এম আনোয়ার হোসেন, মিরসরাই : মিরসরাইয়ে এবার অর্জিত হবে না আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে আমন ধান ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার কারণে এই সংশয় দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপজেলার প্রায় ৮শ হেক্টর আমন ধানের জমি পানিতে ডুবে গেছে। ধান বের হওয়ার সময়ে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষকদের মধ্যে চরম দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র পূরণ না হওয়ার পাশাপাশি খরচ নিয়ে এবার কৃষকরাও লোকসানের মুখে পড়বে বলে ধারণা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। ধান ছাড়াও ক্ষতির মুখে পড়েছে শীতকালীন সবজি চাষীরা। উপজেলা প্রায় ৮০ হেক্টর জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে দাবি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের।
জানা গেছে, আমন চারা লাগানোর সময় একের পর বন্যার ফলে প্রথম দফায় একবার ক্ষতির মুখে পড়ে কৃষক। তখন অনেক জমিতে লাগানো আমনের চারা বন্যায় পানিতে পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। বন্যায় পানি নেমে গেলে আবার জমিতে আমনের চারা লাগান কৃষকরা। এরপর অনুকূল আবহওয়ার কারণে কৃষকদের চোখে মুখে ভালো ফসল উৎপাদন হওয়ার স্বপ্ন ভেসে উঠে। চলতি মাসে অধিকাংশ জমিতে আমন ধান বের হওয়ার সময় ঘূর্ণিঝড় নাডার প্রভাবে শুরু হয় বৃষ্টিপাত। টানা বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার ফলে আমন ধানের চারা মাটিতে পড়ে যায়। বের হতে থাকা ধানের ফুলগুলো বাতাসে ঝড়ে পড়ে। এযেন কৃষকের সোনালী স্বপ্ন মাটিতে ঝড়ে পড়ার মতো।
উপজেলার ১২ নম্বর খৈইয়াছড়া ইউনিয়নের মসজিদিয়া গ্রামের কৃষক নুর নবী বলেন, তিনি বাণিজ্যিকভাবে হাইব্রীড জাতের ধানের চাষ করেন। মাত্র ধানের ফুলসহ ছড়া বের হওয়ার সময় তার প্রায় ২ একর জমির ধান বাতাসে মাটিতে পড়ে যায়। ওই ধান এখন আর পুষ্ট হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। ওই দুই একর জমি চাষ করতে তার প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
কৃষক কাজল দাস জানান, আমন চাষের শুরুতে বন্যার কারণে একেকটি জমি দুইবার করে চারা লাগাতে হয়েছে। এরপর এখন ধান বের হওয়ার সময় বৃষ্টি ও বাতাসের কারণে ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ধানের গাছ বাতাসে পড়ে যাওয়ায় ও পানি ডুবে থাকায় ধান অপুষ্ট (ভূষি) হয়ে যাওূয়ার আংশকা রয়েছে। ফলে কৃষকরা চাষের খরচও তুলতে পারবে না।
উপজেলা কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলার ২০ হাজার ৪’শ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬১ হাজার ২’শ টন (চাল হিসেবে)। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে প্রায় ৮শ হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রায় ১৮০ হেক্টর জমির আমন ধান সম্পন্ন নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভবনা বেশি। এদিকে বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে উপজেলার প্রায় ৮০ হেক্টর জমির বরবটি, শীম, লাউ, চিচিঙ্গা, করলা, খিরা, টমেটো, ঢেড়স, ঝিঙ্গাসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজি।
ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের শীতকালীন সবজি চাষী দেলোয়ার হোসেন বলেন, মাত্র কয়েকদিন জমি থেকে বরবটি তুলে বাজারে বিক্রি করেছি। ভালো দামও পাওয়া গেছে। কিন্তু অসময়ে বৃষ্টি ও বাতাসে বরবটির সব খুঁটি ভেঙ্গে জমির সাথে মিশে গেছে।
ঢেড়স চাষী আব্দুল হান্নান বলেন, ঢেড়স গাছগুলোতে মাত্র ঢেড়স ধরা শুরু হয়েছে। বৃষ্টির কারণে সব ঢেড়স গাছ থেকে ঝরে গেছে। পানি টানতে শুরু করলে গাছও মারা যাবে। তিনি এক একর ঢেড়স চাষ করছেন। এখন পুরোটায় লোকসান গুনতে হবে।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ জানান, উপজেলার প্রায় ৮শ হেক্টর আমন ধান ও ৮০ হেক্টর সবজি ক্ষেত বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। তিনি বলেন, অসময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষক যেমন লোকসানে পড়বে তেমন আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে না।
