নিজস্ব প্রতিনিধি,বাঁশখালী :: বাঁশখালীতে আওয়ামীলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, গুলি বিনিময় ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুই গ্রুপে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঘটনায় ৩০ জনের মতো দলীয় নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এর অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ বলে জানা গেছে।
আহতদের মধ্যে মোহাম্মদ জামাল নামের স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের আঘাত গুরুতর। বর্তমানে জামালসহ মোট ১৭ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটনের অনুসারীদের মধ্যে সংঘটিত রক্তাক্ত সংঘাতের ঘটনায় বাঁশখালী উপজেলায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। তবে চট্টগ্রাম–বাঁশখালী সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক।
এদিকে নিজের সমর্থকদের দেখতে গতকাল রাতেই চমেক হাসপাতালে দেখতে যান আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটন। এসময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ হামলা প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান বাবুর আত্মার ওপর হামলা।
সংঘর্ষের বিষয়ে দক্ষিণ জেলা মহিলা লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক দিলোয়ারা কায়েস সুমি জানান, হামলায় মোট ১৭ জনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে– এরা সকলেই গুলিবিদ্ধ। তিনি আরো জানান, এ হামলা প্রয়াত আখতারুজ্জামান বাবুর ওপর হামলা। কারণ প্রয়াত এ নেতার স্মরণ উপলক্ষেই এ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। যাতে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তাঁর ভাগিনা আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটন। আহতদের মধ্যে ১৭ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাদের গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৮টার পর হাসপাতালে আনা হয়েছে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই শীলব্রত বড়ুয়া।
বাঁশখালী থানার ওসি আলমগীর হোসেন জানান, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চমেক হাসপাতালে দায়িত্বরত এএসআই শীলাব্রত জানিয়েছেন, বাঁশখালী থেকে আসা ১৭ জনের মধ্যে প্রায় সবাই ছররা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এসেছেন। এদের মধ্যে জামাল নামে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদিকে আমাদের বাশঁখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘটনার পর বাঁশখালী থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১১ জন। আর বাঁশখালীর একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি আছেন আরো ২ জন।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বাঁশখালী পৌর সদরের অদূরে সরল ইউনিয়নের পাইরাং এলাকায় সংঘাতের ঘটনা ঘটে। বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান এবং মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির লিটনের অনুসারীদের মধ্যে এই সংঘাতের ঘটনা ঘটে।
বাঁশখালীতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে গতকাল বিকাল ৩ টায় স্মরণসভা ছিল পৌরসভাস্থ গ্রিন পার্ক কমিউনিটি সেন্টারে। অনুষ্ঠানে আসার সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমপি সমর্থকরা। এতে প্রায় দেড় ঘন্টা প্রধান সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় প্রধান সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ৫ টার পর অনুষ্ঠানস্থলে প্রধান অতিথি হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ কবির চৌধুরী লিটন উপস্থিত হন। তিনি তার সমর্থিত লোকজনসহ অনুষ্ঠান স্থলে আসার পথে বাঁশখালী প্রধান সড়কের পাইরাং নামক স্থানে এমপি সমর্থিত রশিদ মেম্বারের নেতৃত্বে কতিপয় লোক গাছের গুঁড়ি ফেলে বাধা সৃষ্টি করে। এই খবর লিটন সমর্থিত কর্মীদের কাছে পৌঁছলে তারা সেখানে লাঠিসোটা নিয়ে জড়ো হয়। এ সময় দুই গ্রশুপের মধ্যে ইট পাটকেল নিক্ষেপ, পরবর্তীতে গুলিও ছোঁড়া হয়। লেগে যায় তুমুল সংঘাত। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) এ কে এম এমরান ভূঁইয়া জানান, পৌরসভার সামনে গ্রিনপার্ক কমিউনিটি সেন্টারে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর স্মরণসভার আয়োজন করেছিলেন আবদুল্লাহ কবির লিটন। তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে যাওয়ার পথে এমপির অনুসারীরা সড়ক অবরোধ করে আটকে দেয়। এসময় দুই পক্ষে পাল্টাপাল্টি গুলিবিনিময় হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবদুল্লাহ কবির লিটনকে ঠেকাতে বাঁশখালীর প্রধান সড়কের পাইরাং এলাকায় দেলাইয়ার দোকানের সামনে সড়ক অবরোধ করেন এমপির অনুসারীরা। দেলাইয়ার দোকানের সামনে লিটন আটকে পড়ার খবর পেয়ে তার অনুসারীরা অলি মিয়ার দোকানের সামনে জড়ো হয়। এসময় গুলিবিনিময় শুরু হয়। চলে ইট–পাটকেল নিক্ষেপ এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়াও।
এসময় পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আতঙ্কে লোকজন দ্বিগবিদিক ছুটতে থাকে।
সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের প্রায় তিন শতাধিক অনুসারী দা, কিরিচসহ দেশীয় অস্ত্র এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সড়কে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে লিটনের অনুসারীরাও সড়কে অবস্থান নেয়। পরে পুলিশ প্রহরায় আবদুল্লাহ কবির লিটনকে সভাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ৮টায় সভা শেষ করে লিটনকে আবারো পুলিশ প্রহরায় চট্টগ্রাম শহরের দিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বাঁশখালী থানার ওসি আলমগীর হোসেন জানান, সভা শেষ হওয়ার আগেই এমপির অনুসারীরা চলে গেছেন। সভা শেষ করে লিটন সাহেবও শহরের দিকে চলে গেছেন। সংঘর্ষের কারণে কিছুক্ষণ যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও পরে স্বাভাবিক হয়। তবে সংঘর্ষের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া দোকানপাট–ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর খুলেনি। রাস্তাঘাটে, স্থানীয় বাজারে লোকজন কমে গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বাঁশখালীতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
গুলিবিদ্ধ মো. জামাল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং উপজেলা তাঁতী লীগের সভাপতি। আহতদের মধ্যে আরো আছেন, আহমদ হোসেন (৪৫), সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ ফাহিম (১৭), মাঈনুদ্দিন (২৭), আবদুল্লাহ (১৭), অমিত চৌধুরী (২৮), হোসেন আহমদ (৩০), সাইফুল ইসলাম (১৮), মামুনুর রশিদ (৩৭), নিকন দেব (২২), আনোয়ার (২৮), গোপাল দাশ (৫০), শতদল বড়ুয়া (৩৫), মাহমুদুল ইসলাম বদি, মোহাম্মদ রাশেদ ও মোহাম্মদ বাদশা। অন্যদের নাম পাওয়া যায়নি। কারণ তাদের অধিকাংশই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
