পাকিস্তান নির্লজ্জ একটি রাষ্ট্রের নাম

0

– এস এম মনসুর নাদিম

পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি’র কবে আক্কেল দাঁত গজাবে কিংবা আদৌ গজাবে কিনা তা বলা মুশকিল। পাকিস্তানিরা সবসময় বলতো-‘বাঙালি চুতিয়া হ্যাঁয়’। মানে বাঙালি বোকা। আসলে বাঙালিদের তারা পরশ্রীকাতরতা হেতু বোকা বলে হেয় করলেও প্রকৃতপক্ষে কারা বোকা ছিল তা বারবার প্রমান হয়েছে। ইদানিং সেই দেশের একটি পত্রিকা দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে দ্যা স্ট্যাট ব্যাংক অব পাকিস্তানকে উদ্ধৃত করে। তারা নাকি বাংলাদেশের কাছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা (৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি) পাওনা দাবি করতে যাচ্ছে।

খবরে বলা হয়েছে, ১৯৭১-এর আগে পূর্ব পাকিস্তানের কাছে পশ্চিম পাকিস্তানের যে অর্থ পাওনা ছিল, তা বর্তমানে ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অ্যাসেট ভ্যালুয়েশনের (একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে চলতি বাজারে সম্পদের মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে) মাধ্যমে প্রকৃত পাওনা নিরূপণ করা হয়েছে। পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, সরকারি অফিস, ঋণ, আগাম সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের কাছে যে টাকা পাওনা ছিল, ২০১৬ সালের জুন নাগাদ ভ্যালুয়েশন করে তা ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপিতে (৬০০ কোটি ৯২ লাখ টাকা) দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের কাছে এখন পাকিস্তান এই টাকা দাবি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন একটি কৌতুক শোনার পর কেউ কী না হেসে পারে ? হাত পেতে কিংবা ডরায়ে ধমকায়ে পরের ধন ছিনিয়ে নেয়া পাকিস্তানীদের জাতীয় অভ্যাস । পাকিস্তানীদের স্বভাব আর স্থুল বুদ্ধির কারনে দেশটি জন্মের সাড়ে সাত দশকেরও বেশি সময় পার করেও এখনো ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল’র মত দশা। সম্প্রতি তথাকথিত চুতিয়া বাঙ্গাল’র দেশের উন্নয়ন দর্শনে তাদের চক্ষু চড়াক গাছ। আজীবন মার্কিনীদের নিক্ষিপ্ত পোড়া রুটির টুকরায় নেড়ি কুত্তার মত জীবন অতিবাহিত করতে অভ্যস্ত এই রাষ্ট্রটির কু-নজর আবারো আমাদের সোনার বাংলার দিকে পড়েছে। অথচ হিসেব করলে বাংলাদেশ তাদের কাছে এর চেয়েও বড় অংকের টাকা পাবে। বারবার এই টাকা দাবি করেও বাংলাদেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া পায়নি। পাকিস্তানের এই দাবি বাংলাদেশের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ বলে আমরা মনে করি। কারন ১৯৭১ সালের আগে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রায় ৪৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদের হিসাব, যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ রয়েছে। মজার বিষয় হলো এই সংক্রান্ত কোনও বৈঠক করতে চাইলেই পাকিস্তান ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় বলে এটিকে অগ্রাহ্য করে অথবা আলাপ করতে অনাগ্রহ ভাব প্রকাশ করেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, একাত্তরের আগের হিসাব করলে পাকিস্তানের কাছেই বাংলাদেশের প্রাপ্য প্রায় ৩৩ হাজার ৭০০ শত কোটি টাকা । মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতিপূরণের কথা বাদ দিলেও একাত্তর সালে ঢাকায় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়া অর্থবাবদ পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের কাছে এই অর্থ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তান বাংলাদেশের এই ন্যায্য দাবিকে ‘স্পর্শকাতর’ বিষয় হিসেবে একপাশে ঠেলে দেয়। এবং অত্যান্ত চাতুর্য্যের সাথে এই বিষয়ে আলাপ থেকে নিজেদের দূরে রাখে। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বন্যাদূর্গতদের সহযোগিতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কারের জন্য বৈদেশিক সাহায্য হিসেবে আসা প্রায় ২১০ মিলিয়ন ডলার রক্ষিত ছিল ঢাকায় স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে। কিন্তু ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর ওই অর্থের কোনও ভাগ বাংলাদেশকে দেয়নি পাকিস্তান এবং এই বিষয়ে পাকিস্তান সব সময় চুপ থেকেছে। বাংলাদেশের তরফ থেকে দফায় দফায় তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার ওই অর্থ ফেরত দেয়নি। তা ছাড়া ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য সহায়তা হিসেবে বিভিন্ন দেশের পাঠানো ২০ কোটি ডলার পাকিস্তান নিয়ে গিয়েছিল। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঢাকা শাখায় জমা হওয়া ওই ত্রাণের টাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যাংকের লাহোর শাখায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ওই অর্থ চাইলেও তা ফেরত দিচ্ছে না পাকিস্তান। পাকিস্তান যখন আসল জায়গায় হাত দিয়েছে তখন এই ব্যাপারে বাংলাদেশকেও এগিয়ে যাওয়া উচিৎ বলে মনে করি। তখন নিতে গিয়ে দিতে হবে যা তাদের একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ-‘লে নে মে দেনে পড় যায়ে’।মোটা মাথার পাকিস্তান যেই ফাঁদে পা দিয়েছে তাকে যেন ঐ ফাঁদে আটকে ফেলা হয়। পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা বিশাল অর্থ সম্পদ ৪৫ বছরেও আদায় করা সম্ভব হয়নি। দুনিয়ার সবচেয়ে নির্লজ্জ রাষ্ট্রের তকমাধারী এ দেশটি দুই দেশের বৈঠকে একাত্তর-পূর্ব সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে খুব একটা আপত্তি না তুললেও বাংলাদেশের পাওনা পরিশোধে এক ইঞ্চি পথও এগোয়নি। স্মর্তব্য, স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে পাকিস্তানের কাছে কয়েকটি খাতে বাংলাদেশের পাওনা নির্ধারণ করা হয়। ওই হিসাব অনুযায়ী খাতগুলো হলো একাত্তর-পূর্ববর্তী পাট বিক্রির টাকা, তখনকার পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা বিবেচনায়, মোট সম্পদের ৫৬ শতাংশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৫৪ শতাংশ এবং ১৯৭০ সালের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আসা প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি সহায়তা। সব মিলিয়ে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা দাঁড়ায় সে সময়ের হিসাবে ৪ দশমিক ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমান বাজারমূল্যে যার পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওনা আদায়ের উদ্যোগ নিলেও তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর পাকিস্তানপন্থি সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসায় বিষয়টি সেখানেই থেমে যায়। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডা. দীপু মণি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে এ বিষয়ে সোচ্চার হন। এ উদ্যোগকে ব্যর্থ করতে পাকিস্তান এখন উল্টো বাংলাদেশের কাছে পাওনা দাবির ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে। তাই পাকিস্তানের পাতানো ফাঁদে পাকিস্তানকেই ফেলতে হবে। পাকিস্তানের নানা অমানবিক কর্ম-কাণ্ড ও শয়তানি আচরণের জন্য ভারত পাকিস্তানকে শত্রুরাষ্ট্র রুপে চিহ্নিত করেছে অনেক আগে। বাংলাদেশের পাওনা পরিশোধ না করে উল্টো অর্থ দাবি নির্লজ্জতা আর বেহায়াপনার ক্ষেত্রে পাকিস্তান যে কতটা নীচে নামতে পারে সে সত্যটিই প্রমাণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে যৌথবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিল ৯৪ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য। যুদ্ধাপরাধের নির্দেশদাতা হিসেবে এর মধ্যে ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়। পাকিস্তান তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বন্দী সৈন্যদের স্বদেশে ফেরত নেয়। সে প্রতিশ্রুতিও পালন করেনি এবং ৭১’র গনহত্যার জন্য ক্ষমাও চায়নি তারা। অধিকন্তু যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি নিয়ে নানা বিতর্কিত বিবৃতি দিয়ে পাকিস্তান সেই বিশেষ পশুটির লেজ সদৃশ আচরণ করেছে। এদিকে বাংলাদেশের পাওনা টাকা পরিশোধ না করে তারা উল্টো বাংলাদেশের কাছে অর্থ দাবি করার যে প্রস্তুতি নিচ্ছে তা বেহায়াপনার সীমা অতিক্রম করার নামান্তর। পাকিস্তানকে ভুলে গেলে চলবেনা যে ৭১’র বাংলাদেশ আর ২০১৬’র বাংলাদেশ এক না। যখন বাংলাদেশের বলতে গেলে কিছুই ছিলনা তখন পাকিস্তানি সুসংগঠিত প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত একটি সশস্ত্র বাহিনীর সাথে নিরস্ত্র বাঙালি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল। এখন বাংলাদেশ আরও অনেকদুর এগিয়ে গেছে। শিক্ষা ও অর্থনীতির দৌড়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে অনেক আগে। বার বার এই অহংকারি জাতিটার দর্পচুর্ন হলেও লজ্জা কখনো তাদের স্পর্শ করেনি। কারন লজ্জা লজ্জা পেয়ে পাকিস্তান থেকে হিজরত করেছে পাকিস্তানের সেই শৈশবে ।নির্লজ্জ এই রাষ্ট্র আর বেহায়া এই জাতিটাকে এই মুহুর্তে একটি চতুষ্পদী পশুর লেজের সাথেই তুলনা করা যায়। পাকিস্তানের ইতিহাসে দেখা যায়, দেশটির জন্মলগ্ন থেকেই সেখানে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। বেশিরভাগ সময় সামরিক শাসনে দেশটি উন্নয়নের মুখ দেখেনি। তাদের নিকট তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান ছিল সতীনের ছেলের রোজগার।পুর্বপাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ হওয়ার পর তাদের রোজগারের একটি পথ বন্ধ হয়ে যায়।এখন বাংলাদেশকে বিগত দিনের বকেয়া পরিশোধ করার ভয়ে উল্টো এই নাটক সাজিয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের পাওনা অর্থকে অস্বীকার করার এ অপকৌশলকে আমাদের ধিক্কার।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.