নেত্রীর কাছে ৮ নেতার নালিশে ঝুলে আছে উত্তর জেলার পুর্ণাঙ্গ কমিটি

0

জুবায়ের সিদ্দিকী/ গোলাম শরীফ টিটুঃ আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটির সম্মেলন হওয়ার ৮ মাস পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষনা করা সম্ভব হয়নি। সম্মেলনের পর পর পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা প্রস্তুত করা হলেও কমিটিতে অনেক অযোগ্য ও হাইব্রিডদের  গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখায় ব্যাপক বিতর্ক ওঠে। একপর্যায়ে যোগ্য ও পদবঞ্চিত নেতারা দলের সভানেত্রীর কাছে নালিশ জানালে কমিটি ঘোষণা স্থগিত রাখে।

গত বছরের ২৭ জানুয়ারী প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য নুরুল আলম চৌধুরী মারা যান। তার মৃত্যুতে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদটি শুন্য হয়ে যায়। তখন উপজেলা নির্বাচনে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং পুরুষ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্ধারণ করে কেন্দ্রে পাঠানোর সময় প্রথম সহ-সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী ও সাধারন সম্পাদক এম এ সালাম স্বাক্ষর করে পাঠান।

তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া জানান, সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক এম এ সালামকে বিষয়টি জানিয়েছি। এর পর ওই বছরের ৭ ডিসেম্বর সম্মেলনে সরাসরি কাউন্সিলরদের ভোটে সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। ওইদিন বিকেলে শুরু হওয়া চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে কাউন্সিলর ছিলেন ৩৫৩ জন। এতে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এম এ সালাম ২২৩ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী পান ১২৯ ভোট।

সাধারণ সম্পাদক পদে মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শেখ আতাউর রহমান পান ১৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি একই উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন পান ১৫৪ ভোট। নগরীর লালদীঘি মাঠে ওই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে উক্ত সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু, যুগ্ন সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ও পানি উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, শিক্ষা উপ-মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন ও উপ-দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া।

চলতি বছরের শুরুতে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালাম উত্তর জেলার পুর্নাঙ্গ কমিটির খসড়া পাঠানো হয়েছে বলে জানান। শীঘ্রই ঘোষনা করা হবে পুর্নাঙ্গ কমিটি। জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক শেখ আতাউর রহমানও একই কথা বলেন। তবে কমিটিতে স্থানপ্রাপ্তদের নাম বলেননি তারা। আওয়ামী লীগের নির্ভরযোগ্য সুত্র মতে, ৭৫ সদস্য বিশিষ্ট পুর্নাঙ্গ কমিটির জন্য খসড়া তালিকা তৈরী করা হয়েছে। এ তালিকায় নাম তোলা এবং বাদ দেয়ার জন্য চলেছে নানা চেষ্টা তদবির। এতে করে নতুন কয়েকজন সহ-সভাপতি এবং যুগ্ন সম্পাদকের পদাবনতি হয়ে সদস্য এবং কেউ কেউ বাদ পড়ার বিষয়টি প্রচার হয়। এর পর ফটিকছড়ি থেকে এটিএম পেয়ারুল ইসলাম এবং সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য খাদিজাতুল আনোয়ার সনি আলাদা তালিকাও দেন। তবে খসড়া করা কমিটিতে তাদের দুজনের পদোন্নতি হচ্ছে বলে জানা যায়। পেয়ারুল ইসলাম সহ-সভাপতি ও খাদিজাতুল আনোয়ার সনি সাংগঠনিক সম্পাদক হতে পারেন বলে জানা যায়। তবে প্রয়াত সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের ছোটভাই ফখরুল আনোয়ারের নাম খসড়া তালিকায় থাকলেও একটি পক্ষ তাতে বিরোধ সাধে। সীতাকুন্ডেও বিবদমান তিনটি গ্রুপ আলাদা তালিকা দিয়েছে। বর্তমান সংসদ সদস্য দিদারুল আলম, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল্লাহ আল বাকের ভুঁইয়া নিজ নিজ অনুসারীদের জন্য আলাদাভাবে তদবির করছেন।

সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, প্রস্তাবিত কমিটিতে রাঙ্গুনিয়া থেকে ১২ জন, ফটিকছড়ি থেকে ১৩ জন, হাটহাজারী থেকে ১১ জন, মিরসরাই থেকে ১১ জন, সীতাকুন্ড থেকে ৯ জন, রাউজান থেকে ১১ জন এবং সন্দ্বীপ থেকে ৮ জন স্থান পাচ্ছেন। কমিটিতে নতুন মুখ হিসেবে আসতে পারেন ফটিকছড়ির সন্তান ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরীর পুত্র সাকিব চৌধুরী, প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ড. মাহমুদ হাসানের পুত্র আকতার উদ্দিন মাহমুদ পারভেজ। উক্ত কমিটিতে সহ-সভাপতির ১১টি পদে রাখা হতে পারে, অধ্যাাপক মাঈন উদ্দিন (হাটহাজারী), এডভোকেট ফখরুদ্দিন চৌধুরী (সীতাকুন্ড), এটিএম পেয়ারুল ইসলাম (ফটিকছড়ি), আবুল কাশেম চিশতি (রাঙ্গুনিয়া), স্বজন কুমার তালুকদার (রাঙ্গুনিয়া), মহিউদ্দিন রাশেদ (মিরসরাই), আবুল কালাম আজাদ (রাউজান), নুরুল আলম কোম্পানী (সীতাকুন্ড), রফিকুল ইসলাম (সন্দ্বীপ) অথবা সাংসদ মাহফুজুর রহমান মিতা (সন্দ্বীপ)। এ ছাড়া কাইয়ুম নিজামী (মিরসরাই) এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুলের নামও রয়েছে আলোচনায়।

জানা গেছে, নতুন কমিটিতে ৩ জন যুগ্ন সম্পাদকের তালিকায় আছেন মিরসরাইয়ের নুরুল আনোয়ার চৌধুরী বাহার, দেবাশীষ পালিত ও জসীম উদ্দিন শাহ। ৩ জন সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে রয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের কন্যা খাদিজাতুল আনোয়ার সনির নাম।

জেলা কমিটির দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন,’ তখন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অসুস্থ থাকায় প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এরপর করোনা ভাইরাসের কারনে পুর্নাঙ্গ কমিটির অনুমোদন নিয়ে অগ্রগতি হয়নি।

অপরদিকে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়া উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের পুর্নাঙ্গ কমিটি গঠনে অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে। জেলার সাবেক নেতাদের একটি প্রতিনিধি দল আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সাথে সাক্ষাত করে এসব অভিযোগ করে আসেন।

জানা গেছে, গত ১১ ফেব্রুয়াররি সন্ধ্যার পর জাতীয় সংসদ নেতা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সাথে সাক্ষাত করেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ৮ নেতা। এ সময় কমিটি গঠনে ব্যাপক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও আত্বীয়করনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন তারা। তারা জানান, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও ক্ষোভ উদ্ধারে এখানকার সবচেয়ে পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে নতুন নতুন মানুষের নাম দিয়ে এই কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকার পরও নেতাদের ব্যবসায়ীক পার্টনার, কর্মচারী, আত্বীয় নানা বিবেচনায় অনেককে কমিটির গুরুত্বপুর্ন পদে রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্ঠি আকর্ষণ করেন তারা।

জানা গেছে, প্রতিনিধি দলের অভিযোগগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তিনি কমিটি গঠনে সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভুমিকা নিয়ে উম্মা প্রকাশ করেন। এসব অভিযোগ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে আশস্ত করেন ওই ৮ নেতাকে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে অংশ নেওয়া নেতারা হলেন- নুুরুল হুদা, গিয়াস উদ্দিন, রাউজান উপজেলা চেয়ারম্যান এহসানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল, ইউনুচ গনী চৌধুরী, তৌহিদুল আলম বাবু, ফটিকছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব, সাবেক ছাত্রনেতা ও বিগত কমিটির নির্বাহী সদস্য শাহনেওয়াজ চৌধুরী এবং এস. এম বাকের।

এ বিষয়ে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ন সাধারন সম্পাদক ও ২০০৮ সালে মহাজোট মনোনীত প্রার্থী ইউনুস গনী চৌধুরী বলেন, ‘উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। অনেক ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অযোগ্য ও হাইব্রিড অনেককে গুরুত্বপুর্ন পদে রাখা হয়েছে। এসব অনাকাঙ্কিত, এসব আমরা প্রত্যাশা করিনি। কারন উত্তর চট্টগ্রামের সর্বজন শ্রদ্ধেয় একজন অভিভাবক আছেন জননেতা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি থাকতে এমন কিছু হবে ভাবিনি। আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরর সাথে সাক্ষাৎ করেছি। অভিযোগগুলো জানিয়েছি। তিনি আমাদের কথাগুলোশুনেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পদে থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। আমরা নেত্রীকে বলেছি আজীবন আপনার কর্মী থাকতে চাই। আপনি জানেন আমাদের কী করবেন’।

সাবেক ছাত্রনেতা ও বিগত কমিটির নির্বাহী সদস্য শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে আমরা উত্তর জেলা আওয়াামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটি নিয়ে আমাদের অভিযোগ জানিয়েছি। এর পর ওই কমিটি অনুমোদন পায়নি। এর আগেও সম্মেলনের পর পর এক দফায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন তারা। সে সময় দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গেও সাক্ষাত করেন তারা। তবে এ বিষয়ে বর্তমান কমিটির দায়িত্বশীদের কেউ বক্তব্য দিতে চাননি। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন দায়িত্বশীল নেতা বলেন, ‘করোনার কারনে নেতাদের ডেকে সমাধান করা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুর্নাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হবে।

 

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.