জুবায়ের সিদ্দিকীঃ সীতাকুন্ড উপজেলা এবং নগরীর উত্তর কাট্টলী ও উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৪ সংসদীয় আসন। ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন ব্যবসায়ী দিদারুল আলম। তবে আগামী নির্বাচনে এই আসনে দিদারুল আলমকে ঠেকাতে মাঠে নেমেছেন দুই আওয়ামীলীগ নেতা।
অন্যদিকে বিএনপিতে আসলাম চৌধুরীর বিকল্প কোন প্রার্থী নেই। একাদশ সংসদ নির্বাচনে দুই দলের নেতাদের মনোনয়ন প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে চমক ছিল। দলের বাইরের একজন ব্যক্তি যে মনোনয়ন পাবেন, দলীয় নেতাকর্মীরা তা আগ থেকে আঁচ করতে পারেনি। আগামী নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামীলীগের তিন মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন।
কিন্তু তাদের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়া হবে নাকি গত নির্বাচনের মত এবারও দলের বাইরের কারও হাতে নৌকা প্রতীক তুলে দেওয়া হবে তা নিয়ে আওয়ামীলীগ নেতাদের মধ্যে কৌতুহল দেখা দিয়েছে। বিএনপি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে সহজে জয়লাভ করেন দিদারুল আলম।
এর আগে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে এ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবিএম আবুল কাশেম মাষ্টার। আগামী নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য দিদারুল আলমসহ আওয়ামীলীগের আরও দুই মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে রয়েছেন। এরা হলেন সীতাকুন্ড উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আল মামুন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া। মামুন সীতাকুন্ডের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত এবিএম আবুল কাশেম মাষ্টারের ছেলে।
আব্দুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে খ্যাতি আছে । তৃণমুল নেতাকর্মীদের সঙ্গে রয়েছে তার গভীর যোগাযোগ। দলের নেতাকর্মীরা চান দলের বাইরে থেকে এনে যাতে কাউকে মনোনয়ন দেয়া না হয়। তাদের মতে,’ ব্যবসায়ী দিদারুল আলমকে দলের মনোনয়ন দেওয়ায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার সঙ্গে নেতাকর্মীদের কোন যোগাযোগ নেই। দলের তৃণমুলের কোন নেতাকর্মীকে তিনি চেনেন না। তার উদাসীনতার কারনে সীতাকুন্ডের ঢাকা চট্টগ্রাম রোড়ে বিএনপি-জামায়াত লাগাতার নাশকতা চালাতে সক্ষম হয়েছিল’। সীতাকুন্ড আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় একজন প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,’ যেসব নেতা অনিয়ম দুর্নীতির কারণে অভিযুক্ত, বিতর্কিত, আগামী নির্বাচনে তাদের প্রতি কেন্দ্রের আকর্ষণ থাকবে না।
দলের ভেতরে কিংবা বাইরের স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ব্যক্তির হাতে এবার নৌকা প্রতীক তুলে দেওয়া হবে। সীতাকুন্ড উপজেলা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ ইসহাক বলেন,’ গত নির্বাচনে দলের বাইরের লোক মনোনয়ন পেয়েছিলেন, যা আমার চিন্তায়ও ছিল না। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমের ভাতিজা দিদারুল আলমের ভুমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী এস এম আল মামুন। তাঁর অভিযোগ ’গণমাধ্যমে বর্তমান এমপির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি এলাকার কাঙ্কিত উন্নয়ণ করতে পারেননি। সীতাকুন্ডের সাধারন মানুষের সাথে তার কোন সম্পৃক্ততা নেই। দলীয় নেতাকর্মীদের সাথেও তার কোন যোগাযোগ নেই। এমনকি অনেক নেতাকর্মীকে তিনি চিনেন না। দিদার ও মামুন দুই মেরুর মাঝখানে আছেন অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া। তিনি এ পর্যন্ত চারবার মনোনয়ন চেয়েছেন, কিন্তু পাননি।
আগামী নির্বাচনে পঞ্চমবারের মত মনোনয়ন চাইবেন জানিয়ে তিনি বলেন,’গত চার বছরে বর্তমান এমপির সাথে নেতাকর্মীদের দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। তৃনমুলের নেতাকর্মীরা এবার এমপি হিসেবে একজন সাংগঠনিক ব্যক্তিকে পেতে চায়। এলাকার জনগনও তাদের দাবী দাওয়া পুরণে একজন যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিকে কাছে পেতে চায়।
জনগন ও নেতাকর্মীদের দাবী পুরনে তাই আমি এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে নেমেছি। এদিকে দলীয় তিন মনোনয়ন প্রত্যাশীকে ঘিরে সীতাকুন্ড উপজেলা ও পৌরসভা আওয়ামী লীগ তৃধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। দলীয় সুত্রে জানা যায়, সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের সাথে উত্তর জেলা যুবলীগের সভাপতি এস এম আল মামুনের দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্ধ চলে আসছে।
এখন নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের সেই বিরোধ তুঙ্গে। এর মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া আছেন বেশ ভাল অবস্থানে। তিনি বিরোধ-গ্রুপিং ও ক্যাডার লালনের রাজনীতি করেন না। প্রতিনিয়ত ব্যস্ত সময় পার করেন তৃনমুলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান নিয়ে’। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুন্ড উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ ইসহাক বলেন,’ প্রার্থী হওয়ার জন্য এটা তাদের প্রতিযোগিতা। রাজনীতিতে তো প্রতিযোগিতা থাকে। কিন্তু দলীয় সভানেত্রী যে কেউ একজনকে মনোনয়ন দিলে তাদের বিরোধ আর থাকবে বলে মনে হয় না।
সীতাকুন্ডে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তিনজন হলেও বিএনপিতে মাত্র একজন। তিনি হলেন আসলাম চৌধুরী। বিএনপির কেন্দ্রীয় এই যুগ্ন মহাসচিব নির্বাচনের মাঠে নেই। প্রায় দুই বছর ধরে কারাবন্দী। জেলে থাকলেও সীতাকুন্ডে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনিই একক প্রার্থী। স্থানীয় নেতারা তার বিকল্প কাউকে ভাবছে না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি প্রথম বিএনপির প্রার্থী অংশগ্রহন করে আওয়ামী লীগের এবিএম আবুল কাশেম মাষ্টারের কাছে পরাজিত হন।
এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী এল কে সিদ্দিকী প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে হারিয়ে জয়লাভ করেছিলেন। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদকের দায়িত্বে থাকার সময় আসলাম চৌধুরী ২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হলেও আলোচিত ছিলেন না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনকে ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড অংশে সহিংস ঘটনায় তিনি আলোচনায় আসেন। বিএনপির চেয়ারপারসনের কাছেও তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। উত্তর জেলা বিএনপির নেতৃত্ব আসে তার কাঁধে।
বছর না ঘুরতেই কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ন মহাসচিব হয়ে যান তিনি। তার বিরুদ্ধে নাশকতার ঘটনায় জড়িত থাকা ও অর্থ আত্বসাত সহ বিভিন্ন অভিযোগে ৪৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছাড়া বাকি ৪৪টি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন বলে জানায় তার আইনজীবি ব্যারিষ্টার শাকিলা ফারজানা। তবে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টের সঙ্গে বৈঠক করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে আসলাম চৌধুরী ২০১৬ সালের ১৫ মে ঢাকা থেকে গ্রেফতার হন।
তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি আছেন। জানা গেছে, তিনি জেলে থাকলেও সীতাকুন্ডে তার নির্বাচনী তৎপরতা চলছে। তার স্ত্রী নাজনীন মাওলা ও ভাই উত্তর জেলা কৃষক দলের সভাপতি ইসহাক কাদের চৌধুরী নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন। আসলাম চৌধুরীর ঘনিষ্ট উত্তর জেলা বিএনপি নেতা ও চাকসু ভিপি নাজিম উদ্দিন বলেন,’সীতাকুন্ডে আসলাম চৌধুরী বিএনপির একক মনোনয়ন প্রত্যাশী। সেখানে তিনি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করেছেন।
তিনি অনেক কর্মী তৈরী করেছেন। যারা জীবন বাজি রেখে নির্বাচনের মাঠে কাজ করবেন। নেতাকর্মীদের মতে, আসলাম চৌধুরী জেলে থাকলেও তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্বাচনের আগে কারাগার থেকে বের হতে না পারলেও তিনি দলের মনোনয়ন পাবেন। জেল থেকে নির্বাচন করবেন।
