দিলীপ তালুকদার/গোলাম সরওয়ার : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকী আরো প্রায় বছর দেড়েক বাকী। এরই মধ্যে দেশের সর্বত্র নির্বাচনী হাওয়া বইছে। ইতিমধ্যে নেতা, পাতি নেতা, হাফনেতা, চামচা নেতারা মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামের সর্বত্র ব্যানার, ফ্যাষ্টুন, ব্যানারে ছেয়ে গেছে। এলাকাবাসীকে বিভিন্ন দিবসের শুভেচ্ছা জানানোর উছিলায় আগাম নির্বাচনী প্রচারনা চালাচ্ছেন। আজকের সূর্যোদয় বৃহত্তর চট্টগ্রামের ১৬টি নির্বাচনী আসনের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহন করেছে। ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এবার চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের নির্বাচনী চালচিত্র তুলে ধরা হলো। এলাকার সাধারণ মানুষ ও দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে কার গ্রহনযোগ্যতা বেশী তা তুলে ধরা হলো।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন তারিখ ডের দেরী থাকলেও বাঁশখালীর নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। সভা সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দলের সমর্থকরা মারামারিতেও জড়িয়ে পড়েছে। বাঁশখালীতে বড় দুই দলের অন্তরদলীয় কোন্দলও বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে।
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে বাঁশখালী আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী। তিনি ছাড়াও আওয়ামী লীগে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও শিল্পপতি মুজিবুর রহমান সিআইপি। বিএনপি থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি, সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন আরও দু’জন।
তারা হলেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ইফতেখার হোসেন চৌধুরী মহসিন ও যুগ্ম সম্পাদক এবং সাবেক পৌর মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনি। আর জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী হিসেবে আছেন সাবেক সিটি মেয়র ও এমপি মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। বাঁশখালী -আনোয়ারার সংযোগ স্থাপনকারী শঙ্খ ব্রিজের টোল আদায় নিয়ে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী হাইকোর্টে মামলা করেন। মামলায় টোল আদায় বন্ধের আদেশ দেয়া হয়। অবশ্য অল্পকিছুদিন পরে টোল বন্ধের আদেশ আবার স্থগিত হয়ে যায়। এই আদেশ মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর একক কৃতিত্ব দাবী করে বাঁশখালীতে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করেন।
তিনি গঠন করেন সিএনজি চালকদের নিয়ে সিএনজি শ্রমিক সংগঠন। প্রতিটি সিএনজি, বাসে সাঁটানো হয় মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর লেমিনেটেট ছবি।
এই সংগঠনের ব্যানারে তিনি সংবর্ধনা নেবার আয়োজনও করেন। সেই অনুষ্ঠানে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টি বাঁশখালী জাতীয় পার্টির কোন নেতাই কিছু জানতেন না বলে গণমাধ্যমে বিবৃতি দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় পার্টির এক নেতা জানান, এরশাদ বাঁশখালীতে যাক সেটা জাতীয় পার্টির স্থানীয় ২জন প্রভাবশালী এমপিও চাননি।
অনুষ্ঠানের দুইদিন আগে একই বাঁশখালী আওয়ামীলীগ পাল্টা কর্মসূচীর ঘোষনা দিলে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান স্থগিতে ঘোষনা দেন। তার রেশ বাঁশখালীর কোথাও না থাকলেও তার নিজ ইউনিয়নে এখনো উত্তাপ রয়েছে। বৈলছড়ি ইউনিয়নের প্রতিটি পারায় পারায় সেই ক্লেশ এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। এতে করে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর ব্যক্তিগত ইমেজ যথেষ্ঠ ক্ষুন্ন হয়েছে। তার রেশ গিয়ে পড়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের উপর। তার বাড়ী ঘরে আগুনও দেয়া হয়।
চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে সর্বশেষটি হচ্ছে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসন। জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ আসনে ১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সুলতান উল কবির চৌধুরী।
১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হন।
বাঁশখালীতে ২০১৪ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রিটার্নিং অফিসারকে মারধরের ঘটনায় তাকে আসামি করে মামলা হয়।
বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করার কারণেও তিনি বিতর্কিত হয়েছেন। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, টিআর-কাবিখার প্রকল্প নিয়েও দুর্নীতি অভিযোগ আছে। ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিসসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অফিসে দুর্নীতির ডালপালা বিস্তার করেছে। দুদকের গণশুনানিতেও এসব বিষয়ে এলাকার লোকজন অভিযোগ দেন। মূলত এসব সুযোগ কাজে লাগিয়েই মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীকে এবার ‘কুপোকাত’ করতে চান আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমান সিআইপি।
বাঁশখালীর এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন ২০১৪ সালে। নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। আমার উন্নয়নে ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক ছড়াচ্ছে। আশা করি কেউ আমার ক্ষতি করতে পারবে না। দল থেকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইব এবং মনোনয়ন পাব বলেই আশা রাখি।’ গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৪টির মধ্যে ১১টিতে আওয়ামীলীগের প্রার্থীই জিতেছে। এটাও আমার উন্নয়ন কাজের ফসল। বাঁশখালীর প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করেছি।
এ আসনে অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ, দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদক ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান সিআইপি। এলাকায় তিনি জোরেশোরে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রস্তুতি কার্যক্রম। ইতিমধ্যে মাস্টার পরিবারের সদস্যরা বাঁশখালীর সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সাহায্য সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মাষ্টার পরিবার হিসেবে খ্যাত নজির আহমদ মাস্টার পরিবারের সন্তান হিসেবে এলাকায় তাদের রয়েছে বেশ সুনাম। এলাকায় স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণও রয়েছে তাদের পরিবারের। দক্ষিণ বাঁশখালীল একমাত্র কলেজ নজির আহম্মদ ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠ করেন ২০০৭ সালে।
শিক্ষার আলো ছড়ানো এই কলেজ বর্তমানে অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। তাদের শিল্পকারখানায় কর্মরত হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর সিংহভাগই বাঁশখালীর। মুজিবুর রহমান বলেন, ‘দল থেকে মনোনয়ন চাইব। প্রধানমন্ত্রীই মনোনয়ন দেয়ার মালিক। নিশ্চয় তার কাছে প্রত্যেক এলাকার এমপিদের কার্যক্রমের ফিরিস্তি আছে। আছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট। সবাই জানেন বাঁশখালীর কি অবস্থা। এরই মধ্যে নানা কারণে বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগের দুর্নাম ছড়িয়ে পড়েছে।
আমি সেই দুর্নাম দূর করতে চাই। মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বাঁশখালী আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করলেও আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম কুক্ষিগত করে রেখেছেন। বিগত ২২ বছর ধরে আওয়ামীলীগের কোন সম্মেলন করতে পারেনি। বর্তমান সংসদ সদস্যের কারনে আওয়ামীলীগ বাঁশখালীতে বর্তমানে ত্রি ধারায় বিভক্ত। দলীয় অন্ত কলহ মিঠানোর কোন উদ্যোগই তিনি আজ পর্যন্ত গ্রহন করেননি। যার কারনে এলাকায় নতুন কোন নেতৃত্ব উঠতে পারছে না।
আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসনটি ধরে রাখতে চাই।’ এ আসনে আব্দুল্লাহ কবির লিঠনও মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি সাবেক এমপি ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আাক্তারুজ্জামান চৌধুরীর ভাগিনা। তিনি আক্তারুজ্জামান চৌধুরী স্মৃতি সংসদের ব্যানারে বিভিন্ন সভা সমাবেশ করছেন। তবে তার বিরুদ্ধে ১/১১ এর সংস্কার পন্থী হিসেবে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবো।
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এখনও নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়নি। নির্বাচন যদি হয়, বিএনপি যদি অংশগ্রহণ করে তবে অবশ্যই দল থেকে মনোনয়ন চাইব। দলও ইনশাআল্লাহ আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা করছি। কারণ আমি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আস্থা অর্জন করেছি।
এ কারণে আমাকে মন্ত্রী পরিষদেরও সদস্য করা হয়। চারবার নির্বাচনে জিতে এমপি হয়েছি। এর মানে হচ্ছে, বাঁশখালীর মানুষও আমার ওপর আস্থাশীল। ক্ষমতায় থাকাকালে বাঁশখালীর গুরুত্বপূর্ণ শঙ্খব্রিজসহ রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ করেছি। গ্রমীণ মেঠোপথেও ব্রিক সলিন ও কার্পেটিং করেছি। আওয়ামী লীগ নতুন কোনো রাস্তাঘাট করেনি। আমার করা রাস্তাঘাট মেরামত করছে মাত্র। বাঁশখালীর জনগণ আমার পক্ষে আছে।
এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও বাঁশখালী থেকে তিনবারের নির্বাচিত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘১৯৭৯, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে এ আসন থেকে আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হই। এমনকি ১৯৯১ সালেও আমি প্রায় ২ হাজার ভোটে জিতেছিলাম জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করে। প্রথম দিন আমাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্রমূলকভাবে পরদিন আমাকে ৪৭৮ ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে পরাজিত ঘোষণা করা হয়। এজন্য আমি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করি। ১৯৯৪ সালে আমার পক্ষে রায় আসে। অর্থাৎ আমাকে জয়ী ঘোষণা করা হয়। বাঁশখালী কখনও আওয়ামী লীগের আসন ছিল না।
এখানে ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ জেতেনি। এমনকি ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়, সেই নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরেছিল বিএনপির প্রার্থীর কাছে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি থেকে আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে জোটের স্বার্থে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করি। আশা করি, এবার আমি দলের মনোনয়ন পাব। জোট হলে জোটগত মনোনয়নও পাব এবং জিতব।
এলাকার অনেকেই মনে করেন, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী যখন এমপি মেয়র ছিলেন তখন তার যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল। তিনি চাইলে বাঁশখালীর আনাচে কানাচে চকরিয়া উপজেলার মত উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। তিনি রাজনৈতিক ডিগবাজীতেও পারদর্শী। মনোনয়নের জন্য তিনি মরিয়া, সেটা আওয়ামীলীগ হোক আর বিএনপি হোক।
