সিটিনিউজবিডি:- সাতকানিয়ায় যৌতুকের টাকা না পেয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় স্ত্রীকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে পাষণ্ড স্বামী। ঘাতক স্বামীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় জনতা। স্ত্রীর নাম খালেদা বেগম (২০)। গতকাল বুধবার বিকালে উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ফজুর পাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, আড়াই বছর পূর্বে সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের ফজুর পাড়ার লালুর বাপের বাড়ির মৃত আবদুর রহমানের পুত্র সিএনজি ট্যাক্সি চালক মোহাম্মদ ইয়াছিনের সাথে একই ইউনিয়নের মহাজন পাড়ার সৌদিয়া প্রবাসী আশরাফ মিয়ার মেয়ে খালেদা বেগমের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় বর পক্ষের চাহিদা মতো যৌতুকও দেয় কনে পক্ষ। বিয়ের পর বেশ ভাল ভাবেই চলছিল সংসার। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই প্রকাশ পেলো যৌতুক লোভী স্বামীর প্রকৃত রূপ। বাপের বাড়ি থেকে নগদ টাকা ও বিভিন্ন জিনিসপত্র এনে দেয়ার জন্য স্ত্রী খালেদাকে চাপ দিতে শুরু করে স্বামী ইয়াছিন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাহিদা মতো টাকা এনে দিতে না পারায় মারধরের শিকারও হয়েছে কয়েক বার। স্ত্রীর বাবার বাড়ি থেকে যৌতুক এনে দেয়ার পর কিছুদিন শান্ত থাকে ইয়াছিন। পরে আবার নতুন ভাবে যৌতুক দাবি করে এবং তার চাহিদা মতো যৌতুক দিতে ব্যর্থ হলে নির্যাতন শুরু করে। কখনো মানসিক আবার কখনো শারীরিক। এভাবেই চলতে থাকে খালেদার স্বামীর সংসার। যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী খালেদাকে মারধরের অভিযোগে সামাজিক ভাবে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। বৈঠকে যৌতুক না চাওয়া এবং স্ত্রীকে মারধর না করার প্রতিশ্রুতিতে রক্ষা পেয়েছে স্বামী ইয়াছিন। ১১ মাস আগে তাদের সংসারে এসেছে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান। ওই সময়ে ইয়াছিনের চাহিদা মতো সব কিছু দিয়েছে খালেদার বাবা–মা। সর্বশেষ গত কয়েক সপ্তাহ আগে পুনরায় যৌতুক দাবি করে ইয়াছিন। বাবার বাড়িতে গিয়ে যৌতুক নিয়ে আসার জন্য প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করতো স্ত্রীকে। কিন্তু খালেদা বাবার বাড়িতে গিয়ে আর যৌতুক এনে দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয় ইয়াছিন। দেখে নেয়ার হুমকিও দিয়েছিল স্ত্রীকে। কিন্তু স্ত্রী খালেদা স্বামীর দেখে নেয়ার হুমকি সম্পর্কে বুঝতে পারেনি। যৌতুকের জন্য স্ত্রীর গলায় ছুরি চালানোর কথা ভাবতেই পারেনি খালেদা। এদিকে, সুযোগের অপেক্ষায় ছিল স্বামী ইয়াছিন। ঘটনার দিন বিকালে সন্তানকে সাথে নিয়ে নিজের কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েছিল খালেদা। ওই সময় ঘুমন্ত স্ত্রীর গলায় ধারালো ছুরি চালিয়ে হত্যার চেষ্টা করে ইয়াছিন। তখন ছুরি চালানোর যন্ত্রণায় ঘুম থেকে জেগে স্ত্রী চিৎকার শুরু করলে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে স্বামী। এক পর্যায়ে তার চিৎকার চেঁচামেচিতে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে মুমূর্ষু অবস্থায় খালেদাকে উদ্ধার করে কেরানী হাট আশশেফা হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে পরিস্থিতির অবনতিতে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
ঘাতক স্বামী ইয়াছিনকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় জনতা। খালেদা বেগমের মা শামসুন্নাহার জানান, বিয়ের সময় ইয়াছিন যৌতুক হিসাবে আমাদের কাছে একটি সিএনজি ট্যাক্সি চেয়েছিল। আমরা তাকে নতুন একটি সিএনজি ট্যাক্সি কিনে দিয়েছি। পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসপত্রও দিয়েছি। বিয়ের পর মাত্র কয়েক মাস ভাল ছিল। এরপর পুনরায় যৌতুক দাবি করে। তার বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে চাহিদা মতো যৌতুক না দিলে আমার মেয়েকে মারধর শুরু করে। আমার মেয়েকে মারধর করে আমাদের কাছে ফোন করে যৌতুকের টাকা চাওয়ার জন্য বাধ্য করতো। এভাবে অনেক টাকা দিয়েছি। অনেক জিনিসপত্র দিয়েছি। তার বিরক্ত সহ্য করতে না পেরে এলাকার মানুষকে একাধিক বার বিচারও দিয়েছি। কিন্তু সামাজিক বৈঠকে গিয়ে আগামীতে আর যৌতুক দাবি করবে না এবং মেয়েকে মারধর করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যায়। কিন্তু পরপর আবার যৌতুক দাবি করে এবং মারধর শুরু করে। এমনকি যৌতুক হিসাবে দেয়া সিএনজি ট্যাক্সিটি যত বার খারাপ হয়েছে ঠিক করার জন্য আমাদের কাছে টাকা চেয়েছে। আমরা মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে টাকা দিয়েছি।
সাতকানিয়া থানার এসআই ইয়াসির আরফাত জানান, খালেদাকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে। এছাড়াও তার থুতনি, বুক, ঘাড় ও পিঠে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন খন্দকার জানান, ছদাহা ফজুর পাড়া এলাকার সিএনজি চালক মোহাম্মদ ইয়াছিন যৌতুকের জন্য ধারালো ছুরি দিয়ে তার স্ত্রীকে জবাই করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। তাকে প্রথমে কেরানী হাট আশশেফা হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। পরে অবস্থার অবনতিতে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। স্থানীয় জনতার সহায়তায় ঘাতক স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এব্যাপারে স্বামী ইয়াছিনের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
