এসএম ইউসুফ-একজন রাজনীতির কারিগরের বিদায়

0

শৈবাল বড়ুয়া : এস এম ইউসুফ গত রাতে ঢাকায়, না ফেরার দেশে চলে গেলেন। বিছানা না ছাড়তেই পটিয়া থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী মাহাবুবুর রহমানের পোষ্টে এই শোক বিদারক সংবাদটি পেলাম।এধরনের ব্যাক্তিদের মৃত্যুতে বাংলাদেশের ইতিহাস নামক বৃক্ষটির এক একটি পাতা ঝড়ে যাচ্ছে। পটিয়া হাবিলাসদ্বীপ হাই স্কুলে পড়াকালীন সময় হতে ছাত্রলীগের সাথে তিনি জড়িত হন।পাণ্ডিত্য, বাগ্মিতা,সাহস,সুন্দর অবয়ব,তাকে দ্রুত রাজনৈতিক ময়দানে সফলতা এনে দিয়েছিল।

পটিয়ার মনসা অজ পাড়াগাঁয়ের এই সন্তান, সারা বাংলাদেশে চষে বেরিয়েছিলেন।বড় ভাইদের মুখে শুনেছি ৬৯ এর গণ আন্দোলনের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য।আর ৭৫ পরবর্তী সাহসী ভূমিকা নিজেইতো দেখেছি।আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়ীত্ব নিয়ে তিনি সারাদেশ ঘুরেছেন।তার বাচনভংগী, কন্ঠ,শব্দচয়ণ,ঐতিহাসিক ঘটনা,তত্ব মিশ্রিত বক্তব্যের কারণে তাঁর ডাক পড়ত সর্বত্র। বঙ্গবন্ধু তাকে খুব স্নেহ করতেন।লালদীঘিতে এসময় এক ছাত্রজনসভায় তার অনল বর্ষিত বক্তৃতার পর তৎকালীন ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতা নূরে আলম সিদ্দীকি বলছিলেন “আমি যদি কবি নজরুল হতাম তবে ইউসুফ হতো আমার বিষের বাঁশী”।
আমাদের সমকালীন ছাএলীগ নব্য নেতা কর্মীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর বক্তৃতা শুনতাম।ধন সম্পদ তার ছিলনা।হাটাজারী নিবাসী প্রয়াত জাফর চৌধুরী থাকতেন ঢাকায় ৭৫এর পরে তার বাসায় বড় ট্রাঙ্কে ইউসুফ ভাই গোপনে এসে মার্শাল ল বিরোধী, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের লিপলেট পোষ্টার জমা রাখতেন। পরে অন্যরা এসে এগুলো অল্প অল্প করে নিয়ে যেতো। তার সাংকেতিক নাম দিয়েছিলেন ট্রাঙ্ক।তিনিও পরে দুবাই ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিন জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এম এ জাফর দুবাই এলে আমরা তিনজন একত্রিত হলে এই বীরত্ব কাহিনী শুনেছিলাম।
৭৮/৭৯ তে যখন ছাত্রলীগের হাওয়া গায়ে নিয়ে শাসন বারণ না মেনে অজেয়কে জয়ের রোমাঞ্চ নিয়ে ছুটছি তখন দেখতাম তিনি ঢাকা থেকে চাঁটগা আসলেই তাঁর আশে পাশে প্রচন্ড ভিড় লেগে থাকতো।তার হাতে উঠে আসা উত্তর, দক্ষিণ,মহানগরী,বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতারা তখন দাপট নিয়ে চলছে,এই ধারায় সংপৃক্ত থাকায় তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ হয়।আমি ৮২তে পটিয়া থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর ঘনিষ্টতা বাড়ে।তাঁর উপস্থিতিতে কতো বক্তৃতা দিয়ে তাঁর প্রশংসা শুনে উৎসাহ পেয়েছি। ঢাকায় গেলে কলাবাগানে তাঁর বাসায় বহুবার অনেককে দেখেছি তাদের এমন কয়েকজন মন্ত্রী, এমপিও হয়েছেন। আমার দৃষ্টিতে তাঁর প্রচন্ড জেদ আপোষহীনতা তাঁকে রাজনীতির পেছনে নিয়ে যায়।

১৯৯৫ সালে তিনি চাঁটগা এলেন আমাকে খুঁজে বের করে আনার দায়ীত্ব দিলেন বন্ধু ওয়াহিদকে।তলবের কারণ সেও জানেনা। তার সঙ্গে হোটেল গোল্ডেন ইনে গেলাম ভীরু মনে। তিনি একটা পেপার বের করে দিয়ে বললেন এটা একটা সাক্ষাৎকার এগুলো ঠিক করে দাও,আর এর রেফারেন্স বুক যোগার করে দাও।রাতে আবার একা তার কাছে গেলাম।একটা প্রশ্ন করলাম তাঁর উত্তরটা আমার পছন্দ না হওয়ায় তর্কতে জড়িয়ে গেলাম।
আমি রাগ নিয়েই চলে এলাম। আওয়ামীলীগ ৯৬ সালে সরকার গঠন করার পর ঢাকা সম্রাট হোটেলে একবার উনাকে একা পেয়ে বললাম ইউসুফ ভাই সেদিনের তর্কে আমি জিতে গেছি। তিনি হেসে বলেছিলেন রাজনীতিতে তুমি পরিপক্ক হয়েছ। আমি বলেছিলাম এই উত্তরটাও আমার পছন্দ হলনা।হেসে তিনি কাঁধে হাত দিয়ে বললেন তোমার রুম কোনটা খোল বসি।ভিতরে গিয়ে আমার নতুন কেনা বইগুলো দেখে বললেন এইগুলো পড়ে অভিজ্ঞতা প্রয়োগের জায়গা পাবেনা।তার একথাটা সত্য প্রমানিত হয়েছে। কিছুক্ষণ পর রিসেপশন কাউন্টার থেকে লোক এসে উনাকে ডেকে নিয়ে গেলেন।
পটিয়া পৌরসভা নির্বাচনের সময় আমি এক বন্ধুকে ফোন করলে ফোন রিসিভ করলেন উনি।কথা প্রসঙ্গে জয় পরাজয় নিয়ে আমি তর্কে জড়িয়ে পড়লাম,আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে বললাম আমিই জিতব। পরে উনার বাসায় ফোন করে বললাম আবারো আমিই জিতলাম।উনি ঢাকা গেলে বাসায় যেতে বললেন।

২০০১ এর সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী পদ পাওয়ার জটিলতার সময়ে দুবার খবর দিয়েও আমাকে নিতে পারেননি।কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম উলু বনে মুক্তা ছড়ানোর কাজে তাকে অনেকেই প্ররোচনা দিচ্ছেন। আর দেখা হয়নি।১৯৯৬ তার ভুলের কারণে পিটুনি খেয়েছিলাম সুধাসদনের সামনে। মগা খাচিয়ত নিয়ে আমি এজন্য তার কাছে ক্ষোভও জানিয়েছিলাম।
আজ তাঁর চির বিদায়ের সংবাদে মনে তাৎক্ষনিক ভিড় করা কথাগুলো ব্যাক্ত করলাম। আজ বুঝতে পারি সব সফলতা সবার জন্য নয়।
ইউসুফ ভাই স্নেহ বিশ্বাসের মূল্য আমি হয়তো সব আপনাকে দিতে পারিনি তাই ক্ষমাপ্রার্থী।আপনার পরিপাটি পোষাকের সুন্দর বিমোহিত মুখায়ব মনে ছিল, মনে থাকবে আমৃত্যু।আপনার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

লেখক : দুবাই প্রবাসী

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.