বিমানের গাফেলতি ও দায়ীত্ত্বহীনতার দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তিই পারে একটি নিরাপদ যাত্রার প্রতিশ্রুতি দিতে

0

এস এম মনসুর নাদিম – 
গাফেলতি ও দায়িত্ব হীনতার কারনে একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স। এই লোকসানি খাতটা শুরু থেকেই চেটে-পুটে চাটার দলেরাই খাচ্ছে। সরকার বদল হয়, হয় ক্ষমতার পালা বদল, মন্ত্রী আসে মন্ত্রী যায়,কিন্তু বিমানের অবস্থা তথৈবচ। গত ২৭ নভেম্বর ২০১৬ হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে বিশ্ব পানি শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী ও তার সফর সঙ্গীদের বহনকারী বাংলাদেশ বিমান যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে তুর্কমেনিস্তানের আশকাবাদ বিমান বন্দরে জরুরী অবতরন করতে বাধ্য হয়।

ওই বিমানে ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সহ ৯৯ জন যাত্রী। এছাড়া ২৪ জন ক্রু ও ৪জন এয়ার ক্রাফট ইঞ্জিনিয়ারও ছিলেন ওই বিমানে।এই ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘ সেখানে যারা কাজ করেছেন তারা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়’ কিংবা ‘ প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে’ ওই নাটটি ধরেছিলেন বা লুজ করেছিলেন। সেটা পরে ঠিক করা হয়েছে কি না, দায়ীত্ত্বশীল কোন ইঞ্জিনিয়ার তা দেখেননি, যদিও তা তার দায়িত্ব ছিল। প্রধান মন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের ত্রুটির ব্যাপারে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেও প্রধান মন্ত্রী এটাকে প্রথমে যান্ত্রিক ত্রুটি বললেও পরে তিনি সংসদে বলেছেন, বিমানের স্ক্রু ঢিলার ঘটনা ঘটেছে।

বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে আমরা তথ্য নিয়েছি। তারা বলেছে, আমাদের ছয়হাজার প্লেন বিশ্বব্যাপী চলছে। এ ধরনের ঘটনা আজ পর্যন্ত কোথাও ঘটেনি।কাজেই সন্দেহ করা হয়, এটা কোন টেকনিক্যাল ব্যাপার নয়, এটা মনুষ্য সৃষ্ট। যে কোন ভাবেই হোক কোন মানুষের দ্বারা এটা করা হয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নেই। তদন্ত সংশ্লিষ্টরাও বলেছেন, সেদিন উড়োজাহাজটিতে জ্বালানি বা ফুয়েলের কোন সমস্যা ছিলনা।

ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিক্যাণ্টের ট্যাংকের একটি নাট ঢিলা হয়ে গিয়েছিল। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। ১৯৭৫’র ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বিদেশে অবস্থান হেতু সৌভাগ্য ক্রমে তাঁর দুই কন্যা যথাক্রমে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রানে বেঁচে যান। শেখ হাসিনা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী মনোনীত হয়ে দেশে আসার পর খুনিরা আবারো সক্রিয় হয়ে ওঠেছিল। বার বার অব্যাহত প্রচেষ্টার পরও এই পর্যন্ত সেই প্রবাদটি সত্য বলে প্রমানিত হল-‘রাখে আল্লাহ্‌ মারে কে’। সত্যিই তো, শেখ হাসিনার ওপর হামলা কী কম হয়েছে ? খুনিরা হয়তো মনে করতে পারে শেখ হাসিনাকে শেষ করতে পারলে আওয়ামীলীগ নিঃশেষ হয়ে যাবে।

সেই একই ধারনা তারা বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারেও করেছিল। কিন্তু তাদের সেই বিশ্বাস ভুল ছিল। মুষ্টিমেয় খুনি চক্র ব্যাতীত এই দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে ভালোবাসে।তাই প্রধান মন্ত্রীর বিমানের ত্রুটিকে তারা সাধারন চোখে দেখছেনা। জাতীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমান এমনিতেই একটি লোকসানি খাত। তার ওপর কর্তব্যরতদের গাফেলতি কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না। শুধু প্রধান মন্ত্রী নন, ইতোপুর্বে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ও বর্তমান পানি সম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

এর আগে চলতি বছরের ৮ জুন সৌদি আরব সফর শেষে দেশে ফিরছিলেন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ তার সফর সঙ্গীরা। তাকে বহনকারী বিমানটি অবতরন করার মুহুর্তে হযরত শাহ্‌ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের রানওয়েতে ধাতব বস্তু দেখতে পান পাইলট। এসময় প্রায় ২০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটি আকাশে চক্কর দিতে থাকে।

পরে ধাতব বস্তুটি সরানোর পরে বিমানটি অবতরন করে। এই ঘটনায় বরখাস্ত করা হয় বিমানের দুই কর্মকর্তাকে। চলতি বছর ৩০ মার্চ বিমান দুর্ঘটনার হাত থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এদিন সিঙ্গাপুর থেকে উড্ডয়নের পরপরই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় ওই বিমানে। প্রায় চার ঘণ্টা আকাশে চক্কর দেয়ার পর অবশেষে শাহ্‌ জালাল বিমান বন্দরে অবতরন করে ফ্লাইটটি।অল্পের জন্য রক্ষা পান ক্রু সহ ২০৬ জন যাত্রী। আমাদের কথা হল, বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি হতেই পারে। কিন্তু অবহেলা বা গাফেলতিকে ত্রুটি বলে চালিয়ে দেয়া বিশেষ করে প্রধান মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সফর করা বিমানে তা মোটেও মেনে নেয়া যায়না।

বিমানের ইঞ্জিন অয়েল ট্যাংকারের নাট-বোল্ট ঢিলা থাকা চরম গাফেলতি তো বটেই অমার্যনীয় দায়ীত্বহীনতাও। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল তা আমরা জানি। ১৯৮৮ সালের ১৭ আগস্ট এক প্লেইন ক্রাশে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন । আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণেই জিয়াউল হকের বিমানটি ক্রাশ হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও হত্যার উদ্দেশ্যে বার বার হামলা করা হয়েছে। তাই ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাওয়ার কথা। গত সাড়ে তিন দশকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য চেষ্টা হয়েছে কমপক্ষে ১৯ বার।

মানুষের দোয়া এবং আল্লাহর অসীম কৃপায় বারবারই তিনি বেঁচে গেছেন। শুধুমাত্র বিরোধীদলে থাকার সময়ই নয়, তিনি যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখনও তাকে হত্যার চেষ্টো হয়েছে একাধিকবার। এমনকি অভুত্থান চেষ্টাও হয়েছে। এখনো ঘাতকেরা থেমে নেই। আওয়ামীলীগের নব নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন-‘শেখ হাসিনাকে একটি বুলেট তাড়া করছে’। তিনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন শেখ হাসিনা নিরাপদ না। ঘাতকের বুলেট তাকে তাড়া করছে। আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদকের মুখে যখন এহেন কথা শুনি তখন আমরা শংকিত না হয়ে পারিনা। ভয়ে আমাদের অন্তরাত্মা টিপ টিপ করে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহসী উচ্চারণ-মৃত্যু ভয়ে বসে থাকলে কাজ তো করা যাবেনা। তিনি সবসময় বলেন, হায়াত-মওতের মালিক আল্লাহ্‌। আল্লাহর ওপর তার এই দৃঢ আস্থা আছে বলেই বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে আমাদের নিকট তিনি ফিরে আসছেন। আল্লাহ্‌ আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে সর্বদা হেফাজতে রাখুন এই কামনায় করি। সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারি এই ঘটনা তদন্তে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স কর্তৃপক্ষ তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

তদন্ত কমিটির রিপোর্টে গাফেলতির কারনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে বলে প্রমান মিলেছে। এবং এই ঘটনায় বিমানের ছয় কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।কিন্তু দিনের পর দিন লোকসান দেয়া একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে কর্তব্যরতদের দায়ীত্বে অবহেলার জন্য বলা যায় দায়ীত্ত্বহীনতার জন্য এই শাস্তি কী যথেষ্ট ?আমি নব্বই দশকে আমার একটা লেখায় লিখেছিলাম একটি কথা তা আবার আজ প্রাসঙ্গিক হওয়ায় লিখছি-বাংলাদেশ বিমান, রেলওয়ে, বিদ্যুৎ ওয়াসা ও গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেয়া হোক। তাহলে দেখা যাবে কোথায় কোন প্রতিষ্ঠানে কতজন আলিবাবা বসে আছে। এই আলিবাবারাই যত দুর্নীতি ও অনিয়মের মহা সম্রাট ।

নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে তাদের একটা সাম্রাজ্য থাকে। থাকে প্রচুর আজ্ঞাবহ সৈনিক। এরা বড় মিয়ার খাস মানুষ হওয়ায় কোন কাজ করেনা। সরকার ভর্তুকি দেয় আর এদিকে গুড়ের লাভ পিঁপড়ায় খায়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের নিরাপদ ভ্রমনের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধান মন্ত্রীর জন্য আলাদা বিমান ক্রয়ের কথা ভাবছেন তিনি। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে প্রধান মন্ত্রী বললেন, আলাদা বিমান কেনার মত বিলাসিতা করার সময় আসেনি। গরীবের ঘোড়া রোগ বলা হয়না-ঘোড়া পালতেও অনেক খরচ। সেটা আমরা চাইনা।

সাধারন মানুষ যেটাতে চড়ে আমরাও সেটাতে চড়বো। নির্দিষ্ট কারো জন্য নয়, যাত্রীদের জন্য বিমানকে আধুনিকায়নের উপর জোর দিয়েছেন প্রধান মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এতো আন্তরিকতা যেখানে সেখানে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কী একটুও পেশাদার হতে ইচ্ছে করেনা ? পান থেকে চুন খসতে পারেনা তারা আন্দোলনের হুমকি দেয়। আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর গুলিতে আন্তর্জাতিক মানের সেবা আশা করা কী অমুলক ?

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
Email:mansoornadim@gmail.com

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.