, ছাগল আর মানুষ চিনলেই গাড়ি চালাতে পারবে। এই ধরনের অনেক কথা যা প্রমান করে তাদের জ্ঞান ও মানসিকতা। এখন ১০টাকায় চাল বেচে সরকার সেই ভর্তুকি আওয়ামদের কাছ থেকে পুষে নিচ্ছে বললে কী ভুল বলা হবে ?
এই বুদ্ধি সরকারকে যারাই দিয়েছেন, তারা কোনোমতেই সরকারের হিতাকাঙ্ক্ষী হতে পারেনা। চট্টগ্রামের উন্নয়নের ভার নাকি প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নিয়েছেন। উন্নয়ন হচ্ছেও তবে পরিকল্পনায় দৈন্যতা ভাব থাকায় চট্টগ্রামের উন্নয়ন অগোছালো অগোছালো মনে হচ্ছে। রাস্তা ঘাটের করুন দশা। ওভার ব্রিজ আর ফ্লাই ওভারে সরকার বেশি মনোযোগী বলে রাস্তা-ঘাটের অবস্থা ছিন্ন-ভিন্ন। কিছু কিছু জায়গায় রাস্তার কাজ’যে হচ্ছেনা তা না। তবে খুবই ঢিমে-তালে। ছোট ছোট রাস্তা গুলোর সংস্কারের কাজ দেখা-শোনার জন্য কেউ আছেন বলে মনে হয়না। বিভিন্ন জায়গায় কংক্রিট এর পরিবর্তে শুধুমাত্র বালি দিয়ে ভরাট করে ফেলে রেখেছে দীর্ঘদিন।
তেমন একটি এলাকা দক্ষিন মধ্যম হালিশহরের মাইজ পাড়ার সড়কটি। দীর্ঘ ছয়মাসেও শেষ হয়নি ২০০ মিটারেরও কম লম্বা রাস্তাটি। চট্টগ্রাম মহানগরের সল্ট গোলা, নিমতলা,আগ্রাবাদ সহ পাহাড়তলি দেওয়ান হাট কোথাও রাস্তার অবস্থা ঠিক নেই। গাড়িতে বসলেই হাড়-গোড়ের মেরামত ভালোভাবেই হয়। জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। আর তখনি সমস্ত শরীরে উন্নয়নের সুখ অনুভুত হয়। এতো কিছুর পরও যারা বলেন- শুভসকাল’ সত্যি তাদের প্রশংসা করতে হয়। তারাই আসলে নিপাট ভদ্রলোক। শৈশবে পণ্ডিত স্যার পাঠশালায় পড়াতেন-‘ভদ্রলোক মার খায়, ধুলো মুছে বাড়ি যায়’। অথবা ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, আমি যেন সারাদিন ভালো হয়ে চলি’।
বাল্যশিক্ষার এই মন্ত্রটায় দীক্ষা নিয়ে সকালে বারবার আওড়ানোর পরও কী ভালো থাকা যায় ? পত্রিকা খুললেই চোখে পড়বে রক্তাক্ত বিকৃত মুখমন্ডলের ছবি। শিরোনামে দেখা যায়-‘ছেলের হাতে মা খুন’। বাবার হাতে ছেলে খুন। অজ্ঞাত নামা মৃত দেহ উদ্ধার। কলেজ ছাত্রীর শ্লীলতা হানি। গণ ধর্ষন ইত্যাদি অমানবিক শিরোনাম। তার ওপর অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, ছিনতাই’এর মতো অনাকাংখিত সব দুর্ঘটনা। এইসব দেখার পর মনে হয়না আমি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমার কোন স্বাধীনতা আছে। শুভসকাল বলতে পারিনা, যখন সকালে উঠে শুনি বিদ্যুৎ কিংবা গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হবে। বাজারে গিয়ে যখন দেখি নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মুল্যের উর্ধগতি। শুভসকাল বলতে পারিনা যখন দেখি রান্না করতে গিয়ে গ্যাস থাকেনা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ধরাশায়ী হই। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকি।
জোয়ারের পানিতে প্রতিদিন প্লাবিত হই, তখন আর শুভসকাল মুখ দিয়ে বের হয়না। তারপরও খানিকটা স্বস্তি পাই যখন শুনি চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বহস্তে নিয়েছেন। নতুবা আজকাল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির ঘুষ দুর্নীতির বদনামের দুর্গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে চারিদিকে প্রতিকুল পরিবেশ এর জন্ম দিয়েছে। তবুও সকালে ফেসবুক খুললে কিছু বন্ধুরা ধুমায়িত চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অভ্যাস মতে লিখে দেন- ‘ শুভ সকাল’।
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
