সিটি নিউজঃ ‘মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বীর বাঙালীর অহংকার’ এই শ্লোগান হৃদয়ে ও চেতনায় ধারন করে ১৯৮৯ সালের পর বিগত ৩১ বছর যাবৎ মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার আয়োজন আন্দোলন সংগ্রামের সূতিকাগর এই চট্টগ্রাম থেকে হয়ে আসছে। যা আজ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছড়িয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক করোনা মহামারি প্রাদুর্ভাবের ফলশ্রুতিতে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের আপামর নাগরিকের জনস্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা ভেবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে এবারের বিজয় মেলার আয়োজন করা হচ্ছে।
আজ বুধবার (৯ ডিসেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিজয় মেলা পরিষদ মহাসচিব মোহাম্মদ ইউনুছ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বিজয় মেলা পরিষদ মহাসচিব মোহাম্মদ ইউনুছ। সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিজয় মেলার কো-চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নঈদ উদ্দিন চৌধুরী, হাসিনা মহিউদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন রাশেদ, জাহাঙ্গীর আলম, পাল্টু লাল সাহা, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মাহমুদুল হক, ফরিদ মাহমুদ, প্রদ্বীপ খাস্তগীর, শেখ নাছির আহমেদ, শ্রমিক স্কোয়ার্ড সদস্য সচিব আবুল হোসেন আবু, দেলোয়ার হোসেন দেলু, হাবিবুর রহমান তারেক, নগর ছাত্রলীগ সাধারন সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা প্রগতিশীল মন-মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ সকলের কাছে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সু-প্রতিষ্ঠিত। সূদীর্ঘ ৩১ বছরে চলার পথে দেশের সামাজিক, সাংষ্কৃতিক রাজনৈতিক এবং দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াও কখনো তার গতি দুর্বার, আবার কখনো শ্লথ ছিল। কখনো কখনো এ আয়োজন থমকে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আসন্ন শীতকালীন করোনা পরিস্থিতির দ্বিতীয় ওয়েব মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞদের উপায় খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এরূপ অবস্থায় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে বিশাল লোক সমাগমের অনুষ্ঠানগুলো পরিহার করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অনুষ্ঠানে এই আয়োজন সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা ইতিপূর্বে অসংখ্য স্বার্থক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। চট্টগ্রাম আউটার স্টেডিয়ামে মৃৎ ও কুটির শিল্প, পাটজাত দ্রব্যসহ পণ্য মেলার আয়োজন করতো।
এবার করোনা সংক্রমন থেকে আগাম সতর্ক থাকতে এই আয়োজনগুলো বর্জন করা হল। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমুলক আলোচনা অনুষ্ঠান ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজন। এছাড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশু কিশোরদের চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগীতা, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শন, কৃতি ছাত্রছাত্রীদের সম্বর্ধনা, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাম্পান প্রতিযোগীতা, ফুটবল টুর্নামেন্ট, বিজয়ের বইমেলা, চিত্র প্রদর্শনী, শিখা প্রজ্জ্বলন, বর্ণাঢ্য বিজয় র্যালী, নারীছাত্র-যুব-মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ।
এতদ্বসব স্বার্থক আয়োজন বন্ধ রেখে আগামীকাল ১০ ডিসেম্বর ২০২০ বিকেল ৩ টায় এম এ আজিজ স্টেডিয়াম গোলচত্ত্বর সম্মুখে মুক্তিযুদ্ধের শিখা প্রজ্জ্বলন ও জাতীয় এবং সংগঠনের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মেলার কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন, ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসের আলোচনা সভা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা। ১৫ ডিসেম্বর বিজয় মেলার প্রয়াত মাননীয় চেয়ারম্যান, চট্টলার সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা চট্টলার গণমানুষের প্রিয় নেতা আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী পালন এবং ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের আলোচনা সভা এতেই সমাপ্ত হয়ে যাবে এবারের বিজয় মেলার আয়োজন।
দেশের রাজনৈতিক বর্তমান প্রেক্ষাপট আমাদেরকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। করোনা মহামারির কারণে এমনিতেই দেশের অফিস-আদালত কার্যক্রম স্থিমিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, মানুষের ব্যবসা-বানিজ্য আয় উপার্জন স্থবির। একদিকে করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশের সকল শ্রেণীপেশার মানুষ যে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করছে তা কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের সকল সম্প্রদায়, সরকারী বেসরকারী-ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানসহ সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে ত্রান সাহায্য, উৎসব ভাতা-প্রণোদনা দিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মান্ধ, মৌলবাদ গোষ্ঠী তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের জন্য নিরাপদ সময়, এবং উত্তম ইস্যূটি টার্গেট করেছে।
শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সন্তান বাঙালি জাতির জনক মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ২০২০ মুজিববর্ষ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিব বর্ষের গুরুত্বপূর্ণ নানান কর্মসূচী স্থগিত করেছে। আগামী বছর ২০২১ সালে জাতী
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তি পালন করবে। এরূপ পরিস্থিতিতে স্বাধীনতা বিরোধী, ৭১ এর ঘাতক-দালাল, যুদ্ধাপরাধিরা তাদের দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের যোগসাজেশে সুকৌশলে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে টার্গেট করেছে। এদের পূর্বসূরীরা ৬৬টির ছয় দফা আন্দোলনে ৬৯ এর গণ অভ্যূত্থানে, ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামেও বঙ্গবন্ধুকে টার্গেট করেছিল। ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট কালো রাত্রিতে তারা বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করেও ক্ষান্ত হয়নি। ধর্মের অপব্যাখ্যা করে তারা “ভাস্কর্য এবং মূর্তি” নিয়ে ফতোয়া দিয়ে এ দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়।
মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার চেয়ারম্যান, তরুণ প্রজন্মের অহংকার মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এম.পি তার পিতা চট্টলার সিংহ পুরুষ আলহাজ্ব এ.বি.এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ন্যায় মৌলবাদ প্রতিরোধে চট্টগ্রাম থেকে প্রথম সোচ্ছার হয়েছেন। পরবর্তীতে এই প্রতিরোধ কর্মসূচী সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা চট্টগ্রামবাসী, চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা পরিষদ, চট্টগ্রাম বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার পরবর্তী প্রজন্ম তার সাথে আছি। দেশমাতৃকায় বৃহত্তর প্রয়োজনে যদি জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, ৭১ এর পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে মাঠে সদলবলে নামতে হয়। তাদের মোকাবেলায় সর্বদা আমরা প্রস্তুত।
বঙ্গবন্ধু এ দেশের আলেম-উলামাদের অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন। একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সর্বদা সচেষ্ট থাকলেও আলেম সমাজের সাথে কখনো উনার মতদ্বৈততা হয়নি। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। বিশ্ব এজতেমার জন্য টঙ্গিতে সরকারী জায়গা বরাদ্দ দেন। কাকরাইল মসজিদের সম্প্রসারণের জন্য জমি বরাদ্দ দেন। আরব-ইসরাইল যুদ্ধে আরব বিশ্বের পক্ষে সমর্থন দেন। ও আইসি সম্মেলনে যোগদান ও মুসলিম বিশ্বের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। আলেম সমাজের কল্যাণে এমন অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সংস্কার কাজ বঙ্গবন্ধু করে গেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও তার পিতার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করছেন।
১০০০ টি বেসরাকারী মাদ্রাসার একাডেমিক ভবন নির্মাণ, ইমাম মোয়াজ্জেম ট্রাস্ট কল্যাণ গঠন, অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসা-পাঠাগার নির্মাণ, আল-কোরআনের ডিজিটালাইজেশন হজ¦ ব্যবস্থার আধুনিকরণসহ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছেন। আমরা নিশ্চিত, করোনা পরিস্থিতি এবং বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও মূর্তিকে ইস্যু করে যারা ফায়দা হাসিল করতে চায় তারা পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুসারী প্রকৃত আলেম নয়। তারা উগ্র ও পাশবিক মন মানসিকতার কাটমোল্লা।যারা ধর্মের কোমল অনুভূতি, দুর্বল ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে ব্যবহার করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়। আমরা এ মোল্লাদের বিরুদ্ধে। আমরা সকল সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী। এর ব্যর্তয় হলে আমরা রুখে দাঁড়াবো। যেভাবে ৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সবাই সুস্থ-সুন্দর-নিরাপদে থাকুন।
