এম.এ মজিদ:ভ্রমণ পথকে নিরাপদ বিবেচনায় অধিকাংশ মানুষ রেলপথকে বেছে নেয়।যার কারণে যাত্রার ঠিক কিছুক্ষণ আগে বাসের টিকিট পাওয়া গেলেও রেলে টিকিট পাওয়া যায়না।অনেক সময় ভ্রমণের ৩ থেকে ৪ দিন আগে গেলেও রেলের টিকিট পাওয়া যায়না। দ্বারস্থ হতে হয় কালো বাজারির।
পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে আমিও কয়েকবার কালোবাজারিদের কাছে দ্বারস্থ হয়েছি।গেল বছরের ডিসেম্বরের ঘটনা।চাকরির একটি পরীক্ষা দিতে ঢাকা যাওয়ার জন্য টিকিট কাটতে গেলাম চট্টগ্রাম স্টেশনে যাত্রার ৪ দিন আগে।কাউন্টারে গিয়ে দেখি পরের ৪ দিন পর্যন্ত কোন টিকিট নেই।তারপর আমার মত টিকিট কাটতে আসা বেশ কয়েকজনকে দেখলাম কিছুদুর পরপর জোটবদ্ধভাবে রেলওয়ের কয়েকজন কনস্টেবলকে কথা বলতে।ঘটনা দেখে বুঝতে পারলাম কাউন্টারে না থাকলেও তাদের কাছে টিকিট আছে।তাই তাদের সাথে কথা বলতে গেলাম।এক কনস্টেবলের কাছে জানতে চাইলাম টিকেট আছে কিনা? তিনি হ্যাঁসূচক জবাব দিয়ে একটু আড়ালে নিয়ে গেলেন।বলেন টিকিট আছে তবে দাম পড়বে ৫০০ টাকা।তাকে বললাম ৩৬৫ টাকার টিকিট আপনি ৫০০ টাকা নিচ্ছেন কেন? জবাবে তিনি বললেন আপনারা শুধু আমাদের সামান্য এগুলো দেখেন রাঘব বোয়ালদেওগুলো দেখেননা? তিনি আরো যোগ করলেন সামান্য এ চাকরি জোগাড় করতে কত টাকা দিতে হয়েছে জানেন? সেদিন টিকেট নিয়ে কেটে পড়ি।
এর ঠিক একমাস পর একটি চাকরির সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য ঢাকা যাচ্ছিলাম।সাক্ষাতকারের আগের দিন খবর পাওয়ায় ট্রেনের টিকেট জোগাড় করতে পারলামনা।তাই ট্রেন ছাড়ার একঘন্টা আগে রাত ১০ টার দিকে স্টেশনে গেলাম।কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানলাম টিকিট নেই।তাই কনস্টেবলদের কাছে চাইলাম তাদের কাছেও নেই।কাউন্টারের পাশে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম কেউ ঠিকেট ফেরত দিতে আসে কিনা সে আশায়।কিন্তু তাও হলোনা।অবশেষে ট্রেনে উঠে পড়লাম।ট্রেন ছাড়ার পর ট্রেনের এক গার্ড কোথায় যাব জিজ্ঞেস করে টাকা খুঁজলেন।টাকার পরিমাণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন ৪০০ টাকা।উনাকে বললাম ঠিক আছে আমি টাকা দেব কিন্তু আমাকে টিকিট দিতে হবে এবং সিটও দিতে হবে।উনি ধমকের সাথে বললেন,এখন টিকিট কোথায় পাব।কিছুক্ষণ বাড়াবাড়ি হওয়ার পর আমি এক পাশে দাড়িয়ে রইলাম।তারপর ঐ গার্ড আমার কাছ থেকে টাকা নিতে না পেরে তাদের আরেকজনকে আমার পিছনে লাগিয়ে দিলেন।তারপর উনাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম।একপর্যায়ে তার সাথে দরকষাকষি করে বললাম আমি টাকা দিব তবে আমাকে টিকিট দিতে হবে।উনি আমাকে একটা সিটে বসিয়ে বিমানবন্দর স্টেশনে গিয়ে টিকিট দেয়ার কথা বললেন।এতে আমি রাজি হলাম।বিমানবন্দর স্টেশনে গিয়ে আর উনার হদিস পেলামনা।
কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে স্বীকার হলাম আরেক বিড়ম্বনার।বের হওয়ার সময় টিকিট না পেয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো পুলিশ কন্ট্রোল রুমে।সেখানে টিকিট দেখাতে না পারায় আমার কাছে জরিমানা চাওয়া হলো এক হাজার টাকা।তাদেরকে বুঝিয়ে বললাম আমি টিকিটের জন্য আপনাদের লোককে টাকা দিয়েছি।উনি আমাকে টিকিট দেওয়ার কথা ছিল।কিন্তু উনি আমাকে টিকিট দেয়নি।টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় আমাকে জেলে দেওয়ার হুমকিও দিলেন।শেষ পর্যন্ত দরকষাকষি করে ৩০০ টাকায় রাজি করালাম।টাকা দিয়ে তার কাছে রশিদ চাইলাম।বলে রশিদ লাগবেনা।তাকে বললাম এই টাকাটা যে আমি সরকারকে দিয়েছি সেটা কেমনে বুঝব? তিনি বললেন,ওটার দরকার নেই আপনি এখন চলে যান।সময় কম ছিল বলে আর বাড়াবাড়ি না করে সেখান থেকে চলে গেলাম।
তাছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে যতবার ভ্রমণ করেছি রাতে কিংবা দিনে প্রতি বগিতে দেখেছি অসংখ্য মানুষ।কেউ দাড়িয়ে, কেউবা দুই বগির মাঝখানে কাগজ কিংবা কাপড় বিছিয়ে বসে আছে।এই মানুষগুলো কিন্তু ঠিকই টাকা দিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু টাকাটা তো এই কালো বিড়ালদের পেটেই যাচ্ছে।
সাম্প্রতিককালে শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোতে রেল খাতের দুরাবস্থা নিয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক একটি চিত্র।প্রতিবেদনের উঠে এসেছে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না রেলওয়ে।গত সাত বছরে ৩১ হাজার কোটি টাকা খরচ করেও গতি বাড়েনি রেলের। সেবা না বাড়লেও সা¤প্রতিক সময়ে দুই দফা ভাড়া বেড়েছে। এরপরও বাড়ছে লোকসান।এতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেলের আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এ সময় শুধু রেল পরিচালনার জন্য ব্যয় করা হয়েছে ২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা।অর্থাৎ এক বছরে পরিচালন লোকসানই হয়েছে ১ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা।
দীর্ঘদিন ধরে রেলে বিনিয়োগের হাহাকার ছিল। ছিল লোকবলের স্বল্পতা। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকে রেলে অর্থায়ন বাড়তে থাকে। গত পাঁচ-ছয় বছরে ১০ হাজারের বেশি লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ের বিভিন্ন নথি থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
পদ্মাসেতু কেলেঙ্কারি নিয়ে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের পদত্যাগের পর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় ওবায়দুল কাদেরকে।এর কিছুদিন পর রেলের সেবাকে নির্বিঘ্ন করার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে ভেঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় নামে দুটি মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়।
এরপর ২৮ নভেম্বর ২০১১ সালে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। নতুন গঠিত রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি বলেছিলেন, রেলের ‘কালো বিড়াল’ খুঁজে বের করা হবে।
২০১২ সালের ৯ এপ্রিল গভীর রাতে ৭০ লাখ টাকাসহ আটক হওয়ায় চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।নিয়োগ-বাণিজ্যের ঘুষের ভাগ তার বাসায় দিতে গিয়ে বস্তা ভর্তি টাকাসহ তার এপিএসের গাড়ি আটকের পর দেশবাসী- রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিতকেই সে-ই ‘কালো বিড়াল’ বলে মন্তব্য করে তার পদত্যাগের দাবি জানিয়েছিলেন।সুরঞ্জিতের পদত্যাগের পর মন্ত্রলায়টি আবার ফিরে যায় ওবায়দুল কাদেরের কাছে।এর কিছুদিন পর রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন বর্তমান রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক।
সাধারনত আমরা বুঝি ঐ সমস্ত ব্যবসায় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ,বাজারে যে সমস্ত পণ্যের চাহিদা থাকেনা। কিংবা পচনশীল কোন পণ্য রাখলে নির্দিষ্ট সময় পরে আর এগুলো বিক্রি করতে পারেনা।রেল টিকিটের এত চাহিদা থাকার পরও কেন রেল এত লোকসানের মুখে পড়ছে তা আমার বোধগম্য নয়।আমার সামন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি রেলমন্ত্রণালয়ে বারবার রদবদল করেও রেল কেন লাভের মুখ দেখছেনা।রেলের ভেতর এতগুলো কালো বিড়াল থাকতে রেল লাভের মুখ দেখবে কিভাবে?
