চট্টগ্রামে হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় অগনিত মৃত্যু
দিলীপ তালুকদারঃ চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে রোগীর প্রতি অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, নবজাতক চুরি, রোগীর স্বজনদের মারধর, মাত্রারিক্ত ফি আদায় এখন নিত্য নৈমিত্যিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্ত ব্যাপারগুলোর প্রায় ৯৫ ভাগ হয় অগোচরে।
ভুক্তভোগীরা কপালের লিখন হিসেবে মেনে নেন বুক ফাটা কান্না চেপে। ডাক্তারের অবহেলা বা ভুল চিকিৎসা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। নগরীর নামী দামী হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো জনগনের সেবার নামে কসাই খানায় পরিনত হয়েছে।
ম্যাক্স, সিএসসিআর থেকে শুরু করে সরকারী বেসরকারী হাসপাতালগুলো কোনটাই দায় এড়াতে পারেন না। এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে ডাক্তার নামের মাস্তানরা শুরু করে দেয় তাদের মাস্তানী।
১৬ সালের ১০ জানুয়ারী বেসরকারী হাসপাতাল সার্জিস্কোপে সন্তান প্রসবের সময় মারা যান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছোট ভাই খায়রুল বশরের মেয়ে মেহেরুন্নেসা রীমা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গঠন করেন তদন্ত কমিটি।
এ ঘটনায় খায়রুল বশর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সিদ্দিকী রোজী ও তার স্বামী অধ্যাপক ডাঃ মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু তখন বিএমএসহ কয়েকটি চিকিৎসক সংগঠন মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস ও চেম্বার বন্ধ রেখে টানা ৫ দিন ধর্মঘট পালন করে।
একই সালের ৩ জুন রাতে নোয়াখালী আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ মোর্শেদুল আলমের স্ত্রী মায়মা সিকদার চিটাগাং পেশেন্ট কেয়ার হসপিটালে একটি সন্তান জন্ম দেন। পরদিন ভোরে সেই নবজাতক মারা যায়। এ ঘটনায় সায়মা সিকদারের মা নার্গিস বেগম বাদী হয়ে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা করেন।
৬ আগষ্ট নিশাত জেরিন নামে এক প্রসূতি ভর্তি হন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত মেমন মাতৃসদন হাসপাতালে। পরদিন চিকিৎসক ইসরাত জাহানের তত্ত্বাবধানে তার অপারেশন হয়। জন্মের পর মারা যায় সন্তান। এ হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভও হয়।
১৯ জানুয়ারী নুরুল আবছার নামের এক কিশোরের বাবা জেবল হোসেন অঙ্গহানির অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, পেটে ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল।
২০১৪ সালের ১৬ আগষ্ট নগরীর মেহেদীবাগস্থ আলোচিত ম্যাক্স হাসপাতালের সামনে ন্যাশনাল হাসপাতালে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় রওশন জাহান নামের এক নারী মারা যান বলে অভিযোগ করেন তার পরিবার।
একই বছরের ৩ অক্টোবর নগরীর অন্যতম হাসপাতার সিএসসিআর। চট্টগ্রামের এই সিএসসিআর। নাম করা ক্লিনিক তথা ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। এখানে জন্ম নেয় এক নবজাতক। জন্মের মাত্র ২ ঘন্টা পর চিকিৎসক ওই নবজাতককে মৃত ঘোষনা করে কার্টুনে ভরে প্রসূতিকে দেন। সাথে ধরিয়ে দেয়া হয় ডেথ সার্টিফিকেটও।
কিন্তু নবজাতকের মা কার্টুন খুলে দেখতে পান তার সন্তান মৃত নয়, নড়াচড়া করছে। সেই নবজাতক সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক মৃত ঘোষনা করার পরও প্রায় ৩৫ ঘন্টা মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছিল। এখানেও হয়তো চিকিৎসকের অবহলার শিকার হয়েছে নবজাতক। এখানেও গঠন করা হয়েছিল তদন্ত কমিটি।
গত ১৭ এপ্রিল ফেনী থেকে চট্টগ্রামে এসে নগরীর প্রবর্ত্তক মোড়ে চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় প্রসূতি রোকসানা আক্তারকে। তিনি সুস্থ সবল জীবিত শিশুই জন্ম দেন।
কিন্তু হাসপাতালের কর্তব্যরতরা জীবিত কন্যা শিশুটিকে রেখে দিয়ে অপর একটি মৃত শিশুর মরদেহ হাতে তুলে দেন। মৃত শিশু জন্মদিয়েছেন এই ভেবে মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে ফেনীতে গ্রামের বাড়ীতে গিয়ে কবর দেবার সব ব্যবস্থা করে ফেলেন। কিন্তু গোসলের সময় জানাতে পারেন এটা ছেলে সন্তানের মরদেহ। কিন্তু তার হয়েছিল কন্যা সন্তান। পরে আবার চট্টগ্রাম এসে হাসপাতালে চ্যালেঞ্জ করলে জীবিত কন্যা সন্তান ফেরত দেওয়া হয়। ব্যাপক সমালোচনার পর এখানেও গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি।
নগরীর পিপলস্ হাসপাতালের বিরুদ্ধে নবজাত চুরির গুরুতর অভিযোগ উঠে। যমজ সন্তান জন্ম দিলেও একটিকে মৃতভেবে ডাষ্টবিনে ফেলে দেয়া হয়। নবজাতকের পরিবার চ্যালেঞ্জ করে অভিযোগ প্রমান কের নবজাতককে উদ্ধার করেছিল একটি আবর্জনার গাড়ি থেকে। এব্যাপারে গঠন করা হয়েছিল তদন্ত কমিটি।
গত ৮ জুন বেসরকারী হাসপাতাল আলিফ এর বিরুদ্ধে নবজাতকের মৃত্যু অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক শহীদুল আলম শাহীন। তিনি তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে আলিফ হাসপাতালে ভর্তি করান। পরদিন ভোরে তার স্ত্রীকে লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। এক ঘন্টা পর মৃত শিশু প্রসব করেন তিনি।
তিনি হাসপাতালে অভিযোগ করেছিলেন সকল প্রকার গাইনি চিকিৎসা করে সুস্থ মাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। হাসপাতালে আনার তিন দিন আগেও তার বাচ্চা ঠিক ছিল গাইনি ডাক্তার রিপোর্ট দিয়েছিল। এ ব্যাপারেও গঠন করা হয়েছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু কোন তদন্ত কমিটির তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। এবার তদন্ত কমিটির রিপোর্টের জন্য হয়তো গঠন করতে আরো একটি তদন্ত কমিটি।
হাসপাতালের ডাক্তার কিংবা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ মির্মমতার শিকার হলেন সাংবাদিক রুবেল খান। সামান্য গলা ব্যথার চিকিৎসা নিতে গিয়ে চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় তিনি হারিয়েছেন তার আড়াই বছরের আদরের একমাত্র সন্তান রাইফাকে। এ ঘটনায় তড়িৎ পদক্ষেপ নিতে গিয়ে সরকার সমর্থক এক ডাক্তার নেতার রোষানলে পড়েছেন খোদ থানার ওসি। হুমকির শিকার হয়েছেন সাংবাদিক সমাজ। আর হাসপাতাল গুলোতে কর্মকর্তা, কর্মচারী, ডাক্তার তথা কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার এমন ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে চট্টগ্রামে।
