তানোরে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান, যাচ্ছে বোমা বিশেষজ্ঞ দল
সিটিনিউজ ডেস্ক:: রাজশাহীর তানোর উপজেলার ডাঙাপাড়া গ্রামে ‘জঙ্গি আস্তানাটি’ পুলিশ ঘিরে রাখার পর থেকেই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। গ্রামে এক স্কুলশিক্ষকের পরিবার এমন জঙ্গি হয়ে উঠেছে, তা বিশ্বাসই করতে পারছেন না স্থানীয়রা। তারা বলছেন, পরিবারটির আচরণ ছিল ‘সন্দেহজনক’; কিন্তু তারা ‘জঙ্গি’ হয়ে উঠেছে তা কল্পনাই করতে পারেননি কেউ।
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ গাফফার মিয়া (৬৫) বলেন, ‘বাড়ির লোকজন সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ধর্ম-কর্ম করত। তারা একদিন আগে রোজা শুরু করে, একদিন আগে ঈদ করে। কিন্তু তারা যে জঙ্গি হয়ে গেছে, কে জানত! জানতে পারলে আগেই পুলিশে খবর দেয়া হতো।’
আবদুস সালাম (৫০) নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, পরিবারটি ধর্ম নিয়ে খুবই বাড়াবাড়ি করত। ভাবতাম, ছেলে দুটো মাদ্রাসায় পড়েছে, তাই এমন আচরণ। কিন্তু তারা এ রকম জঙ্গি হয়ে গেছে তা বুঝতে পারিনি।’
এদিকে সোমবার মধ্যরাত থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পুলিশের প্রথম দফার অভিযানের পর দুপুর পর্যন্ত বাড়িটি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে এলাকায় বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। বৃষ্টির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এদিকে, সকাল থেকে প্রত্যন্ত বরেন্দ্র এলাকার এই জঙ্গি বাড়িটির চারপাশে এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। লাল পতাকা টাঙানো এই এলাকার ভেতর থেকে কাউকে বের হতে কিংবা বাইরে থেকে কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এতে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে পুলিশ, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বিশেষ শাখার (এসবি) সদস্যরা। এলাকায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও কাজ করছেন। তবে এ অভিযানে পুলিশ ছাড়া অন্য কেনো বাহিনী যোগ দেয়নি।
সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) সুমিত চৌধুরী বলেন, রাতের অভিযানের সময় আমরা একটা পাতিলের ভেতর দুটি সুইসাইডাল ভেস্ট দেখেছি। সেগুলো ওই অবস্থায়ই আছে। এছাড়া বাড়িতে আরো শক্তিশালী বোমা এবং বিস্ফোরকদ্রব্য থাকতে পারে। তাই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোমা বিশেষজ্ঞ দলকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।’
তিনি জানান, বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছে। তারা তানোর পৌঁছালে বাড়িটিতে দ্বিতীয় দফায় অভিযান শুরু হবে। বোমা নিষ্ক্রিয় করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হবে।
বাড়ির কতজন সদস্য জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত, জানতে চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা সুমিত চৌধুরী বলেন, ‘এখন তো পুরো পরিবার জঙ্গি হয়ে উঠছে। এই পরিবারটির সবার আচরণও তেমন। আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি- কতজন জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল।’
উল্লেখ্য, রবিবার মধ্যরাতে তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকার ডাঙাপাড়া গ্রামের স্কুলশিক্ষক রমজান আলীর বাড়িটি ঘিরে ফেলে বগুড়া জেলা ডিবি ও রাজশাহী জেলা পুলিশের সদস্যরা। এরপর বাড়িটি থেকে সবাইকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।
তখন রমজান আলীর ছেলে ইব্রাহীম হোসেন (২৬) ও ইসরাফিল হোসেন (২৪) এবং জামাতা রবিউল ইসলাম (২৫) বের হয়ে আসে। পরে বাড়িটির ভেতরে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে বাড়ির ভেতর থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়।
এসময় বাড়ি থেকে রমজান আলী (৫০), তার স্ত্রী আয়েশা বেগম (৪৫), তাদের মেয়ে হাওয়া খাতুন (২৪), পুত্রবধূ মর্জিনা খাতুন (২৫) ও হারেসা খাতুনকে (২১) আটক করে থানা হেফাজতে নেয়া হয়। তাদের সঙ্গে এক মাস থেকে নয় বছর পর্যন্ত বয়সের চার শিশুও রয়েছে।
এ নিয়ে শিশুসহ মোট আটকের সংখ্যা ১২ জন। তাদের সবাইকে তানোর থানায় রাখা হয়েছে। বাড়ির মালিক রমজান আলী উপজেলার গৌরাঙ্গপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। গত বছর রমজান ও তার স্ত্রী আয়েশা বেগম হজ পালন করেছেন। পরিবারটি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
