সিটিনিউজ ডেস্ক : ‘কর্ণফুলী নদী বাঁচলে বন্দর বাঁচবে, বন্দর বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ এ স্লোগানে কর্ণফুলী নদী ও বন্দর রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয়পার্টি (জেপি) চট্টগ্রাম মহানগর শাখা।
সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন জাতীয় পার্টি (জেপি)’র চট্টগ্রাম মহানগর নেতা লেখক, সংগঠক মো: কামাল উদ্দিন । লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আহবায়ক মোহাম্মদ আজাদ দোভাষ ।
লিখিত বক্তব্যে মোহাম্মদ আজাদ দোভাষ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর, আর সেই বন্দরের প্রাণ হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। গুরুত্বপূর্ণ কর্ণফুলী নদীর ভরা যৌবন আজ হারানোর পথে। একদিকে নদীর গভীরতা দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সে ভরাটকৃত জায়গায় একশ্রেণীর ভূমিদস্যু ও নদী দখলকারীরা তাদের দখলে নিয়ে ঘরবাড়ি,বস্তি, দোকান ও মিল-কারখানা তৈরি করে ভাড়া দিয়ে অবৈধ দখলদারেরা প্রতি মাসে আয় করছে প্রায় এক কোটি টাকা। হযরত শাহ আমানত সেতু থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ১নং জেটি পর্যন্ত নদী দখলের এ মহোৎসব চলে আসলেও বিগত ৮ বছর ধরে অবৈধ উচ্ছেদের কোন অভিযান চালানো হয়নি।
নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং এর কথা বলে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে মালয়েশিয়া সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে একটি মামলা দায়েরের মাধ্যমে দীর্ঘদিন যাবত কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিং বন্ধ করে রেখেছে। যার সূরাহা না হওয়া পর্যন্ত পূনরায় ড্রেজিং ব্যবস্থা চালু করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট কর্ণফুলী নদীর অবৈধ দখলকারীদেরকে উচ্ছেদের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার পরও রহস্যজনক কারণে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না। সবকিছু বিবেচনায় এনে কর্ণফুলী নদীকে রক্ষার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
লিখিত বক্তব্যে জেপি নেতা আরও বলেন, দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ কর্ণফুলী নদীর অবৈধ দখল শুরু হয় আশির দশকে। নদীর কালুরঘাট সেতু থেকে মোহনা পর্যন্ত প্রায় ২৩ কিলোমিটার এলাকায় এ দখল যজ্ঞ চলে আসছে। তবে শাহ আমানত সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে বন্দরের ১নং জেটি পর্যন্ত অবৈধ দখলদারদের তৎপরতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ভর জোয়ারের সময় পানি যে জায়গায় গিয়ে স্থির হয়, সেখান থেকে ৫০ মিটার পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর সীমানা। কালুরঘাট থেকে মোহনা পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর মালিক হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর।
কিন্তু নদীর উভয় তীরের বেশিরভাগ জায়গা অরক্ষিত। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তাদের নাম ভাঙিয়ে রাতারাতি দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ধারা অব্যাহত থাকে। চাক্তাই, মাঝিরঘাট, শিকলবাহা ও চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন এলাকায় সবচেয়ে বেশি অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কারণেও নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চলছিলো কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ডেজিং। ইতিমধ্যে প্রকল্পের কাজ অর্ধেক শেষ হলেও কাজের সফলতা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ড্রেজিং কাজে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে রাতের আঁধারে মাটি বিক্রি এবং অত্যন্ত ধীরগতিতে ড্রেজিং কাজসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বলছে ভিন্ন কথা! তাছাড়া নদী ভরাট করে মেরিন ড্রাইভ নির্মাণে ঘোর বিরোধী পরিবেশ বিশেজ্ঞদের মতে, নদী তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এটাকে প্রতিবন্ধকতা করলে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, নদী ড্রেজিংয়ের আওতায় সদরঘাট লাইটার জেটি থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকা থেকে প্রায় ৩৬ লাখ ঘনমিটার মাটি উত্তোলন করার কথা। তারমধ্যে ১৮ লাখ ঘনমিটার মেরিন ড্রাইভের জন্য ব্যবহার হবে। অবশিষ্ট ৩১ লাখ ঘনমিটার মাটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যে কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারবে।
বন্দর রক্ষায় ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১১ সালের জুলাই মাসে কর্ণফুলী নদীর বহুল প্রতীক্ষিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরু হয়। ঠিকাদার সংস্থা মালয়েশিয়ান মেরিটাইম এ- ড্রেজিং করপোরেশনের অর্ধীনে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিলো। এটি বাস্তবায়নের পর কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্দরের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। একইসঙ্গে উদ্ধার হবে বন্দরের বেদখল হওয়া জমি। একইসাথে ২হাজার ৬১৫ মিটার ব্যাংক প্রটেকশন ও ৪০০ মিটার জেটি নির্মাণ করা সম্ভব হবে। এছাড়া রাজখালী খাল ও চাক্তাই খালের সংস্কারসহ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের জন্য জায়গার সংস্থান হবে । ২০১৩ সালের জানুয়ারী মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হবার কথা একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে জেপি নেতা আরও বলেন, কর্ণফুলী নদীর কার্যক্রমকে অপরিকল্পিত আখ্যায়িত করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক)। বিগত ২৯ আগস্ট চসিকের ২৬তম সাধারণ সভায় কাউন্সিলররা এ মন্তব্য করেন। মন্তব্যে তারা বলেন, ক্যাপিটাল ড্রেজিং নগরীর জলবদ্ধতা নিরসনে কোন সুফল বয়ে আনবে না। এতে শুধু কোটি টাকার অপচয় হচ্ছে।
আরো অভিযোগ উঠেছে যে ঠিকাদার সংস্থা কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ও বন্দরের নির্দেশ উপেক্ষা করে মাটি বিক্রি করছে। মেরিন ড্রাইভ তৈরি এবং সেখানে ভরাট ও সিডিএ’র প্রকল্পে মাটি ভরাটের পর অতিরিক্ত ও প্রয়োজনীয় যে বালি এবং মাটি থাকবে তার মালিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই বালি বিক্রি করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
লিখিত বক্তব্যে আজাদ দোভাষ বলেন, জাতীয় পাটি (জেপি) বর্তমান ১৪ দল সরকারের অন্যতম একটি রাজনৈতিক দল। দলের চেয়ারম্যান জননেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দলের চেয়ারম্যানের কাছেও আবেদন রইল কর্ণফুলী নদীকে যেন পরিবেশ ও দূষণমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বন্দর থানার সভাপতি মুরাদ চৌধুরী, ইপিজেড থানার সভাপতি এ.কে.এম জামাল হোসেন, কোতোয়ালী থানার সভাপতি মহসিন চৌধুরী, বন্দর থানার সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান হাওলাদার প্রমূখ।
