সিটিনিউজ ডেস্ক : চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ৯ মাস আগে খুন হওয়া যুবলীগ নেতা এনাম হত্যাকাণ্ড রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
রবিবার (৭ জানুয়ারি) নগরীর বায়োজিদ থানার আতুরার ডিপু এলাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যতম আসামি নওশাদ আলীকে (২৫) গ্রেফতারের পর এই হত্যাকাণ্ডে কারণ এবং চাঞ্চল্যকর কাহিনী বেরিয়ে এসেছে বলে জানান পিবিআই কর্মকর্তারা।
নিহত এনাম ছিলেন ফটিকছড়ি উপজেলা আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি এবং এলাকার আজগর আলী পন্ডিত বাড়ির মো. সেকান্দরের ছেলে। মূলত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন এনাম।
গত বছরের ৭ মে বিকালে এনাম নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন পর একই উপজেলার ১৭নং জাফতনগর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুরের বায়তুল হুদা মাদ্রাসার ব্রিজের নিচে তের পারই খালের তীরে বস্তাবন্দী অবস্থায় এনামের অর্ধগলিত লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় প্রথমে ফটিকছড়ি থানা পুলিশ এবং পরে সিআইডি পৃথকভাবে তদন্ত করেও হত্যাকাণ্ডে কোন ক্লু বের করতে পারেনি। পরে এ মামলার তদন্তভার নেয় পিবিআই।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুক জানান, গত ৫ জুন পিবিআই নিজ উদ্যোগে মামলাটি তদন্তভার গ্রহণ করে। তদন্তে নেমে পিবিআই জানতে পারেন, ৭ মে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এনাম একই এলাকার তৌকিরহাট যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজ বাড়ি বের হয়। এরপর থেকে সে নিখোঁজ হয়ে যায়।
পুলিশ এবং পিবিআই সুত্র জানায়, নিখোঁজের পর সন্ধ্যায় তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তাকে ফোন করলে এনামের মোবাইলে রিং পড়লেও ফোনটি রিসিভ হয়নি। পরে বার বার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়ায় যায়নি। এক পর্যায়ে রাত ১২টার পর থেকে মোবাইলটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে অনেক খোঁজাখুজির পর এনামের খোঁজ না পেয়ে পরদিন (৮ মে) শারমিন আক্তার স্থানীয় ফটিকছড়ি থানার একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। ৯ মে সন্ধ্যা ৭টায় তেরপারই খালের তীরে বস্তাবন্দী অবস্থায় এনামের অর্ধগলিত মরদেহ পাওয়া যায়।
পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত শেষে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পরদিন এনামের মা হালিমা খাতুন বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ফটিকছড়ি থানায় মামলা করেন।
কিন্তু দীর্ঘ একমাস তদন্ত করেও পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডের কারণ কিংবা সন্দেহভাজন কাউকেও আটক করতে পারেনি। পরে এ মামলার দায়িত্ব দেয়া হয় সিআইডিকে। কিন্তু সিআইডিও একমাস তদন্ত শেষে এ হত্যার কোন তথ্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয়।
সর্বশেষ গত ৫ জুন মামলার তদন্তভার নিয়ে পিবিআই অনুসন্ধান শুরু করে। এবং এক মাসের মাথায় অন্যতম আসামি গিয়াস উদ্দিন সুজনকে (৩০) গ্রেফতার করে পিবিআই তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. শাহাদাত হোসেন। আদালতে সে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তার স্বীকারোক্তিতে ১৯ জুলাই অন্য আসামি মো. বেলালকে (৩১) গ্রেফতার করে পিবিআই।
পরদিন ২০ জুলাই আদালতে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দেয় বেলাল। সর্বশেষ গতকাল রবিবার (০৮ জানুয়ারি) বিকালে গ্রেফতার করা হয় এ হত্যাকাণ্ডের অপর আসামি নওশাদ আলীকে। পরে তার দেখানো মতে ফটিকছড়ি থানাধীন জাফতনগরস্থ ঘুলদের দোকানের কাছ থেকে এনাম হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সিএনজি (নং-চট্টগ্রাম-থ-১২-৮৯৯৩) উদ্ধার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামি নওশাদ আলী এনাম হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশকে জানায়, এনাম বিগত ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক প্রাপ্ত বর্তমান চেয়ারম্যান অহিদুল আলমের পক্ষ নেয়। এতে বিরোধী পক্ষের সাথে তার শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে আসামি সুজন ভিকটিম এনামকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
২০১৭ সালের ৭ মে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সুজন আসামি নওশাদকে ফোন করে সিএনজি চালক বেলালকে সঙ্গে নিয়ে সুজনের বাসায় যেতে বলে। বেলাল সুজনের বাসায় গেলে সেখানে এরশাদ এবং ফারুককে বসা দেখতে পায়। সুজন তাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে বলে জানায়। পরে সুজন ভিকটিম এনামকে ফোন করে তার বাসায় নিয়ে যায়।
এরপর বাসায় দ্বিতীয় তলায় সবাই মিলে এনামের হাত পা বেঁধে মুখে স্কচ লাগিয়ে গলাটিপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। লাশ বস্তাভরে সিএনজিতে করে নিয়ে তেরপারই খালে ফেলে দেয়। এ ঘটনার পর আসামিরা যার যার বাড়িতে চলে যায়।
