সংগীতের বটবৃক্ষ হাসিনা জাকারিয়া বেলা

0

আবছার উদ্দিন অলি : যাকে নিয়ে আজকের এই লেখা তিনি অজানা এক নিভৃতচারী প্রচার বিমুখ অন্তরালে থাকা মানুষ। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময় থেকে যার বহুমাত্রিক কর্মের ব্যাপকতা, বিভিন্ন মাধ্যমে কাজের বিশালতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে। সবমিলিয়ে যাকে করে তুলেছে একেবারেই ব্যতিক্রমী অনবদ্য মানুষ। হ্যাঁ বলছিলাম প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলা’র কথা। স্বপ্ন যেমন সবার সত্যি হয়না, তেমনি এ সমাজে সবাই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি নিয়েও জন্মায় না। ভাগ্য- সৌভাগ্য, স্বপ্ন, সফলতা-সাফল্য, সম্মান-মর্যাদা যা কিছু বলিনা কেন সব কিছুই পেয়েছেন এই একজন হাসিনা জাকারিয়া বেলা যাকে সবাই চেনেন বেলা ইসলাম নামে। “সংগীত হল এক ঐশ্বরিক বিষয়। এর সাথে রয়েছে মানুষের আত্মিক বন্ধন। তাকে পেতে হলে চাই আজীবন সাধনা, একাগ্রতা, অনুশীলন, পরিশুদ্ধ মন আর সংগীতের বেদীতে নিজেকে সমর্পণ”—- এ কথাগুলো বলেন এমনই এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তি যিনি তার নিরন্তর প্রচেষ্টায় আর কর্মে আমাদের আজকের প্রজন্মের জন্য পথ চলার জায়গাটি তৈরী করে দিয়েছেন। চার দশকের কাছাকাছি সংগীতের পাশাপাশি শিক্ষার এক ভুবনচারী, প্রচার-প্রাচুর্য-স্বীকৃতির মোহমুক্ত এক নীরব কর্মী সংকল্পের দৃঢ়তায় পথের মাঝে কর্মী পথের সন্ধান করে বেড়িয়েছেন। সেই তিনি এক নিভৃতচারী সুরের সাধক, বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলা যিনি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে করেছেন আলোকিত ও সমৃদ্ধ।

বেলা জন্মেছেন একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে যেখানে শিক্ষা-সংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা আর অসা¤প্রদায়িক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। পিতার কর্মস্থল রাজশাহীতে তাঁর জন্ম, ১৯৪৯ এর জুলাইয়ে, বেড়ে উঠেছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং সর্বশেষ নিবাস তার প্রিয় চট্টগ্রামে। পিতামহ ছিলেন ১৮৮৯ সনে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের ইন্সপেক্টর অব স্কুলস। মাতামহ ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী ছাত্র, তৎকালীন আসাম সরকারের পুলিশ বিভাগের এস.আই. হিসেবে ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে কর্মরত। একজন সৌখিন গাইয়ে হিসেবেও পরিচিতি ছিল তাঁর। পিতা মরহুম রফিকুল ইসলাম কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক উত্তীর্ণ, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও সু-পরিচিত ক্রীড়াবিদ। মাতা বেগম আজিজা খাতুন একজন প্রবীণ লেখিকা, সংস্কৃতিমনা সমাজসেবী। বড় ভাই খ্যাতিমান বংশিবাদক উস্তাদ আজিজুল ইসলাম। ছোট বোনেরা সৌখিন গাইয়ে। স্বামী ক্যাপ্টেন এম. জাকারিয়া, অবসরপ্রাপ্ত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা ও সংগীত অনুরাগী। ছাত্রী হিসেবে বেলা বহু পরীক্ষায় শীর্ষতম স্থান দখল করেছেন এবং সাংস্কৃতিক জগতে একজন প্রথিতযশা শিল্পী হিসেবেও সুরের ছোঁয়ায় অগণিত সংগীত পিপাসুদের করেছেন বিমোহিত। শিক্ষা ও সংগীত জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন ঢাকা ও দেশের বাইরে।

পারিবারিক পরিমন্ডলে তার সঙ্গীতের হাতেখড়ি। একেবারেই পাঁচ ছয় বছর বয়স থেকে তালিম শুরু। সংগীত শিক্ষক সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজেন্দ্র কর্মকার (রাজশাহী), জতিন্দ্র বাবু (পাবনা), সুখেন্দ্র চক্রবর্তী (চট্টগ্রাম) এবং পরে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে আগ্রা ঘরানার বিখ্যাত উস্তাদ বেলায়েত আলী খানের কাছে শীষ্যত্ব গ্রহণ করে নিয়মিত শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেওয়া শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, মাত্র সাত বছর বয়সে পিতার সরকারি কর্মস্থল পাবনার বনমালি ইনস্টিটিউটে প্রথম মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন, দেশবরেণ্য অনেক শিল্পীদের উপস্থিতিতে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালিন সময়ে অনেক প্রতিথযশা শিক্ষকদের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত ছাড়াও বিভিন্ন ধারার সংগীতে তালিম নেন। বিশেষত ওস্তাদ কাদের জামেরী (গজল, ঠুমরী, টপ্পা), শেখ লুৎফুর রহমান (নজরুলগীতি ও গণসংগীত) এবং তৎকালীন বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম ধারক শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হকের কাছে (রাগাশ্রিত রবীন্দ্র সংগীত ও টপ্পা)। তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ‘ট্যালেন্ট ফাইন্ডিং টিম-এর মনোনয়ন সর্বপ্রথম ঢাকা বেতার থেকে ১৯৬২ সনে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করেন। চট্টগ্রাম বেতার স্থাপিত হওয়ার পরপরই একক কন্ঠশিল্পী হিসেবে উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করেন। ১৯৬৬ সনে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান সংগীত সম্মেলনে উপমহাদেশের শীর্ষ সংগীতজ্ঞদের সাথে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৬৭ সনে রেডিও পাকিস্তান করাচীর দুরপ্রাচ্য ও আভ্যন্তরীন সার্ভিসের জন্যে রাগ সংগীত, গজল ১৯৬৮ সনে চট্টগ্রাম আর্ট কাউন্সিল ও চট্টগ্রাম বেতারের যৌথ উদ্যোগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘নিখিল পাকিস্তান সংগীত সম্মেলনে’ উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করেন।

ঢাকা বেতার আর টিভিতে স্পেশাল গ্রেড’র শিল্পী হিসেবে বেলা নিয়মিত উচ্চাঙ্গ, নজরুল, গজল ও নিজের সুরারাপিত বাংলা গান পরিবেশন করেন। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা বেতার, বিটিভিতে আয়োজিত দর্শকদের উপস্থিতিতে সরাসরি বিশেষ বৈঠকি অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে শ্রোতাদের অবিভুত করেছেন একাধিকবার। ঢাকা বেতারের কমার্শিয়াল সার্ভিসে বরেণ্য সুরকার আজাদ রহমান ও সমর দাসের তত্বাবধানে এবং তাদের সুরারাপিত বেশ কিছু গান রেকর্ড করেন যার অনেকগুলো ৭০’এর মাঝামাঝি সময়ে জনপ্রিয় হয়েছিল। মূলত নজরুল ও শাস্ত্রীয় সংগীতের উপর ছিল তাঁর অনবদ্য সাধনচর্চা। জাতীয় প্রেসক্লাব, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, শুদ্ধ সংগীত প্রসার গোষ্ঠী, ছায়ানট, তবলা শিক্ষালয়, এটমিক এনার্জি কমিশন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট প্রভৃতি জায়গায় আয়োজিত বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানগুলোতে সংগীত পরিবেশন করে সর্বমহলে হয়েছেন অত্যন্ত প্রশংসিত। ফলশ্র“তিতে তখনকার বহুল প্রচলিত ম্যাগাজিন, পত্রিকা সমূহে (বিচিত্রা, সাপ্তাহিক ললনা, ইত্তেফাক, সংবাদ, চিত্রালি, ঝিনুক, তারকালোক ইত্যাদিতে) তাকে নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন ও সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়।

১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষকালে বেলা ছিলেন প্রগতিশীল আন্দোলনের সাথে জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ‘সংস্কৃতি সংসদের’ সহ-সভাপতি থাকার সুবাদে বিভিন্ন জায়গায় গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও দেশাত্মবোধক গান গেয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন অবিরত। ডাকসু অফিসে বসে প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী শেখ লুৎফুর রহমানের শেখানো বিশেষ বিশেষ জাগরনী গান যেমন- “লাঞ্চিত নিপীড়িত জনতার জয়” “ব্যারিকেড বেয়োনেট বেড়াজাল” “আমার প্রতিবাদের ভাষা আমার প্রতিরোধের আগুন” “মুক্তির মন্দির সোপানও তলে” ইত্যাদি গণসংগীত সহপার্টি শিল্পী মাহমুদুর রহমান বেনু, নিলুফার ইয়াসমিন, জিনাত রেহেনা, নিলুফার পান্না, শাহীন সামাদ ও প্রয়াত শিল্পী অজিত রায় সহ বহু মঞ্চে ও রাস্তাঘাটে পরিবেশন করেছেন। বস্তুত এই গানগুলোই পরবর্তীতে বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধের গান হিসেবে প্রচারিত হয়।

ছাত্রাবস্থায় প্রগতিবাদী ও বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন বিধায় বেলা একজন দক্ষ সংগঠকও হয়ে উঠেছিলেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রচার, প্রসার আর আমাদের দেশীয় সংগীত ও শুদ্ধ সংস্কৃতির বুনিয়াদ তৈরির লক্ষ্যে কিছু সংগীত অনুরাগী সহযোগিদের নিয়ে ঢাকায় তৈরি করেন “পাকিস্তান ক্লাসিক্যালস” নামে একটি চমৎকার সংগঠন। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নামান্তরিত হয় “বাংলাদেশ ক্লাসিক্যালস্”। এটি প্রতিমাসে সংগীত আসর, মুক্ত আলোচনা ও উৎসাহী সংগীতানুরাগীদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যায়। ৭০’এর দশকে বাঙালি সংস্কৃতির এক বৈরী পরিবেশের মধ্যে হাতেগোনা কয়জন শাস্ত্রীয় শিল্পী নিয়ে এ কাজটি করা ছিল অত্যন্ত দূরহ ব্যাপার।

নিঃসন্দেহে বেলা তার নিরলস প্রচেষ্টা, একাগ্রতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সে সময় আমাদের শুদ্ধ সংগীতের উন্নয়নে ও প্রসারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন যার ফলশ্র“তিতে আজকের এই প্রজন্ম সেই কাজটিই সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। বিসিএস শিক্ষায় ক্যাডারভূক্ত হয়ে সরকারী কলেজে ৭৩’এ অধ্যাপনার সময় বেলা কুমিল্লা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের মনোনীত একমাত্র ‘সংগীত বিষয়ক পরীক্ষকের’ দায়িত্ব পালন, ‘পুরবী ললিত একাডেমীর’ প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে সংগীত প্রতিযোগিতায় একজন বিদগ্ধ বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন অত্যন্ত সফলতার সাথে, সমসাময়িক প্রসঙ্গ ও সংগীত বিষয়ক লেখালেখিও করতেন বিভিন্ন মাধ্যমে। বিশেষত তার নিরিক্ষাধর্মী লেখা “শিল্পী, সুর ও সাধনা” এবং বিশ্বনন্দিত ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সম্পর্কে লেখা “ঈশ্বর যার সুর” পাঠক সমাজের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হয়। বেতারের মাসিক অনুষ্ঠান সম্বলিত পত্রিকা ‘এলান’ এ স্বরলিপি সহ নিজের সুরারপিত বাংলা গান ও শুদ্ধ রাগ ভিত্তিক বাংলা খেয়াল ছাপানো হয়। এইসব প্রচেষ্টার মূলে ছিল সংগীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ।

উচ্চশিক্ষার জন্য আশির দশকের গোড়ার দিকে বেলা বিদেশে অবস্থান করেন। সে সময় বিবিসি টিভি (এশিয়ান সেকশন), করাচী ও ঢাকা বেতারে Far East ও Transcription service এর জন্য সংগীত পরিবেশন, London Commonwealth Institute এ বাংলাদেশের শিল্পী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব, BBC বাংলা সার্ভিস ও একাধিকবার উপস্থাপকদের সাথে বাংলা অনুষ্ঠান পরিচালনা, All Pakistan Music conference এ উপমহাদেশের শীর্ষ সংগীতজ্ঞদের সাথে একাধিকবার অংশগ্রহণ (ঢাকা-চট্টগ্রামে), International Asian Cultural Society UK এর সদস্য সচিব ছিলেন। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ডে আমন্ত্রিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় সংগীত অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এমনি করে বিদেশে অবস্থানের সময়ও পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি সংগীতের ক্ষেত্রে নিরন্তর কাজ করে গেছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব। ১৯৭১ সালে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা, পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। আমরা গর্বিত জাতি। সেই উত্তাল সংগ্রামের দিনগুলো বেলাকে আন্দোলিত করে, আলোড়িত করে, গর্বিত করে স্বাধীনতার ইতিহাস আর ঐতিহ্যের উত্তরসুরী হওয়ার প্রেক্ষিতে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বেলা এবং তার পরিবারের অনেক সদস্যই সরাসরি এ দেশের ভেতরে থেকে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে লড়েছেন আর কেউ কেউ সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের পারিবারিক গাড়িতে বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র/হাতবোমা বহন করে পরিকল্পিত স্থানে পৌঁছে দেয়া, নিকটবর্তী হোটেল আসকারদিঘির পাড়ে ‘গেইট অব লন্ডন’ এ অবস্থানরত পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যদের গ্রেনেড ছুড়ে মেরে ঘায়েল করা, হালিশহর পান্নাপাড়া এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ছোট ভাই ও বাসায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদের সাথে নিয়ে অপারেশন চালানো, সে সময়ের উত্তাল দিনগুলো আজও তাকে আন্দোলিত করে।

সঙ্গীতের পাশাপাশি বেলা শিক্ষাকেও হৃদয়ে ধারণ করেছেন আদর্শগত ভাবে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী শেষে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উন্নীত হয়ে শিক্ষকতা করেছেন সরকারী/বেসরকারী ডিগ্রী কলেজ এবং বর্তমানে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সাদার্ণ ইউনিভার্সিটিতে। কর্মজীবনে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের কাছে নিজের নৈতিকতা, আদর্শ থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি। আমাদের এই চট্টগ্রামেই দেশের অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ গড়ে উঠে তাঁর যোগ্য নেতৃত্বে। মেধায় ও সকলে পরিশ্রমে বস্তুত: সত্যিকার অর্থে কোয়ালিটি এডুকেশন শুরু যা কিনা আমাদের গর্ব হয়েছিল। তারই হাত ধরে এই শহরের বুকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে যা দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়। সঙ্গীত জগত থেকে এখন বেশ কিছুদিন বিচ্ছিন্ন ছিলেন কেন? তাঁর এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বলেন, মূলত: দীর্ঘ কয়েক বছর দেশের বাইরে অবস্থান, বিভিন্ন জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মানসম্পন্ন করে গড়ে তোলা ইত্যাদি কারণে আমার অন্যান্য কর্মক্ষেত্র, সঙ্গীত, লেখালেখি, সাংগঠনিক কাজ মোটেও সময় দিতে পারেনি। তবে সঙ্গীত, সুর এটিও আমার অন্তরেই, আমার চিন্তা-ভাবনা, নিশ্বাস-প্রশ্বাস সুর আর সুর। এ থেকে কখনোই একেবারে বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয়। এখন সক্রিয়ভাবেই জড়িত আছি। একজন দক্ষ প্রশাসক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন। জাপান ফাউন্ডেশন আয়োজিত “টোকিও এডুকেশন কনফারেন্স”, ইংল্যান্ডের ‘নটিংহাম’ বিশ্ববিদ্যালয়ে “শিক্ষক প্রশিক্ষক কনফারেন্স”, ‘আর্লি চাইল্ড হুড ডেভালাপমেন্ট’ আয়োজিত “এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে” অংশগ্রহন করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এক্সচেইঞ্জ প্রোগ্রামে, শিক্ষা সফরে ইতালী, পশ্চিম জার্মানি, নেপাল, স্কটল্যানড, শ্রীলংকা সফর করেন। বিশেষজ্ঞ ‘কনসালটেন্ট’ হিসেবেও বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে সবিশেষ অবদান রাখেন।

প্রফেসর বেলা ইসলাম আমাদের এই ঐতিহ্যময় সংগীত, সমৃদ্ধ সংস্কৃতির লালন, বিকাশ ও পরিশুদ্ধ এক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে আগামী প্রজন্মকে সাথে নিয়েই নিরন্তর নিরবে কাজ করে চলেছেন। সংগীতের পাশাপাশি একজন সফল “মানুষ গড়ার কারিগর”। তিনি বর্তমানে বিভিন্ন সংগীত সংগঠন নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি, বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি, নজরুল সংগীত শিল্পী সংস্থার উপদেষ্টা, পরিবেশ আন্দোলন (প্রমা) চেয়ারপার্সন, হাটখোলা, কীডস কালচারাল ইনস্টিটিউট আমরা করবো জয়, বিস্তার জাতীয় আঞ্চলিক স্কাউট ও বিভিন্ন সেবামুলক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।

দীর্ঘদিন শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদান। রাখার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ভাবে বহু সম্মাননা প্রদান করেছেন তাকে। এ প্রজন্ম তাঁকে দেখে আলোকিত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাবে, যেটি এখন সময়ের দাবী। সংগীত, শিক্ষা, সংগঠক এই তিনে যার নিত্য বসবাস তিনি সুন্দর আলোর গন্তব্যে নিয়ে যাবেন আমাদের প্রিয় চট্টগ্রামের সংস্কৃতি প্রিয় মানুষ গুলোকে। সংগীতের বটবৃক্ষ বেলা ইসলাম গানের মানুষ, প্রাণের মানুষ। সংগীতজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, দক্ষ সংগঠক, নজরুল গবেষক, লেখিকা এবং একজন আদর্শ মমতাময়ী মা যার তুলনা তিনি নিজেই। বিশ্বাস, সম্মান আর ভালোবাসা এই তিনের মাঝে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মযজ্ঞদের প্রেক্ষিতে দেশে বিদেশে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের সংগীত-সংস্কৃতি-শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তিনি করেছেন সুপরিচিত ও গৌরবান্বিত। তাই তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়নের যোগ্য সম্মানে জাতীয়ভাবে সম্মানিত করা অপরিহার্য। নতুবা সেটি হবে আমাদের মানসিক দৈন্যতা। তাঁর মেধা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল হতে পারে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। আমরা হতে পারি উপকৃত। সেই ভাবে তাঁকে জাতীয় ভাবে মূল্যায়ন করাটাই যুক্তিসংগত। তাই এই গুণী সংগীতজ্ঞ বহুজাতিক প্রতিভার এক অনন্য ব্যক্তিকে জানাই শুভকামনা শ্রদ্ধা ভালবাসা।

আবছার উদ্দিন অলি

absaroli1976@gmail.com

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.