এম. রমজান আলী,রাউজান::চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার প্রাচীন তম নিদর্শন ঐতিহাসিক মহামুনি বিহার প্রাঙ্গনে সজছে নতুন সাজে। দক্ষিন রাউজানের পাহাড়তলীর এই মন্দিরে হাজার বছরের চিরায়ত বাঙ্গালীর ঐতিহ্য নতুন বছরকে পহেলা বৈশাখে বরণ করে নিতে প্রতিবারের ন্যায় এবারও রয়েছে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলাসহ নানা আয়োজন।
মহামুনি প্রাঙ্গনে বটমূল খ্যাত ‘ফনীতটি মঞ্চে’ মহামুনি গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রকাশনা সংস্থা বিশেষ করে মহামুনি সংস্কৃতি সংঘ, মহামুনি তরুণ সংঘ ও ত্রৈমাসিক জ্ঞানালোর উদ্যোগে বর্ষবরণ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু সপ্তাহব্যাপী আলোচনা সভা,গুণীজন ও কৃতি সংবর্ধনা, সংগীতানুষ্ঠান, নাটক, মুখাভিনয় সহ ব্যতিক্রমধর্মী মনোজ্ঞ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহা আয়োজন।
আগামী এপ্রিল মাসে চৈত্র সংক্রন্তির মধ্য দিয়ে এই মহামুনি মেলা শুরু হবে। এই দিন আদিবাসী আবাল বৃদ্ধ বণিতা বিভিন্ন যানবাহনে করে উৎসব প্রাঙ্গণ মহামুনি মন্দিরে বুদ্ধের কৃপা নিতে আসতে থাকবে। পূজা দিয়ে ও আনন্দ উল্লাস করে পুরনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করে নেন তারা। পাহাড়ী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা তেকে আগত পুণ্যার্থীদের স্বাগত জানাতে নানা আয়োজন করেছেন মন্দির কর্তৃপক্ষ।
চৈত্র সংক্রন্তির এই মহা আয়োজন নিয়ে মহামুনি গ্রাম উন্নায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবু অনুপম বড়–য়া বাবুল জানান, পাহাড়ী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা তেকে আগত আদিবাসীরা এখানে সকাল থেকে রাতভর অবস্থান করেন। সন্ধ্যায় তারা মহামুনি মন্দিরে পুজার মাধ্যমে বাংলা বর্ষকে বিদায় জানিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি পালন করেন। রাতে স্বনাম খ্যাত বিভিন্ন শিল্পী গোষ্ঠীর পরিবেশনায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
জানা যায়, আয়োজকরা সকালে স্থানীয় সংগঠন গুলোর যৌথ উদ্যোগে মন্দির অভিমুখী শোভাযাত্রার বর্ষবরণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সকাল ১০ টায় মহামুনি বটমূল খ্যাত ফণী-তটি মঞ্চ স্থানীয় সংগঠনের শিল্পীদের পরিবেশনায় মুক্তাঙ্গণ অনুষ্ঠান। একই স্থানে পর্যায়ক্রমে চলতে থাকবে স্থানীয় সংস্থা গুলোর বৃত্তি প্রদান, গুণিজন ও কৃতি সম্বর্ধনা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ নানা কর্মসূচী। সপ্তাহব্যাপী চলবে এই আয়োজন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুষ্টান বিকাল ৪ টায় শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মুখপাত্র ত্রৈমাসিক জ্ঞানালো’র ১৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও গুণীজন সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান।এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম এর বিশিষ্ট ব্যক্তি জনরা। সন্ধ্যা সাতটায় রয়েছে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, ‘চাইঙ্গা ঠাকুর’ নামের এক বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু এই বিহারে ১৮০৫ মতান্তরে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে মহামুনি অর্থাৎ মহামানব গৌতম বুদ্ধের মুর্তি স্থাপিত হয়েছে বলে এর নামকরণ করা মহামুনি মন্দির। এই মন্দিরটির কারণে মহামুনি গ্রাম ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ ধর্মারম্বীদের নিকট পবিত্র তীর্থ স্থানে পরিণত হয়। মহামুনি মন্দিটিকে কেন্দ্র করে মং সার্কেল রাজা ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে মহামুনি মন্দির চত্বরে মেলার প্রবর্তন করেন। যা বাংলা চৈত্র মাসের শেষ তারিখ থেকে শুরু হয়। এ মেলাটি মহামুনি মেলা নামে পরিচিতি লাভ করে। জানা যায়, একসময় মহামুনি মেলা এতই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে অবিভক্ত বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ হতেও এখানে জনসমাগম ঘটেছে।
সুপ্রাচীনকাল হতে মহামুনি বিহার প্রাঙ্গনের বিশাল এলাকা জুড়ে প্রচলিত হয়ে আসা ঐতিহাসিক মহামুনি মেলাটি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আদিবাসী-বাঙ্গালিদের এক মিলনমেলা। আদিবাসী-বাঙালির এই মিলন মেলাটি চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে সারাদেশের মধ্যেও পরিচিতি লাভ করেছে । ইতোমধ্যে এই মহামুনি মেলাকে ঘিরে মন্দির চত্বরে বিভিন্ন কারুশিল্প, হস্তশিল্প, রকমারি প্রসাধনী, হরেক রকম মিষ্টান্ন দ্রব্যাদি. মৌসুমী ফলফলাদি ও খাবার হোটেলসহ রকমারি জিনিসের স্টল নির্মান করতে শুরু করেছে বিক্রেতারা। মন্দিরের এই উৎসবকে ঘিরে পাহাড়তলীতে গোটা এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে আনন্দ উৎসব।
