সিটিনিউজ ডেস্ক:: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ছয় বছর পর দেশে ফিরে কী দুঃসহ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে তার বর্ণনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, তাকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতেও ঢুকতে দেয়া হয়নি। এমনকি বাড়ি ভাড়াও করতে পারেননি তিনি। পরে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে রাত যাপন করতে হয়েছে।
রবিবার রাজধানীতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এ কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। এই পরিস্থিতিতেও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি নিজেরা ভোগ না করে তা দান করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলেও জানান তিনি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতেই সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বিদেশ থাকায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। পরে ১৯৮১ সালে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের কিন্তু আর কোনো জায়গা ছিল না, থাকার জায়গা ছিল না। ৮১ সালে ফিরে এসে আমি কিন্তু কোনো বাড়ি ভাড়াও পেতাম না। যখনই বাড়ি ভাড়া করতে যেতাম, কেউ ভাড়া দিত না। একদিন ছোট ফুপুর বাড়িতে এক রাত, মেজো ফুপুর বাড়িতে … এইভাবে আমাকে থাকতে হয়েছে।’
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকার সময় কী দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে সেটাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাংলাদেশে ফিরে আসি, তখন আমাকে বাড়িতে (ধানমন্ডি ৩২ নম্বর) ঢুকতে দেয়া হয়নি। ওই বাড়ির ভেতরে আমাকে যেতে দেয়া হয়নি। রাস্তায় বসে আমি আমার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করেছি, রাস্তায় বসে আমি হাত তুলেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা দুটি বোন পৈত্রিক সূত্রে ৩২ নম্বরের বাড়িটি পেয়েছিলাম। এই বাড়ি আমরা ব্যবহার করবো, সেটা কখনও সম্ভব ছিল না।…এই বাড়ি থেকেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। আবার এই বাড়িতেই তিনি জীবন দিয়েছেন। …ভেবেছিলাম কিছু একটা করবো যা ইতিহাস হয়ে থাকবে। বাংলাদেশে আর কোনো নেতার ছেলে মেয়ে কিন্তু সম্পত্তি দেয়নি। সবাই ভোগ দখল করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল আমরা এটা (বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর) করবো, এবং আমরা এটা করেছি। এটাকে আমরা স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করি। সুরকার সালাউদ্দিন সাহেব, আমাদের গাজীউল হক সাহেব, কে এম সোবহান সাহেব, রবিউল ভাই, মুনতাসির মামুন অনেককে নিয়ে একটা কমিটি করি এবং তাদের মাধ্যমে জাদুঘরটা করি।’
এই জাদুঘর করার উদ্যোগ নেয়ার সময়ই শেখ হাসিনার মাথায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার চিন্তা আসে বলেও জানান তিনি।
বঙ্গবন্ধু হত্যা কেবল ক্ষমতা দখলের জন্য নয়
বঙ্গবন্ধু হত্যা নিছক ক্ষমতা দখলের জন্য ছিল না বা এটি কেবল একটি পরিবারকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া ছিল না বলেও মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দিনের পর দিন যখন গেছে তখন অনেকেই উপলব্ধি করেছে এটা কোনো পরিবারের ওপর আঘাত ছিল না। বা শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য ছিল না। এটা ছিল একটা চেতনাকে ধ্বংস করা, মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে নস্যাৎ করা, স্বাধীন বাংলাদেশ যে সৃষ্টি হয়েছে, সেই সৃষ্টিকে ধ্বংস করাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য। তা আরও বেশি সকলের কাছে প্রমাণিত হলো যখন ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধান লংঘন করে ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে যে সামরিক শাসনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল বাংলাদেশের জনগণ। প্রতিরাতে কারফিউ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা আর একটার পর একটা ক্যু ঘটিয়ে সেনাবাহিনীতে শত শত অফিসার আর সৈনিককে হত্যা করা হয়েছে। কেবল এয়ারফোর্সের ৫৬২ জন অফিসারকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯ বারের মত ক্যু হয়েছে এই বাংলাদেশে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘জিয়াউর রহমান এক রাতের মধ্যেই নিজেকে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করেছে। জাতিসংঘে পাকিস্তানের মুখপাত্র হয়ে শাহ আজিজ গিয়েছিল। তাকে জিয়াউর রহমান প্রধানমন্ত্রী করে। এক সঙ্গে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছিল আবদুল আলীম, তাকে মন্ত্রী বানিয়েছিল। …এই ধারাবাহিকতায় তাদেরকে ভোট চুরি করে বাংলাদেশে সংসদেও বসানো হয়েছে। এমনকি আলবদর বাহিনীর প্রধানকেও মন্ত্রী বানানো হয়েছিল।’
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ওয়াদা ছিল যদি ক্ষমতায় আসতে পারি, এদের বিচার আমরা করবো। সে ওয়াদা আমরা রেখেছি। সেই বিচার আমরা করে যাচ্ছি। এই বিচারের রায়ও আমরা কার্যকর করেছি। অনেকে ভাবতেও পারেনি এমন এমন বিচার আর রায় কার্যকর করতে পারবো কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল অনেকের। কিন্তু কোনো সন্দেহ কাজে লাগেনি। তাদের বিচার ঠিকই হয়েছে বাংলাদেশে। জাতির পিতার হত্যাকারীদেরও বিচার হয়েছে।’
