অর্থবাণিজ্য ডেস্ক : দুই বিদেশী নাগরিক হত্যার পর বাংলাদেশের পোশাকের বিদেশী ক্রেতাদের একটি বড় অংশ তাদের বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছেন। বাংলাদেশে না এসে তাদের নিজ নিজ দেশে বৈঠক করতে ডাকছেন উদ্যোক্তা ও পোশাক কারখানার মালিকদের। ফলে নানা শঙ্কায় পড়ছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় পোশাক কারখানার মালিকেরা। বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে ১-২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কেনে, এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে এইচঅ্যান্ডএম, ওয়ালমার্ট, ইন্ডিটেক্স, লিডল ও লি অ্যান্ড ফাং। ১ বিলিয়ন ডলারের কম পণ্য কেনে টার্গেট, বেস্ট সেলার, ভিএফ করপোরেশন, সিয়ার্স, ক্যারিফোর, জেসি পেনি, গ্যাপ, লিভাইসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। এ তথ্য থেকে দেখা যায়, বড় সব ক্রেতাই বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা বলছেন, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা নিয়মিতই বাংলাদেশ সফর করেন। বড় ক্রেতাদের মধ্যে অনেকেরই এখন বাংলাদেশে কার্যালয়ও রয়েছে।
এ কার্যালয়গুলোর মাধ্যমে কারখানার উৎপাদনের মান পর্যবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশগুলোর পরিকল্পনা করে থাকেন তারা। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দিক থেকেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। তবে বিকল্প পন্থায় তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আগেও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলাকালে বিকল্প পন্থায় কার্যক্রম চালু রেখেছিলেন ক্রেতারা। বিকল্প পন্থার মধ্যে অন্যতম হলো- ভিডিও কনফারেন্স। এছাড়া রয়েছে হংকং, দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ মধ্যবর্তী কোন স্থানে সভা করা। তবে ভিডিও কনফারেন্স বা কারখানা মালিকদের দেশের বাইরে যাওয়া বেশিদিন অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। তাছাড়া, বিদেশ সফর কারখানা মালিকদের জন্য ব্যয়বহুলও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মার্কিন দূতাবাসের ট্রাভেল অ্যালার্টের কারণে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াল-মার্ট ও টার্গেটের মতো ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানও চলতি মাসের সফরসূচি স্থগিত করেছে। এ ছাড়া জাপানি ব্র্যান্ড ইউনিক্লোর প্রতিনিধির বাংলাদেশ সফরের কথা থাকলেও তা হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চেরোকি গ্লোবাল ব্র্যান্ডের ক্রেতা প্রতিনিধিদের বাংলাদেশ সফরের নির্ধারিত তারিখ ছিল ১২ই অক্টোবর। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কারখানা মালিকদের দুবাই যাওয়ার অনুরোধ করেছেন চেরোকি গ্লোবালের প্রতিনিধি। কিন্তু দুবাই যাওয়া সম্ভব হবে না জেনে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে এবারের বৈঠক বাতিল করতে হচ্ছে কারখানা মালিকদের।
যুক্তরাষ্ট্রেরই আরেক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান গ্যাপ ইনকরপোরেশনের ৪ প্রতিনিধির আসার কথা ছিল চলতি সপ্তাহে। চার জনই নির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন। একইভাবে সফর বাতিল করেছেন নেক্সট, টেসকো, মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার ও সেইন্সবারির প্রতিনিধিরাও। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে এভাবেই একের পর এক সফর বাতিল করছেন বাংলাদেশী পোশাকের বিদেশী ক্রেতা প্রতিনিধিরা।
এটা আমাদের জন্য খারাপ। বিদেশী নাগরিক হত্যায় ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরমধ্যে বায়ার্স ফোরামের বৈঠক স্থগিত একটা অশনি সংকেত। এ অবস্থা চলতে থাকলে আবারও পোশাক শিল্প সংকটের দিকে যাবে; যা পোশাক শিল্পের নতুন চ্যালেঞ্জ। পোশাক খাতের একজন উদ্যোক্তা বলেন, বায়ারদের অর্ডার দেয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। কিন্তু এ সময়ই তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটা আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য ভাল লক্ষণ নয়। আর এমন পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধিও কমবে।
এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব ঘটনায় ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যেখানে বিদেশী ক্রেতা বা বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, সেখানে ইতিবাচক কিছু ভাবা যায় না। জাপানি নাগরিক হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে ওই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, এ ঘটনায় বাংলাদেশে যে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল, তা কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হবে।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, পরপর দুটি ঘটনা আমরা (বাংলাদেশীরা) ছোট করে দেখলেও এর বিশালতা আছে। বিদেশীরা গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছেন। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদের (ব্যবসায়ীদের) আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
এদিকে বিদেশী হত্যার ঘটনায় দেশে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং রপ্তানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, এ ধরনের ঘটনায় তৈরী পোশাকসহ অন্য খাতের অর্ডার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিদেশী হত্যার এ ঘটনা যাতে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এবং রপ্তানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য বিদেশী ক্রেতা ও নাগরিকদের দেশে অবস্থান, চলাচলের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে সংগঠনটি।
