চকরিয়ায় বির্তকিত ম্যাক্স হসপিটালের শাখা উদ্বোধনের পাঁয়তারা
শাহজাহান চৌধুরী শাহীন,কক্সবাজার: সাংবাদিকের শিশু সন্তান রাইফাকে চট্টগ্রামে ভুল চিকিৎসায় হত্যায় সমালোচিত ও মৃত্যুকুপ খ্যাত সেই ম্যাক্স হসপিটাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার তড়িগড়ি করে কক্সবাজারের চকরিয়া শাখা উদ্বোধনের পায়তারা চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ জন্য চকরিয়া থানা রাস্তার মাথায় সম্প্রতি নির্মিত পারভেজ ভবন নামে ৫তলা বিশিষ্ট একটি মার্কেট অগ্রিম ভাড়ায় নিয়েছে সেই ম্যাক্স হসপিটাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের সাথে সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার সহ সারা দেশে সাংবাদিক মহলে ম্যাক্স হসপিটাল নিয়ে তোলপাড় চলছে ।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক বিভিন্ন দপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির হাতে ম্যাক্স হসপিটালের চিকিৎসা সংক্রান্ত ১১টি ত্রুটি ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনের বেসরকারি হাসপাতালটিকে দেওয়া নোটিশে তিনটি বিভাগে বিধি মোতাবেক লাইসেন্স নবায়ন না করা, কতর্ব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের নিয়োগপত্র না থাকাসহ বিভিন্ন ত্রুটি উল্লেখ করা হয়।
গত রোববার ম্যাক্স হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে ঢাকায় ফিরে ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন বুধবার ম্যাক্স হাসপাতালকে ত্রুটিবিষয়ক নোটিশ দিয়ে বিস্তারিত তথ্য ১৫ দিনের মধ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্যথায় হাসপাতালের কার্যক্রমসহ লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়। ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন নোটিশ পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন।

নোটিশের অনুলিপিতে দেখা যায়, তিনি হাসপাতাল, প্যাথলজি ও ব্লাড ব্যাংক-তিনটি বিভাগে ১১টি ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন। ম্যাক্সের অনুকূলে লাইসেন্স নবায়নের জন্য নতুন নবায়ন ফরমে আবেদন করা হয়নি, তাদের ১৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকলেও তাদের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের কোন নিয়োগপত্র পাননি।
এছাড়া, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ক্লিনার ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। একইসাথে ম্যাক্সের প্যাথলজি বিভাগের অনুকূলেও নতুন নবায়ন ফরমে আবেদন হয়নি যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিধিমোতাবেক নয়। প্যাথলজির রিপোর্ট প্রদানকারী চিকিৎসক, প্যাথলজিস্ট ও মেডিক্যাল টেকনলিজস্টের কোন তথ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে পাওয়া যায়নি বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া হাসপাতালে কোনো ব্লাড ব্যাংক নেই বলেও উল্লেখ আছে। গলা ব্যথা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার বিকালে নগরীর মেহেদীবাগের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হওয়া দৈনিক সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার রুবেল খানের শিশুকন্যা রাইফা গত শুক্রবার রাতে মারা যায়।
অভিযোগ ওঠে কতর্ব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। এর বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের সাংবাদিকেদের বিক্ষোভের মুখে পুলিশ ওই হাসপাতালের ডিউটি চিকিৎসক ও নার্সকে থানায় নিয়ে গেলে সেখানে সাংবাদিক ও সিইউজে নেতাদের সঙ্গে ফয়সাল ইকবাল ‘অশোভন আচরণ করেন’ বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাইফাকে হত্যা করা হয়েছে’ অভিযোগ তুলে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন সহ অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনগুলো আন্দোলন এবং দায়ীদের বিচার দাবি করে আসছে। দাবির মুখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নোটিশের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন এবং একাধিক মানববন্ধন করেছে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং কক্সবাজারে সাংবাদিক ইউনিয়ন, পরিবর্তন চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।
মানববন্ধনে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে ‘ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায়’ সাংবাদিক রুবেল খানের মেয়ে রাইফার অকালমৃত্যু হয়েছে দাবি করেছেন কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের চৌধুরী।
তিনি বলেন, আর যেন ভুল চিকিৎসার কারণে কোন মায়ের বুক খালি না হয়। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় আর কোন বাবাকে যেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতে না হয়। ভবিষ্যতে শিশুদের অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতেই রাইফা হত্যার বিচার হওয়া জরুরী। এ উপলক্ষে শুক্রবার (৬ জুলাই) আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশ কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিবিইউজে-র সভাপতি আবু তাহের চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন।
আবু তাহের চৌধুরী বলেন, সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা এই হাসপাতাল একটি মৃত্যুকূপ। এখানে অতীতে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় অনেক রোগীর অকালমৃত্যু হয়েছে। তাই অচিরেই হাসপাতালটি বন্ধ করতে হবে।
কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ সরওয়ার সোহেল বলেন, চিকিৎসক ও সেবিকার ভুল এবং হাসপাতালেই অবহেলায় একটি শিশুর অকালমৃত্যু হল। এ নিয়ে সকলের দুঃখ প্রকাশ করার কথা। সমবেদনা জানিয়ে সন্তান হারা বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর কথা। অথচ তা না করে ম্যাক্স হাসপাতালের যোগসাজসে কিছু ডাক্তার এই মৃত্যু নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। সাংবাদিকদের চিকিৎসা বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তারা মানুষ কিনা এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। কত বড় নির্লজ্জ হলে একজন মানুষ খুনীর পক্ষে কথা বলতে পারে। আমরা এমন চিকিৎসকের বিচার চাই যারা রাইফার মৃত্যু নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে।
কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক দীপক শর্মা দীপুর সঞ্চালনায় বিইউএফজে কেন্দ্রীয় সদস্য আয়াছুর রহমান বলেন, রাইফা আমাদের সন্তান। আমরা আমাদের সন্তান হত্যার বিচার পেয়েই বাড়ি ফিরব। যেসব চিকিৎসক হুমকি দিয়েছেন আপনারা সাংবাদিকদের চিকিৎসা করবেন না তাদের বলতে চাই, মানবসেবা করার ব্রত নিয়ে যদি এ পেশায় থাকতে পারেন তবে থাকুন। নতুবা সসম্মানে বিদায় নেন।
কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়েনের সিনিয়র সদস্য এ.এইচ.এম এরশাদ বলেন, আপনারা প্রাইভেটে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, গ্রামে বদলি হয়ে যান না। কিন্তু সেই আপনারা মানবতার কথা বলেন, সেবার কথা বলে সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা আদায় করে নেন। তাই আপনাদের বলছি, দয়া করে মন মানসিকতা বদলান। না হয় পস্তাতে হবে একদিন। কিছু কিছু চিকিৎসক রোগীকে সেবার বদলে তাদের পকেটের দিকে তাকিয়ে থাকে। কন্ট্রাকে চিকিৎসা দেয়। এমন মানসিকতা পরিহার করুন।
সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, সাংবাদিকের শিশুকন্যা রাইফার ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলবে এবং কেউ সাংবাদিক সমাজকে চিকিৎসক সমাজের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করলে তার সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।
জানাগেছে, চকরিয়া পৌরসভার থানা রাস্তার মাথা এলাকার ফায়ার সার্ভিস অফিস সংলগ্ন জনৈক পারভেজ উদ্দিনের মালিকানাধীন ৫ তলা বিশিষ্ট পারভেজ ভবনটি ভাড়া নিয়েছে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হসপিটাল। তারা ওই ভবনে ম্যাক্স হসপিটাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার নামে চকরিয়া শাখা শীঘ্রই শুভ উদ্বোধন করা হচ্ছে নাম দিয়ে ভবনের সামনে কয়েকটি ডিজিটাল সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়েছে এবং নানাভাবে প্রচার প্রচারণাও নেমেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চকরিয়ায় কারা এই ম্যাস্ক হসপিটালটি পরিচালনা করছে নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ম্যাক্স হসপিটাল নামে নতুন একটি মৃত্যুকূপ চকরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হোক আমরা চাইনা। তাদের ইতিপূর্বে সামগ্রিক কর্মকান্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
দেশব্যাপী সাংবাদিক সমাজসহ সর্বত্রে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তাই এই হসপিটালটি প্রতিষ্ঠার পূর্বেই বন্ধ করে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান। অন্যথায় যেকোন পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় সাধারণ জনগণ দায়ী থাকবেনা বলে হুশিয়ারী দেন।
