চট্টগ্রাম শহরে অবৈধ বিলবোর্ড আর নেই- আ.জ.ম নাছির উদ্দিন
জুবায়ের সিদ্দিকী : তিনি এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা। স্বৈারাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগকে নিয়ে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন সবসময়। এ জন্য মামলা-হামলা ও হয়রানীর সম্মুখীন হয়েছেন বারবার। নগর ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দায়িত্ব পালন করেছেন। ছাত্রসমাজের মাঝে দ্রুত তার গ্রহনযোগ্যতা বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। আমিরাতে পিসিএল ক্রিকেট মেচ আয়োজন করে তিনি নজর কাড়েন ক্রীড়ানুরাগীদের। নগর আওয়ামী লীগের অপেক্ষাকৃত তরুন এই নেতাই হয়ে উঠেন যুবসমাজের মধ্যমণি, তিনি আ.জ.ম নাছির উদ্দিন। সবাইকে চমকে দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক হিসাবে ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর থেকে দায়িত্ব পান। দলে ফিরে আসে চাঙ্গাভাব। বেজে উঠে নতুনের জয়গান। ফের চমক দেন ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হয়ে। দায়িত্ব গ্রহন করেন ২৬ জুলাই।
গত সপ্তাহে আজকের সুর্যোদয়কে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে আ.জ.ম নাছির উদ্দিন বলেন, গত এক বছর ৩ মাস হলো দায়িত্ব গ্রহনের। কতদুর এগুতে পেরেছি তার বিচারের ভার নগরবাসীর হাতে। আমি নিজের মুখে দাবী করলে তো হবে না। আর তৃতীয় নয়ন হিসেবে আপনারা সাংবাদিকরা মুল্যায়ন করবেন। তবে একটা কথা বলতে পারি। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছি। চট্টগ্রাম শহরে এখন আর অবৈধ বিলবোর্ড নেই। সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত হয় বিধিবদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী।
কর্পোরেশনের ৩টি প্রধান দায়িত্ব রয়েছে- শহরের রাস্তাঘাট নির্মান ও সংস্কার, নালা নর্দমা নির্মান, সড়ক আলোকিত করা এবং শহরকে নিয়মিত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। সিটি কর্পোরেশন ৩টি সেবা দিতে বাধ্য। তবে ৫ বছর অন্তর কর মুল্যায়ন করার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা না করার কারনে অনেক সমস্যা তৈরী হয়েছে। ব্যয় তো বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশাসনিক ব্যায়ও বেড়েছে। নাগরিক সেবার পরিধি বেড়েছে। এক সময় নগরে ১০ লাখ মানুষ ছিল। বাড়তে বাড়তে এখন ৬০ লাখ হয়েছে।
বর্তমানে নগরবাসীর সংখ্যা ৬০ লাখ। প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে শহরের বাইরে থেকে ১০ লাখ লোক আসা যাওয়া করেন। মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন বলেন, ফ্লাইওভার নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে গার্ডার ধ্বসে প্রানহানির মত দু:খজনক ঘটনা ঘটেছে। তবে আমি দায়িত্বভার গ্রহনের পর কাউকে ফ্লাইওভার নির্মানের অনুমতি দিইনি। যারা ফ্লাইওভার নির্মান করেছেন তাদের কাছে নিশ্চয় ব্যাখ্যা আছে। আমার একটি নিজস্ব মন্তব্য রয়েছে-এখন উড়াল সড়কগুলো প্রয়োজন মনে না হতে পারে, একসময় এটি প্রয়োজন হবে। আমি ওই বিতর্কে যেতে চাই না। তবে এ শহরে কোন ধরনের পরিকল্পনা ছিল না। যা উন্নয়ন হয়েছে তা অপরিকল্পিত।
আমি মনে করি, অপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন হওয়ার কারনে আমরা ভুগছি। এখন যেখানে ফ্লাইওভার আছে, সেখানে মেট্রোরেল নির্মানের সুযোগ রাখলে ভাল হত। এতে করে জনগন অনেক বেশি উপকৃত হতো। এখন একটি চায়না কোম্পানী মেট্রোরেল নির্মানের ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছে। তারা মতামত জানতে চেয়েছে। আমি ইতিবাচক। তাদের লিখিত প্রস্তাব দিতে বলেছি। তারপর সিদ্ধান্ত নেব। মেট্রো রেল গুরুত্বপুর্ন। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন আজকের সুর্যোদয়কে বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহনের পর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম দিনের পরিবর্তে রাতে শুরু করেছি। ডোর টু ডোর (ঘরে ঘরে) বর্জ্য সংগ্রহের জন্য ঘরে ঘরে বিন (ময়লা রাখার ঝুড়ি) দিচ্ছি।
বিন পৌছাতে আর দেড় ২ মাস লাগবে। এরপর কর্পোরেশনের কর্মীরা সরাসরি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করবে। মার্চের মধ্যে এ কার্যক্রম শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারব। এরপর নগরের কোথাও ডাষ্টবিন ও কন্টেইনার থাকবে না। মেয়র বলেন, রাস্তাঘাট সংস্কার করা হচ্ছে। এখানে একটা সমস্যা আছে। ওয়াসার অনেকগুলো প্রকল্প আছে। এগুলোও প্রয়োজনীয়। ওয়াসা ২০১৯ ও ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এখন ঝড়ঝাপটা সব আমার উপর দিয়ে যাবে। ওরা রাস্তা খুঁড়বে। মেয়রের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি হচ্ছে- এ রকম কিছু অবগত আছেন কি না জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ’না, আমি জানিনা। আমাকে কেউ বলেনি।
যদি বিষয়টি সরাসরি আমার নলেজে দিত, তাহলে ব্যবস্থা নিতাম। এখন কে কি উদ্দেশ্যে বলছে, তা আমি জানি না। আমি তো বিভিন্ন প্রোগ্রামে যাই। মিটিং করি। সেখানেও কেউ বলেননি। আর যার কাছে চাঁদা চেয়েছেন, তিনি পুলিশকে অভিযোগ জানাতে পারতেন। হকারদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে মেয়র বলেন,’ পুনর্বাসন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাদের কেয়ামত পর্যন্ত কেউ পুনর্বাসন করতে পারবে না। তাদের এখানে বসিয়ে দিলে তা বিক্রি করে আরেক জায়গায় চলে যাবে। তবে তাদের একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসব। আমি ওদের বোঝাচ্ছি, ফুটপাত দখলের কারনে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, অফিসযাত্রী মানুষের দুর্ভোগ হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে। অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মুখে পড়ছে।
এটা দুর করা আমার দায়িত্ব। এ জন্য হকারদের বলেছি, তোমরা সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বসো। এই নগরে প্রায় ১০-১২ লাখ দরিদ্র শ্রেনীর লোক রয়েছে। এ ছাড়া দুইশতের বেশি বস্তি। তাদের কথাও বিবেচনা করতে হবে। হকার সব তুলে দিলে এরা কেনাকাটা কোথায় করবে। আমি ওদের সহায়তা করবো। বৈধতা দেব বলেছি। কেউ সন্ত্রাসী মাস্তানী করতে পারবে না তাদের সঙ্গে। চাঁদাবাজি হবে না। কমিশন ছাড়া প্রকল্পের টাকা ছাড় হচ্ছে না বলেছিলেন- ব্যাখ্যা দেবেন? মেয়র বলেন, না, না এটি নিয়ে ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। প্রকল্পের টাকা ছাড় হচ্ছে না এটা বলিনি। প্রকল্পের টাকা পেতে কোন সমস্যা হচ্ছে না।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের জন্য বাড়তি জনবল নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রনালয়। আর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (জিডিপি) তৈরী করছি। এসব জিডিপির কোনটা অনুমোদনের জন্য একনেক, প্রি-একনেক ও মন্ত্রনালয়ে আছে। মেয়রের পদমর্যাদা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, মেয়র মেয়রই। আলাদা কোন কিছুর দরকার নেই। মেয়রকে মেয়র হিসেবে মর্যাদা দিতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন বলেন, চসিকের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে একনেক। চসিকের ৭১৬ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতার বহি:প্রকাশ হিসেবে নগরবাসী এটি পেয়েছে। চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজের কাঁধে নেয়ার যে ঘোষনা দিয়েছিলেন, তিনি তার কথা রেখেছেন।
প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন লাভ করার পেছনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং এই মন্ত্রনালয়ের সচিব আন্তরিকভাবে ভুমিকা পালন করেছেন। প্রকল্পটি তিন বছরে বাস্তবায়ন হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে প্রকৃত নগরের রুপান্তরিত হবে। এই শহরে কোন কাঁচা সড়ক থাকবে না। শ্রীঘ্রই দরপত্র আহবান করে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। বৃহৎ এই প্রকল্পটি ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। মেয়র বলেন, ২০০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প কয়েকদিনের মধ্যে একনেকে যাবে। এর বাহিরে চট্টগ্রাম শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলো নিয়ে আরেকটি প্রকল্প তৈরীর কাজ চলছে। এসব প্রকল্প অনুমোদন হলে নগরীর রাস্তাঘাট ব্যাপক সংস্কার কাজ করতে পারবো। এ বছরের মধ্যে শহরটা সাজানোর যে পরিকল্পনা রয়েছে তা সম্পুর্ন হবে।
