বাল্য বিয়ে বন্ধে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়

0

মো. দেলোয়ার হোসেন : বাল্য বিয়ে রুখতে হবে-প্রসবকালীন মৃত্যুহার কমিয়ে আনতে সরকারের প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। যৌতুক, বাল্য বিয়ে, প্রসবকালীন মৃত্যুহার কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরী। এ ব্যাপারে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, পেশাজীবী, ইমাম, পুরোহিতদের সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

বাল্য বিয়ের সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে। বাল্য বিবাহ যে ক্ষতিকর তা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং এটি বন্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে সরকারিভাবে। অল্প বয়সে কন্যা শিশুদের বিয়ে বন্ধ করা যেমন প্রয়োজন-তেমনি যাদের বিয়ে হয়ে গেছে তাদের অধিকার রক্ষা করাও দরকার। দেশে ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় অপরিণত অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সের আগে। যার মধ্যে শতকরা ২০ ভাগই মা হয়ে যায় ১৫ বছর বয়সের আগে। যারা শিক্ষা জীবন শেষ করতে পারলে সমাজের উন্নতিতে আরো অনেক বেশি অবদান রাখতে পারত।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এ তথ্য প্রকাশ করেছেন। এ পরিস্থিতিতে “বাল্য বিয়ে বন্ধ কর, কিশোরী মাতৃত্ব রোধ কর”-এ স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সবাইকে। বাল্য বিয়ের মূলে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা আর দারিদ্রতা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি বাল্য বিয়ের আরো একটি কারণ। জনসংখ্যা যত কম হবে, বাল্য বিয়ে তত কমে আসবে। যে কারণে বাল্য বিয়ে হচ্ছে, সে কারণ চিহ্নিত করে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। বাল্য বিয়ের কারণ হিসেবে দেখা যায়, পিতৃতান্ত্রিক, দৃষ্টিভঙ্গী, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র-অশিক্ষা ও যৌতুকের চাপ। বাল্য বিয়ে বন্ধে কঠোর আইন, সচেতনতা বৃদ্ধি, অভিভাবকদের সচেতন করা, গোপনে বাল্য বিয়ে খুঁজে বের করে শাস্তি প্রদান করলে বাল্য বিয়ে অনেক রোধ হবে।
দেশে বাল্য বিয়ে, শিশুশ্রম এবং বিদ্যালয় বহির্ভুত শিশু সংখ্যা কমানো না গেলে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুফল পাবে না। দেশে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর মধ্যে ২৩ ভাগ রয়েছে স্কুল শিক্ষার বাইরে। স্কুলে ঝরেপড়া সহ বাল্য বিয়ের হার কমলেও এ হার এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এক তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, প্রতি বছর বাংলাদেশে ২৩ হাজার “শিশু-মা” প্রসবকালীন সময় মারা যাচ্ছে। বাল্য বিয়ে, শিশুশ্রম, স্কুলে ঝরেপড়া বা ড্রপআউট শিশু বিষয়ে সচেতন করতে হবে সাধারণ মানুষকে। স্কুলে ঝরেপড়া শিশুদের হার কমিয়ে আনতে হবে। একই সাথে দারিদ্র দূরীকরণ, শিশুদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বৃদ্ধি, বাল্য বিয়ে রোধে সচেতনতাসহ দরিদ্র শিশু পরিবারের আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ডে গুরুত্ব দিতে হবে। বাল্য বিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধি। সভ্য সমাজে এটি কখনো কল্পনা করা যায় না।

এ থেকে মুক্তি পেতে প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একটি শিশু যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে দেশও শক্তিশালী হবে। শিশু যখন বিদ্যালয় যেতে পারে না, তখন বাল্য বিয়ের শিকার হয়। যখন তার বাল্য বিয়ে হয়, তখন সে গৃহ নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এভাবে একটি শিশুর সম্ভাবনা একেবারেই শেষ হয়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রতি তিনজনের একজন শিশুর ১৮ বছরের নিচে বিয়ে হয়। আর ১৫ বছরের নিচে শিশুর বিয়ে হয় ৯ জনের মধ্যে ১ জন শিশুর। এ চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এখন নতুন নতুন এবং ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ আসছে। এক্ষেত্রে একটি বিষয়ে অর্থাৎ বাল্য বিয়ের দিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত। কিশোর-কিশোরীরা যেন বিদ্যালয় বহির্ভুত না থাকে, বাল্য বিয়ের শিকার না হয়, শিশুশ্রমে নিয়োজিত না হয়।
এক তথ্য সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে আমাদের দেশে ৬৫ শতাংশ নারী, যাদের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়। এর মধ্যে সাড়ে ৩২ শতাংশ কিশোরী রয়েছে। যাদের বয়স ১৫ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২৯ শতাংশ নারী রয়েছে। যাদের ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয়েছে। বাল্য বিয়ের ফলে শিশুরা বাল্যকাল, শিশু অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাল্য বিয়ে রোধে মেয়েদের বিদ্যালয়ে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে। কমপক্ষে উচ্চ বিদ্যালয় পর্যন্ত যাওয়া। সে সাথে জীবন, দক্ষতা, উন্নয়নভিত্তিক শিক্ষা, স্টাইপিং নিশ্চিত করা, বাল্য বিয়ে সম্পর্কে শিশুদের পরিবার ও সমাজকে সচেতন করে গড়ে তোলা, বাল্য বিয়ের সাথে জড়িতদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য।

নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে অনেক আইন রয়েছে। মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর হলেও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের অজ্ঞতার কারণে এসব আইন বাস্তবায়ন হয় না। প্রাথমিক শিক্ষা বাংলাদেশে অর্জন উল্লেখযোগ্য। তা সত্ত্বেও ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী ৪০ লাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে। যাদের বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে ২০ লাখ শিশু স্কুলেই যায়নি, ১৯ লাখ শিশু তুলনামূলক বেশি বয়সে স্কুলে ভর্তি হয়েছে, ৪ লাখ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকে ঝরে পড়েছে। ঝরেপড়ার শিশুর সংখ্যা প্রায় সব জেলাতেই রয়েছে। দেশে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের পিড়িতে বসে ৭৩ শতাংশ মেয়ে, ছেলেদের হার ২.৮ শতাংশ।

ঝরেপড়া শিশুদের ব্যাপারে শিক্ষকেরা জানান, পিএসসি, জেএসসি, নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীরা ঝরেপড়ে। ঝরেপড়া শিক্ষার্থীরা গ্রামে-গঞ্জের বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে। নির্বাচনী পরীক্ষায় পাশ না করার পাশাপাশি পারিবারিক অসচ্ছলতা, দারিদ্র, নদী ভাঙ্গন, শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যত্র বদলী, শিশুশ্রম, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, মেয়েদের বাল্য বিয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের সিংহভাগ শিশুই স্কুলে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে যাওয়ার আগেই স্কুল থেকে অধিকাংশ বিদায় হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির পাশ করে আগে-পরে শিশুদের মধ্যে ছেলেরা পারিবারিক অভাব-অনটন, কন্যা শিশুরা ধর্মীয় অনুশাসনের নামে সামাজিক কুসংস্কারের ফলে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় না। যেসব শিশু পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চ বিদ্যালয়ে তারা অষ্টম শ্রেণির আগেই বিদ্যালয় থেকে বিদায় হওয়ার অন্যতম কারণ দরিদ্র শিশুরা পরিচর্যার অভাবে ভালোমত পড়াশুনা করতে পারে না।

ফলে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়। এছাড়া পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে ছেলে শিশুরা পরিবারের আর্থিক উপার্জনের জন্য নিজেরাই কাজে জড়িত হয়ে পড়ে। আর কন্যা শিশুরা অষ্টম শ্রেণি পার হওয়ার আগে বিয়ের পিড়িতে বসে। শহর অঞ্চলে ঝরেপড়ার হার কম হলেও, এর কারণ প্রায় একই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর সেব শিক্ষার্থীদের আর খুব একটা বিদ্যালয়মুখী হতে দেখা যায় না। অথচ এদের পড়াশুনার ব্যাপারে একটু যত্নবান হলেই তারাও অন্যদের মত ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হবে। ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় বিদ্যালয়মুখী করতে শিক্ষকেরা পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করলেও সন্তোষজনক ফলাফল আসে না বলে শিক্ষকদের অভিযোগ। কারও পারিবারিক অসচ্ছলতা, কেউ কেউ সন্তানের পড়াশুনায় ভালো ফলাফল না আসায় স্কুলের পরিবর্তে কর্মে নিয়োগে আগ্রহী হয়ে পড়ে। বাল্য বিয়ের কারণে এখন স্বামীর মার খেয়ে প্রতিদিন স্বামী দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী শিশুরা। নারী ক্ষমতায়নে বড় অন্তরায় বাল্য বিয়ে।
এ ধারা বন্ধে সামাজিক আন্দোলনের তাগিদ দিয়েছেন বিজ্ঞ মহল। বাল্য বিয়ের কারণে মাতৃ মৃত্যু, শিশু মৃত্যু, পারিবারিক নির্যাতন, বহু বিয়ে, নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটে। ফলে সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়। শিক্ষা ও দারিদ্রকে বাল্য বিয়ের প্রধান ২টি কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে এগুলো উত্তরণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপত্তার কারণেও অনেক সময় অভিভাবকের বাল্য বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। তাই এসব পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। গেটিং দ্যা এভিডেন্স এশিয়া চাইল্ড মেরিজ ইনিশিয়াটিভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের বাল্য বিয়ের হার বেশ উদ্বেগজনক। ইন্দোনেশিয়ায় ৩৮ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এর হার ৩.৭ শতাংশ। পাকিস্তানে বাল্য বিয়ের হার সর্বনি¤œ ৩৪.৮ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে, ১৫.২ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে হয়ে যায়। পাকিস্তানে ছেলেদের বাল্য বিয়ের হার ১৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে যায়। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের বিয়ে হয় ৭৩ শতাংশ মেয়ের। অন্যদিকে দেশে ২.৮ শতাংশ ছেলের বাল্য বিয়ে হয় মাত্র। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে একটি মডেল রাষ্ট্র।

কিন্তু এদেশে বাল্য বিয়ে লজ্জাজনক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে হিউমেন রাইটস ওয়াচ-এ জুলাইতে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গার্লস সামিট-এ বলেছিলেন-বাল্য বিয়ে পর্যায়ক্রমে কমিয়ে এনে একেবারে বন্ধ করার অঙ্গীকার করেন। ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। একই সালের মধ্যে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের ঘটনা এক তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনবেন। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে সমস্ত বাল্য বিয়ে বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছেন। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি এক সভায় বলেছিলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বাল্য বিয়ে নির্মূল করবে এবং দেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবে। বাল্য বিয়ে বন্ধে ২০১৬ সালের জন্য গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের সাথে কাজ করার জন্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। বাল্য বিয়ে বন্ধ এবং পথ শিশুদের পুনর্বাসন করা অত্যন্ত জরুরী। এ বিষয়টিকে অনুধাবন করে বর্তমান সরকার ২০১৬ সালে দেশের প্রত্যেক জেলায় ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এর তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে নাইজেরিয়ার পরে বাল্য বিয়ে সবচেয়ে বেশি হয় বাংলাদেশে। ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বাংলাদেশী নারীদের মধ্যে ৭৪ ভাগের বিয়ে হয় ১৮ বছর আগে। যদিও নারীদের ন্যূনতম বৈধ বিয়ের বয়স হচ্ছে ১৮ বছর। শিশু বিবাহ, নারীর প্রতি বৈষম্য, নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ৬৮ শতাংশ মেয়ে শিশু বিয়ের শিকার, মেয়েদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ বিবাহ। পরবর্তীতে তারা লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে। অবশিষ্টাংশ লেখাপড়ার কাজ চুপিয়ে দিয়ে শিশু মায়ে পরিনত হয়। তারা সংসারের বোঝা বইতে না পেরে নানাবিধ রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। এমনকি এক সময় সন্তান জন্মদানকালে মারা যায়, রুগ্ন, স্বাস্থ্যহীন হয় এবং পুষ্টিহীন শিশুর জন্ম দেয়। ফলে তাদের একদিকে নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ, অন্যদিকে সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রাপ্তি থেকে জাতিকে বঞ্চিত করা হয়।

বাল্য বিয়ের ফলে কন্যা শিশু অল্প বয়সে গর্ভধারণ করে। ফলে প্রসবকালীন জটিলতা সহ গর্ভপাত, মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যু বৃদ্ধি পায়। কিশোরী মায়েরা অপুষ্টিতে ভোগে, অপুষ্টি শিশুর জন্ম দেয়, তারা সন্তানের সঠিক লালন-পালন করতে পারে না। এসব অল্প বয়স্ক মায়ের ফিষ্টুলা, যৌন রোগ, জরায়ুর মুখে ক্যান্সার, এইচআইভ রোগে আক্রান্ত হওয়ারও ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়ের ফিষ্টুলার মত ভয়াবহ অসুখ হয়ে থাকে। তখন পরিবারের আপনজনেরা কেউ কাছে আসতে চায় না। শুরু হয় এক অভিশপ্ত জীবন। বাল্য বিবাহ নারী উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করছে। বাল্য বিয়ের ফলে একটি শিশু মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। একই সঙ্গে সে আত্মশক্তি হারিয়ে ফেলে। সরকারিভাবে বাল্য বিয়ে সংক্রান্তে সঠিক তথ্য না থাকায় অনেক সময় প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হয়। বাল্য বিয়ের কুফল সমাজে নীতিবাচক অবস্থায় পড়ে আছে।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএ এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মেয়েদের বিয়ে হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। কিশোরী বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এক নম্বরে। আর সারা বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তিন নম্বরে। ফলে এদেশে প্রতি ১০ জন নারীর অন্ততঃ একজন ১৫ বছরে পৌছার আগে মা হচ্ছে। ফলে বদলে যাচ্ছে এসব কিশোরীর জীবন। গর্ভকালীন জটিলতায় মাতৃ মৃত্যুর হারও কিশোরীদের মাঝে বেশী। এ হার প্রাপ্ত বয়স্ক নারীদের চাইতে দ্বিগুন। কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ করলে মায়ের শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ না হওয়ার কারণে সন্তান প্রসবের সময় অনেক সময় মাথা আটকে যায়। এতে মা ও শিশু দু’জনই ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

ফিষ্টুলারের মত দীর্গস্থায়ী অসুখও দেখা যায় মায়ের। বাংলাদেশে এ সমস্যার কারণ হিসেবে রয়েছে আর্থসামাজিক অবস্থা। এ ধরনের প্রবণতা দরিদ্র জনগোষ্ঠির মধ্যে বেশি প্রবল। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। ধর্মীয় কারণে মাঝে মাঝে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয় পরিবার। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কথা নেই। সব সংসারেই কন্যা শিশুর জন্ম এক নিরানন্দের বিষয়। এমন বাস্তবতার মধ্যে “শিক্ষা, পুষ্টি নিশ্চিত করি, শিশু বিয়ে বন্ধ করি”-প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে প্রতি বছর পালিত কন্যা শিশু দিবস। সংস্থাটির বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কিশোরী বয়সে বিয়ে আর গর্ভধারণের কারণে শারীরিক ও সামাজিক সমস্যার মুখে পড়তে হয় মেয়েদের।
২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে বাল্য বিয়ে বন্ধ করতে হবে। সরকার শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং শিশুর প্রতি সব রকমের সহিংসতা প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক। এ জন্য শিশু রাজন ও রাকিব হত্যার বিচার দ্রুত সময়ে সম্পন্ন হয়েছে। বাল্য বিয়ে নির্মুলে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য ন্যায় বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রাষ্ট্র যেন তার প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে কাজ করতে হবে। যারা শিশু নির্যাতন করে, তাদের দেশীয় আইনে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। তাদের বাবা-মাকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.