সিটি নিউজ : মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মূল সমাজে অন্তর্ভুক্ত বা স্থায়ীভাবে রাখা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে ঢাকা। এ প্রস্তাবকে দেশের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করে বাংলাদেশ।
সোমবার (০২ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সংবাদমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন জানান, সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাছে বিশ্বব্যাংক তাদের প্রস্তাবিত ‘রিফিউজি পলিসি রিভিউ ফ্রেমওয়ার্ক’টি মতামতের জন্য পাঠায়।
চিঠিতে বিশ্বব্যাংক জানায়, এই পলিসি রোহিঙ্গাসহ ১৬টি দেশে শরণার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। যেহেতু রোহিঙ্গারা শরণার্থী নয়, এ কারণেই এ রিপোর্টকে প্রত্যাখ্যান করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিজেদের মতো করে কাজ করছে। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ না করে, উল্টো বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গাদের চাপিয়ে দিতে চাইছে। রোহিঙ্গাদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত বা রেখে দেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে ঢাকা রাজি নয়। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন একমাত্র সমাধান বলে মনে করে বাংলাদেশ।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তির প্রসঙ্গে টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশটি যেখানে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেখানে রোহিঙ্গারা কখনই শরণার্থী নয়। তারা এখানে ক্ষণস্থায়ী। বিশ্বব্যাংক রিপোর্টে যে ধরনের শরনার্থীর কথা বলছে, রোহিঙ্গারা সেই রিফিউজি নয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংক যে প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে সেটি দীর্ঘমেয়াদি। বাংলাদেশ এর পক্ষে নয় বলে জানানো হয়েছে। নাকচের পরও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে একটা সমঝোতার মাধ্যমে চুক্তির চেষ্টা করছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য একটা বাড়তি চাপ থাকবে বলেও মনে করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বব্যাংক রোহিঙ্গাদের নামে যে টাকা পাঠায় তা খরচ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইউএনএইচসিআরসহ অন্যান্যরা। এমনকি বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশের জন্য অর্থ এলেও, তা রোহিঙ্গাদের দেখভালের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বরাদ্দ করে নিয়ে যায়।
রোহিঙ্গাদের ফেরানোর বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, করোনাকালীন সময়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে, চলতি বছরের ২১ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেনেভার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বৈঠকে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সেখানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর চলা গণহত্যা ও রাখাইনে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব তুলবে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক জোটসহ নানান সংস্থার সহযোগিতায় এ প্রস্তাব আনা হবে বলেও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত কয়েক বছর ধরেই এই প্রস্তাবে ভেটো দিয়ে আসছে পরাশক্তিধর দেশগুলো।
এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সরকারের অর্থায়নে নোয়াখালির ভাসানচরে রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক সংস্থা-ইউএনএইচসিআর’র সঙ্গে এখনো ক্যাম্পের দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয় ১৯৭৮ সাল থেকে। প্রথম পর্যায়ে আসে ৩ লাখ রোহিঙ্গা। যার মধ্যে আড়াই লাখকে ফেরত নিয়েছিল মিয়ানমার। আবারও ১৯৯২ সালে আসে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫শ ৫৭ রোহিঙ্গা। এর মধ্যে ফেরত নেয় ২ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে। ফলে, প্রতিবারই কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে থেকে গেছে।
১৯৯২ সালের পর বেশ কয়েকবার রোহিঙ্গারা এলেও, তাদের ফিরিয়ে নেয়নি দেশটি। বন্ধ হয়ে যায় প্রত্যাবাসন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাখাইন রাজ্যে থেকে প্রাণের ভয়ে ৭৮ হাজার রোহিঙ্গা আবারও আশ্রয় নেয়। সবশেষ, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। তাতে সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফে। সব মিলিয়ে সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে এই দেশে।
প্রায় ১৬ বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ থাকার পর, ২০১৭ সালের নভেম্বরে একটি নতুন সমঝোতা স্মারকে সই করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। এমওইউ অনুযায়ী, দুই মাসের মাথায় প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়নি মিয়ানমার।
সিটি নিউজ/এসআরএস
