জুবায়ের সিদ্দিকী : বিদেশ থেকে চোরাচালান, মানবপাচার ও রোহিঙ্গা পাচারের নিরাপদ রুটে পরিনত হয়েছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে চোরাচালানের ঘটনা। বিদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে আসছে সোনা, সিগারেট, যাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। বানের পানির মত সোনা আসলেও ধরা পড়ছে তার সামান্যই। সমানতালে চলছে মানবপাচার। শুধু বাংলাদেশি নই, রোঙ্গিদের পাচার করা হচ্ছে বাংলাদেশি পাসপোর্টে। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মীদের সহায়তায় এ চোরাচালান হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চোরাচালানে জড়িত রয়ে বিমানবন্দর কেন্দ্রীক একাধিক সিন্ডিকেট। গত দেড় বছরে অন্তত ৫০০ কেজি সোনা ও তিন কোটি টাকার সিগারেট আটক হয়েছে।
পাচারকালে উদ্ধার হয়েছে ৬০ জন মানুষ। অনুসন্ধানে জানা যায়, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন সোনা চোরাচালানের নিরাপদ ঘাঁটি। এ বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিটি ফ্লাইটেই অবৈধভাবে সোনা আসছে। এছাড়া কার্গোতে করেও আনা হচ্ছে সোনা। একদিনে ১০৫ কেজি সোনা আটকের নজিরও রয়েছে। সে সময় ১০ জনকে আটকও করা হয়েছিল। সুত্র জানায়, মুলত চট্টগ্রাম বিমানবন্দর সোনা চোরাচালানের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহুত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সংযুক্ত থাকা অধিকাংশ ফ্লাইটেই আসছে সোনা। এ ছাড়া মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফ্লাইটেও আসছে সোনা। বেশ কিছুদিন ধরে সোনা ধরা না পড়লেও বের হচ্ছে অবাধে। সম্প্রতি বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া কোটি টাকার সোনা ডিবি পরিচয়ে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটেই বেশিরভাগ সোনা আসে বাংলাদেশ বিমান, এয়ার এরাবিয়া, ফ্লাই দুবাই ও ওমান এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে। সিন্ডিকেটের পক্ষে বাহকরাই এসব সোনা বয়ে আনে।
তারা সোনা আনার পর বিমানের নির্দিষ্ট স্থানে রেখে নেমে যান। পরে প্রকৌশল বিভাগ ও ক্লিনাররা সেগুলো নামিয়ে আনেন। বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হওয়া বাহকরা জানিয়েছিলেন, সোনা আনার জন্য অর্ধশতাধিক বাহক রয়েছে। তারা টাকার বিনিময়ে এসব সোনা নিয়ে আসে। দুই থেকে তিন মাসের মাথায় তারা দুবাই যান। তারা সেসব সোনা বিমানবন্দরে আনার পর সিন্ডিকেটের নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে পৌছে দেয়। এরপর তাদের দায়িত্ব শেষ। কাষ্টম কর্মকর্তাদের সহায়তায় বাহকরা গ্রীন চ্যানেল দিয়েও বের হয়ে যায়। সুত্র জানায়, বিমানবন্দরে কার্গোযোগে বৈধ পন্যের আড়ালেও আসে সোনা ও সিগারেট। শত শত কেজি সোনা কার্গোর মাধ্যমে আসে এবং অনায়াশে পার হয়ে যায়। এতে জড়িত রয়েছে কয়েকটি সিএন্ডএফ এজেন্ট। বিমানবন্দর সুত্রে জানা যায়, আগে বিমান কার্গোর নিয়ন্ত্রন ছিল সিভিল এভিয়েশন ও বিমান সংস্থার হাতে। কিন্তু বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক হওয়ার পর থেকে এর দায়িত্ব পায় পর্যটন কর্পোরেশন। সুত্র জানায়, এক সময় কার্গোতে করে মালামাল তেমন একটা আসত না। কিন্তু কয়েকবছর ধরে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। কোটি কোটি টাকার পন্য আসছে কার্গোতে করে। এ সুযোগে বৈধ পন্যের আড়ালে সোনা ও সিগারেট আসছে। ব্যবসায়ী সুত্রে জানা গেছে, এলসির মাধ্যমে আমদানীকারকরা কার্গোর মাধ্যমে নানা ধরনের পন্য এনে থাকেন।
পন্য খালাসের দায়িত্ব থাকে সিএন্ডএফ এজেন্টের। তাদের সাথে চোরাচালানীদের গোপন সমঝোতা থাকে। ফলে আমদানীকারকরা এক ধরনের পন্যের ঘোষনা দিয়ে অন্য পন্য নিয়ে আসেন। এলসির পন্য সামান্য থাকলেও ভেতরে থাকে হয় সোনা বা সিগারেট। বিমানবন্দর সুত্র জানায়, ল্যাপটব, কম্পিউটার বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক্স পন্যের ভেতরে করে কৌশলে সোনা নিয়ে আসা হয়। কোন পন্য আমদানী করার পর উপরে ও নিচে পন্য রেখে মাঝখানে সোনা দিয়ে ভর্তি করে দেওয়া হয়। বিমানের চাইতে কার্গোতে করে কয়েকগুন বেশি সোনা আসে বলে অভিযোগ রয়েছে। কার্গোতে আসা সোনা ধরাও পড়ে কম। সোনার পাশাপাশি সিগারেটও আসছে দেদারছে। বেনসন সহ বিভিন্ন ব্য্রান্ডের সিগারেট আসে কার্গোতে করে। এক তথ্যে জানা যায়, গত দেড় বছরে এ বিমানবন্দরে ৫০০ কেজি সোনা ও তিন কোটি টাকার সিগারেট আটক করা হয়েছে। বিমানবন্দরের উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন,’ চোরাচালানের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে। যারা এতে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চোরাচালান নিয়ে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। একজন কাষ্টম কর্মকর্তা বলেন, যাত্রীর লাগেজ সুক্ষèভাবে স্ক্যানিং করা হয়।
ভেতরে অবৈধ কোন পন্য থাকলে তা অবশ্যই ধরা পড়ে। সোনা নিয়ে কেউ বের হতে পারে না। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরা এতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে প্রকৌশল শাখা অন্যতম। চোরাচালানে জড়িত থাকায় আটক হয়েছেন ৫ জন। এক সময়ের টেকনিশিয়ান আবদুস ছাত্তার (বর্তমানে চাকরীচ্যুত) ছিলেন মুল হোতা। পরবর্তীতে তাকে চাকুরীচ্যুত করা হয়। বিমানবন্দর ম্যানেজারের সাবেক পিএস মোমেন মোকছেদ ছিলেন, চোরাচালানের রাজা। তাকেও শাস্তিমুলক বদলী করা হয়। এ ছাড়া বিমানের টেকনিশিয়ান সেলিম, সহকারী মেগানিক রুহুল আমিন, সিভিল এভিয়েশনের নির্মল দাশ, সুইপার বিনোদ, হারাধন, রবিন, কবির, বিক্রম, নজুরুল, চৌকিদার হাজী এরশাদ, গোবিন্দ, সালাম, গনি, জাহেদ, মোনাফ, হান্নান, হাসান, রাজিব, পরিমল, দীপংকর, ফকির, শামিমুল, ফজলুল হক মনি অন্যতম বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সিকিউরিটি গার্ড মোশাররফ হোসেন, ড্রাইভার শরিফ, ট্রলিম্যান মহিউদ্দিন, ফিল্ড ইউনিট রায়হান, মার্শাল দাউদও জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া কিছু কাষ্টম কর্মকর্তা, ইমিগ্রেশন পুলিশের কতিপয় সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী, পতেঙ্গা থানা পুলিশও জড়িত বলে অভিযোগ আছে। অপরদিকে মানব পাচারের ঘটনা ঘটছে অহরহ। ইমিগ্রেশন ও সংশ্লিষ্ট বিমান কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে পাচার হচ্ছে মানুষ।
বাংলাদেশি ভিসায় যাওয়া এর মধ্যে রোহিঙ্গার সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে ইরাক, লিবিয়া, ইতালীতে পাচার হচ্ছে মানুষ। দুবাই হয়ে তাদের পাচার করা হয়। দালালরা ভিসার ব্যবস্থা করে তাদের প্রথমে দুবাই পাঠায়। সেখান থেকে পাঠানো হয় অন্য দেশে। এক মাসে লিবিয়া ও ইরাক পাচারকালে ৪৫জনকে আটক করেছে র্যাব। সমঝোতা থাকে বিধায় তারা অনায়াশে ইমিগ্রেশন পার হতে পারে। ফ্লাইটে উঠতেও কোন বাধা পায় না। র্যাবের সহকারী পরিচালক চন্দন দেবনাথ বলেন, মানবপাচারের উপর আমাদের নজরদারী রয়েছে। মানবপাচার রোধে আমাদের কৌশল কাজে লাগানো হচ্ছে। ইমিগ্রেশনের সহকারী কমিশণার পলাশ কান্তি নাথ জানান, অবৈধভাবে কেউ ইমিগ্রেশন পার হতে পারে না। পাসপোর্ট ভিসা সঠিকভাবে যাছাই করা হয়। সবকিছু ঠিকঠাক পাওয়া গেলেই যেতে দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে সোনার আমদানী শুল্ক বৃদ্ধি ও ব্যাপক চাহিদার কারনে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মতে, চট্টগ্রাম হয়ে বানের পানির মত চোরাই পথে সোনা আসলেও তা দেশে থাকছে না। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে এসব সোনার অধিকাংশ চলে যাচ্ছে ভারতে। ভারতে পাচারেরও রয়েছে আলাদা সিন্ডিকেট।
