জুবায়ের সিদ্দিকী-
গ্যাসের মুল্য বৃদ্ধি যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা । দ্রব্যমুল্যের দফায় দফায় মুল্যবৃদ্ধির সাথে গ্যাসের মুল্যবৃদ্ধি যেন ’ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার ঘোষাই’। গ্যাসের দামবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষুদ্ধ-বিরক্ত সাধারন মানুষ। গ্যাসের দাম বাড়ার কারনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নাগরিক জীবনে। গ্যাসের দাম বহু ক্ষেত্রেই তাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। মাত্র দেড় বছর আগে গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর এবার তিন মাসের ব্যবধানে দুই দফা দাম বাড়ানোর ঘোষণায় সাধারন মানুষ খুবই বিরক্ত ও ক্ষুদ্ধ।
অনেকে মনে করছেন, গ্যাসের দামবৃদ্ধির ঘোষণায় সাধারন মানুষের মনে জন্ম নেওয়া ক্ষোভের বিস্ফোরন হতে পারে। এরই মধ্যে সরকারের শরীক জাতিয় পার্টি ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। এদিকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারীর এক ঘোষনায় আবাসিকে দুই দফায় ৩০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। প্রথম দফা ১ মার্চ থেকে, দ্বিতীয় দফা আগামী ১ জুন থেকে কার্যকর হবে। বর্তমানে এক চুলা ৬০০ টাকায় ব্যবহার করছে গ্রাহকরা। যা আগামী মার্চ থেকে এক চুলায় ৭৫০ টাকা একইভাবে গৃহস্থালিতে মিটারে যারা গ্যাসের বিল দেন তাদের মার্চ থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহারের জন্য ৯টাকা ১০ পয়সা এবং জুন থেকে ১১ টাকা ২০ পয়সা করে পরিশোধ করতে হবে।
এতদিন প্রতি ঘনমিটারে ৭ টাকা বিল দিতে হতো। অর্থাৎ রান্নার গ্যাসের জন্য চুলাভিত্ত্বিক গ্রাহকদের প্রতি মাসে ৫০ শতাংশ এবং মিটারভিত্তিক গ্রাহকদের ৬০ শতাংশের বেশি ব্যয় হবে। যানবাহনে জ্বালানীর ক্ষেত্রে ১ মার্চ থেকে সিএনজির দাম প্রতি ঘনমিটার ৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা এবং ১ জুন থেকে ৪০ টাকা হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার, শিল্প ও বানিজ্যিক খাতেও গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়ে ৫ থেকে ৫০ শতাংশ। গ্যাসের দাম বাড়ায় আর্থিকভাবে সবক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে করে সাধারন মানুষের যোগাযোগ ও পন্য আনা নেয়ার খরচ বেড়ে যাবে। যা সাধারন ভোক্তাদের বইতে হবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচেও প্রভাব ফেলবে গ্যাসের বর্ধিত ব্যয়।
এতে সরকারী বেসরকারী সবগুলো বিদ্যুৎ প্লান্টে ব্যয় বাড়বে। ফলে সরকার ইতিমধ্যেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। যার নেতিবাচক ফল ভোগ করবে নাগরিকরা। এতে গ্যাসের দাম সাধারন নাগরিকদের ক্ষুদ্ধ ও বিরক্ত করছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস.এম নাজের হোসাইন বলেন,’ চট্টগ্রামে এমনিতেই নিয়মিত গ্যাস থাকে না। থাকলেও প্রায় সময় গ্যাসের চাপ থাকে না। এতে চট্টগ্রামের মানুষকে বিকল্প জ্বালানী সবসময় ব্যবহার করতে হয়।
বিকল্প জ্বালানীর ব্যয় বহন করার পর এখন গ্যাসের দাম আবারো অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে। এতে সাধারন মানুষের মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন,’ চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৫০০ মিলিয়ন ঘটনফুট। এখন জাতীয় গ্রিড় থেকে চট্টগ্রামকে দেয়া হচ্ছে ২২০ থেকে ২৫০ ঘটফুট। চট্টগ্রামের ন্যায্য চাহিদাও পুরন করছে না সরকার। তার উপর গ্যাসের অতিরিক্ত দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে সাধারন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। তিনি বলেন,’ লাখ লাখ গ্রাহকের ক্ষতি করে সরকার গুটিকয়েক এলএনজি আমদানীকারকদের স্বার্থ রক্ষা করছেন। আবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন সহ উৎপাদন খাতে গিয়ে পড়বে। এতে একদিকে যাতায়াত ব্যয় বাড়বে, আরেকদিকে খাদ্যের দাম বাড়বে।
সবগুলোর কুফল গিয়ে পড়বে সাধারন মানুষের ঘাড়ে। এতে যে কোন সময় সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ বাড়তে পারে। তিনি বলেন,’ গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে অল্প অল্প করে গ্যাসের দাম বাড়ালে সাধারন মানুষের উপর চাপটা কমতো। নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাৎ হোসেন প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন,’এ সরকার জনগনের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। তাই তারা জনগনকে পরোয়া করেন না। সরকার তার রাজস্ব আহরনের জন্য সাধারন জনগনকে হাতিয়ার বানিয়েছে। সরকার জনগনের ঘাড়ে পা রেখে সবকিছুর দাম বাড়াচ্ছে’। এদিকে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে , এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষনা দিচ্ছে। এতে করে পন্যের দাম বাড়বে।
মানুষের জীবনযাপনের ব্যয় বাড়বে, ফলে জনভোগান্তি তৈরী হবে। জনজীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। তিনি বলেন, সরকার পন্যের উপর ভ্যাট বসিয়েছে। দেড় বছর পার না হতেই গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে। কথায় কথায় বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। সব সিদ্ধান্তই সাধারন জনগনের বিপক্ষে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের এ আচরনে সাধারন মানুষ ক্ষুদ্ধ। যা আগামী নির্বাচনে ম্যান্ডেটের মাধ্যমে প্রতিফলন ঘটবে। নগর জাতীয় পার্টির সভাপতি মাহজাবীন মোরশেদ এমপি বলেছেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি একদিকে গ্যাসনির্ভর রপ্তানীখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আবার নি¤œ মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রারা ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে সাধারন মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।
তিনি বলেন,’ যেভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে তা অযৌক্তিক। আবাসিকে ৫০ টাকা করে গ্যাসের দাম বাড়ানো যেত। এতে ক্ষতিকর প্রভাব কম হত। এখন গ্যাসের দামের প্রভাব সব পন্যের উপর পড়বে। সাধারন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেড় বছর পর দুই ধাপে গ্যাসের মুল্যবৃদ্ধি এবং নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষনা দেয়ায় বিনিয়োগ কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়লে বিনিয়োগকারীরা নতুন শিল্প স্থাপনে নিরুৎসাহিত হবে। উৎপাদন খরচ বেড়ে রপ্তানীমুখী তৈরী পোশাক শিল্পসহ স্থানীয় অনেক শিল্প প্রতিষ্টান অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। ফলে বিশ্ববাজার প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক শিল্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে সাধারন মানুষ। কেননা গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়লে এর প্রভাব পড়বে পুরো জীবনযাত্রায়। বিশেষ গনপরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, খাদ্যসামগ্রীর উর্দ্ধমুল্য সহ প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে ভোক্তাদের। অর্থনীতিবিদরা বলছেন,’ শিল্পে প্রয়োজনীয় গ্যাস সংযোগ দিতে পারছে না সরকার।
গ্যাসের অভাবে অনেকে শিল্প কারখানা করে বসে আছেন। যেসব শিল্পে গ্যাস সংযোগ আছে সেখানে প্রায় সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না। এ অবস্থায় দাম বাড়ানোর ফলে গ্যাসনির্ভর শিল্প নতুন সংকটে পড়বে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিনিয়োগকারীদের উপর। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন,’বর্তমানে বিনিয়োগ ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। গ্যাসের মুল্যবৃদ্ধিতে সেটি আরও কিছুটা বাড়বে। জমির স্বল্পতা, অহেতুক পরিবহন ধর্মঘট, দুর্নীতি, বিদ্যুতের সমস্যা তো আছেই। তিনি আরও বলেন, গ্যাস খাতে সরকারের লোকসান হচ্ছে না। তাই দাম বাড়ানোর যৌক্তিক কারন দেখতে পাচ্ছি না।
