সিটি নিউজ ডেস্কঃ বিশ্ব মঞ্চে আর এক গ্রেটা থানবার্গ রেবেকা। স্পেনের মাদ্রিদে চলছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। সেখানে বিশ্বনেতারা আলোচনা করছেন মানবজাতির সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট নিয়ে। সম্প্রতি সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থানবার্গ পৃথিবীর সুরক্ষার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনে দায়ী বিশ্বনেতাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করা এই জলবায়ুকর্মী একত্রিত করেছেন লাখ লাখ শিশু-কিশোরকে। গ্রেটার ডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটনে জড়ো হয়েছিলো ২ লাখেরও বেশি মানুষ। যাদের সামনের সারিতে ছিলো বাংলাদেশি কিশোরী রেবেকা শবনম।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা ১৬ বছর বয়সী এ কিশোরী রেবেকাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত শবনমের চেষ্টা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সে বিষয়ে সবাইকে জানানো। আর তাই নিউ ইয়র্কের ওই সমাবেশে হাজারো মানুষের সামনে সে বলেছে, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।’ বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে সে।
নিউ ইয়র্কের একটি হাইস্কুলের শিক্ষার্থী রেবেকা আলজাজিরাকে বলেছেন, আমি শুধু ভাবতাম এই বিশাল সমাবেশে কিভাবে বাংলাদেশের নাম তুলে ধরবো। যেটিকে শুধু ক্রিকেটের জন্যই মানুষ চেনে। তবে আমার বক্তৃতার সময় সবাই চিৎকার ও করতালি দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভেবেছিলাম যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হবে তখন সবাই চুপ থাকবেন। তবে সবার সাড়া দেখে আমি নিজেই অবাক। এটা শুধু পরিবেশগত সংকট না। এটা মানবাধিকার সংকটও। বাংলাদেশের নারীরা পাচারের শিকার হন আর এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও বেড়েছে। আমরা বাংলাদেশে থাকা নারী ও রোহিঙ্গাদের জানাতে চাই, তাদের জীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে আন্দোলন করছি আমরা।’
রেবেকা আশা করছে, এবারের জলবায়ু সম্মেলনে আরো জরুরি পদক্ষেপ নেয়া হবে। সে বলে, আমরা চাই, এই সম্মেলনে যেন শুধু প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নোট নেয়া না হয়। বরং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধে যেন পদক্ষেপ নেয়া হয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারসহ উন্নয়নের নামে পরিবেশবিধ্বংসী প্রবণতা বজায় রাখা হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ংকর ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে দেশের নারী, শিশু ও রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।
ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাদের জন্য কিভাবে সুবিচার নিশ্চিত করা যায়, সেটাই রেবেকার চিন্তার মূল বিষয়। তিনি জানিয়েছে, জলবায়ু আন্দোলনে বাংলাদেশের কথা কেউ যেন ভুলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে লড়াই চালিয়ে যাবে সে।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট ঝুঁকির কারণেই ১৬ কোটি মানুষের অনেকেই অভিবাসনের আশ্রয় নিচ্ছেন। ছেড়ে আসছেন নিজ এলাকা, ফলে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এতে শহরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাচারকারীরা শিশু ও নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। চলতি বছর জুলাইয়ের জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীদের ঘর ছেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। আর এতে পাচার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন তারা।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাপক শাকিল ফয়জুল্লাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এ বিষয়টি আসলে নীরব ঘাতক। প্রতিদিনই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কিছু দেখা যাচ্ছে না।গত এপ্রিলে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ কোটি ৯০ লাখ শিশু জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘এই শিশুরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হওয়ায় তাদের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যখনই কোনো বন্যা হয়, তখন স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হয়। বিশেষ করে টিউবয়েল ভেঙে যায়, স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। একজন শিশু যদি স্বাস্থ্যসেবা না পায়, শিক্ষা না পায়, এমনকি খাবার পানি না পায়, তাকে আপনি আর কী দেবেন?’
সেপ্টেম্বরে শবনমের দেয়া বক্তব্যে তুলে ধরেছিলেন কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তৈরি হয় আর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, নারী ও রোহিঙ্গারা বিশেষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার।
ব্র্যাকের ইমারজেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্রিপেয়ার্ডনেস-এর পরিচালক মইন উদ্দিন আহমেদ বলেন, নারীরা তো সাংস্কৃতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেনই, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তাদের ওপর বেশি। পুরুষ সদস্য সহজেই অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন কিংবা বাইরে ছোটাছুটি করছেন। এতে করে সংসারের সব চাপ নারীদের সামলাতে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেয়ার দাবিতে ২০১৮ সালে প্রতি শুক্রবার সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে অবস্থান নেয়া শুরু করেন স্কুলছাত্রী গ্রেটা থানবার্গ। তার এই অবস্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে বেগবান হয় জলবায়ু আন্দোলন। সম্প্রতি তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে দুনিয়াজুড়ে এই আন্দোলনে শামিল হন লাখ লাখ মানুষ। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ আয়োজিত এক সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বনেতারা যথাযথ ভূমিকা রাখছেন না অভিযোগ করে তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলেন এই জলবায়ুকর্মী। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রেবেকা শবনমও গ্রেটার মতো করেই অনেক পথ পাড়ি দিতে চান।
এখনও স্কুলজীবন শেষ হয়নি শবনমের। তিনি মনে করেন, সামনে হাঁটতে হবে আরও অনেক পথ। ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্বের দরবারে কীভাবে সুবিচার প্রত্যাশা করা যায়, সেটাই তার চিন্তার মূল বিষয়। আল জাজিরাকে শবনম জানিয়েছেন, জলবায়ু আন্দোলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ কেউ যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করতে লড়াই চালিয়ে যাবেন তিনি। রেবেকা পরিবারের সাথে নিউ ইয়র্কে বসবাস করে। ছয় বছর বয়সের সময় পরিবারের সাথে যুক্তরাষ্ট্র যায় সে।
