সাতকানিয়ায় সরকারীদলের সাতকাহন

0

 জুবায়ের সিদ্দিকী :     গত সংখ্যায় লিখেছিলাম চট্টগ্রামে হাইব্রিড নেতা ও চাটুকারদের উৎসব চলছে। এই কলাম পড়ে অগনিত পাঠক ফোন করেছেন। সম্মানিত পাঠকদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। অনেকে ফোন করে বলেছেন,’ ভাইজান আমার মনের কথা লিখেছেন। তৃনমুলের ও রাজপথের লডাকু বঙ্গবন্ধু আদর্শের এসব নেতাকর্মীগন বর্তমানে নব্য আওয়ামী লীগারদের ভিড়ে যে কত অসহায় তা আমার এতবেশি জানা ছিল না। সৎ ও স্ব”ছ রাজনীতির কদর এখনও ছিঁটেফোটা আছে।

ক্ষমতার হালুয়া রুটি ভক্ষন করে যারা উৎসবে সানাই বাজাচ্ছেন তাদের চেয়ে এই তৃনমুলের নিপড়িত, বঞ্চিত, ত্যাগী নেতারা অনেক ভাল আছেন। কারন সরকার পরিবর্তন হলে এদের ভিটামাটি ছেড়ে বিদেশ পালাতে হবে না। মামলা হামলার শিকার হতে হবে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সেইসব তৃনমুলের নেতাকর্মীদের ধয্য, সততা, নীতি আদর্শকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। দল মুল্যায়ন না করুক, দেশ ও জাতি তাদের মুল্যায়ন করবে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের ত্যাগ, শ্রম, মেধা-মনন, সততা ও আদর্শ কখনো বৃথা যাবে না। আজ যারা নৈব্য আওয়ামী লীগার হয়ে অথবা হাইব্রীড নেতা সেজে মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন, তাদের স্থায়ীত্ব বেশিদিন হতে পারে না।

এমনিতে তারা যেভাবে গেড়ে বসছেন, সেভাবে দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হবেন। এ রকম অনেক সাবেক এমপি-মন্ত্রী ও প্রভাবশালী রিক্সা-টেক্সি কিংবা পাবলিক বাসেও দেখা যায়। ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে জনবিচ্ছিন্ন কর্মকমান্ড ও নেতাকর্মীদের দুরে ঠেলে দেওয়ায় উচ্ছিষ্টের মতো ডাষ্টবিনে ছুড়ে ফেলেছে মানুষ। তৃনমুলের নেতাকর্মীদের অনেক ক্ষমতা। তারাই নেতা তৈরী করে, আবার ছুড়েও ফেলে। ভবিষ্যতেও আজকের কথিত প্রভাবশালী নেতাদের দেখা মিলবে পুটপাতে।
চট্টগ্রামে এখন শুরু হয়েছে দলবদলের রাজনীতি। দল বদল করে রাতারাতি সরকারী দলের আদর্শে ডিগবাজি দেয়ার উৎসবটা বেশ উপভোগ করার মতো। সর্বশেষ সাতকানিয়া পৌরসভার মেয়র হাজী মোহাম্মদুর রহমান বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। গত ১৬ আগষ্ট সন্ধ্যায় নগরীর আন্দরকিল্লায় অবস্থিত দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমেদ ও সাধারন সম্পাদক মফিজুর রহমান, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. আবু রেজা মো: নিজামুদ্দিন নদভী, চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া) আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরীর হাতে ফুল দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
হাজী মোহাম্মদুর রহমান চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ন সম্পাদক ও সাতকানিয়া পৌরসভা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। তার সাথে পৌরসভার দুইজন কাউন্সিলরও আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতারা তাকে মিষ্টি খাইয়ে দলে বরন করে নেন। এদিকে বিএনপি বলেছে, দল পরিবর্তন করে হাজী মোহাম্মদুর রহমান বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিয়েছেন। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর হাজী মোহাম্মদুর রহমান বিএনপির সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। ২০০৩ সালে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন। এরপর বিএনপির ব্যানারে নির্বাচন করে পরপর দুইবার সাতকানিয়া পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন।

তিনি মুলত আগামী পৌরসভার নির্বাচনকে টার্গেট করেই বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন বলে স্থানীয় অনেকে মনে করছেন। আওয়ামী লীগে তার যোগদান অনুষ্টানে অন্যান্যদের মধ্যে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি এম.ইদ্রিস, দক্ষিন জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম আজাদ, সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মোতালেব সিআইপি, সহ-সভাপতি ফরিদুল আলম মাষ্টার, সাধারন সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা আহম্মদ সাইফুদ্দিন ছিদ্দিকী, বশির আহমদ চৌধুরী, ফয়েজ আহাম্মদ লিটন, মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন ও মোহাম্মদ শাহজাহান উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, হাজী মোহাম্মদুর রহমান দুই বারের নির্বাচিত মেয়র এবং এলাকার দানশীল ব্যক্তি। এলাকায় তার যথেষ্ট গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রতি অনুপ্রানিত হয়ে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেন। যোগদান অনুষ্টানে মোহাম্মদুর রহমান প্রতিজ্ঞা করে বলেছেন, তিনি আওয়ামী লীগের সাথে কোনদিন বেঈমানী করবেন না। বঙ্গবন্ধু আদর্শকে বুকের মধ্যে লালন করে এখন থেকে দলের জন্য কাজ করে যাবেন।
দক্ষিন জেলা বিএনপির একজন সিনিয়র সহ-সভপতি অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন,’হাজী মোহাম্মদুর রহমান মুলত ক্ষমতার পুজারী। তিনি রাজনীতিকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে অভ্যস্থ। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তিনি বিএনপিতে যোগদান করেছেন। বিএনপির ব্যানারে পর পর দুইবার মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকে তার ব্যবসায় কাজে লাগানোর জন্য তিনি বিএনপি ছেড়ে চলে গেছেন। তার মতে, ’মোহাম্মদুর রহমান তার নিজের ইমেজে মেয়র হননি। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মেয়র হয়েছেন। এখন বিএনপি ক্ষমতায় না থাকায় তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। এটা এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি বলেন, ’মোহাম্মদুর রহমান আমাদের কয়েকজন নেতাকে বলেছেন, আওয়ামী লীগে যোগদান করলেও তার মন সবসময় বিএনপির সাথে থাকবে। পরে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তিনি পুনরায় ফিরেও আসবেন। তবে যোগদান প্রসঙ্গে মোহাম্মদুর রহমান বলেন,’আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। তবে দলের বাইরেও পৌরসভা এলাকার মানুষের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি একাত্বতা পোষন ও বর্তমান সরকারের উন্নয়নমুলক কর্মকান্ডের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে আমি বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেছি। আগামীতে দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীদের সাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে কাজ করবো।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. নিজামুদ্দিন মো: নদভী বলেন,’বিগত কয়েক মাস যাবত মোহাম্মদুর রহমান আমার ডিও লেটার নিয়ে সাতকানিয়া পৌরসভার জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকার কাজ এনেছেন। আরও প্রায় দুই কোটি টাকা বরাদ্দের জন্য সুপারিশ করেছি। উন্নয়নের বিষয়ে আমার কাছে কাউকে না করি না। তাঁর মতে,’মোহাম্মদুর রহমান আওয়ামী লীগের সাথে তিনি ঈমানদারীর সাথে কাজ করবেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ২০০৫ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার উপর গ্রেনেড হামলার বর্ষপুর্তিতে শেখ হাসিনার কুশ পুত্তলিকা দাহকারী এবং এক বছর আগেও ১৫ আগষ্ট খালেদা জিয়ার কথিত জন্মদিনে কেক কেটে উল্লাসকারী পৌর মেয়র হাজী মোহাম্মদুর রহমানকে আওয়ামী লীগে যোগদান দলের জন্য অশনি সংকেত। তাদের মতে,’ এখন তার স্বার্থ হাসিল ও দুর্নীতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কতিপয় নেতাকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে বশে এনে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন তিনি।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.