সিটিনিউজ ডেস্ক::বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যান এমন প্রতি ১০ জন পুরুষ শ্রমিকের মধ্যে নয়জনই দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ শাখা টিআইবির এক গবেষণায় এই তথ্যটি উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এই গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। এ সময় জানানো হয় ‘শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সুশাসন: সমস্যা ও উত্তরণের উপায়’ বিষয়ে গবেষণাটি করা হয় ২০১৬ সালের মে থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত। এতে দেখা যায়, অভিবাসন প্রত্যাশীদেরকে ভিসার ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি মূল্য দিতে হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, সরকারিভাবে সৌদি আরবে শ্রম অভিবাসন ব্যয় হয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা। তবে কার্যত একজনকে পরিশোধ করতে হয় পাঁচ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত অংকের চেয়ে তিন গুণ বেশি। এই অতিরিক্ত টাকা দুই দেশেরই দালালরা পেয়ে থাকে। বাড়তি হিসেনে নেয়া এই টাকা সৌদি আরবে পাঠানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জানান, দুর্নীতির টাকার ভাগ শুধু দালালরা নয়, যায় সরকারি কর্মকর্তা ও দূতাবাসের কর্মীদের পকেটেও। এই দুর্নীতিতে সরকারের সুশাসনের অভাব হিসেবেই দেখছেন তিনি। বলেন, ‘সরকার চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে।’
কী ধরনের দুর্নীতি হয়-এ বিষয়ে উদাহরণ টানতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুস্থ ব্যক্তিকেও আনফিট বলে ঘোষণা করা হয়। পরে টাকার বিনিময়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘ফিট’ সনদ দেয়া হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষা না করেই ফিট সনদ দেয়া হয়।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অভিবাসন প্রত্যাশীরা দুর্নীতি শিকার হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কর্মীর কাছে ভিসা বিক্রি নিয়ে। বিদেশে চাকরি সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানা, চুক্তিপত্র হাতে দেরিতে পাওয়া বা না পাওয়া, অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে ভিসার জন্য অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনামূল্যে হওয়ার থাকলেও নারী অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
ভিসা প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে পুলিশে ছাড়পত্র সংগ্রহের জন্যও অর্থ আদায় করা হয়। গন্তব্য দেশের ভিসা স্ট্যাম্পিংয়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে অর্থ আদায় ও হয়রানির অভিযোগ আছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে গ্রুপ ভিসার নিয়োগ অনুমতির জন্য নিয়ম বহির্ভূত অর্থ আদায় করা হয়।
হয়রানি কমানোর জন্য সুপারিশ
গবেষণায় বলা হয়, সরকারের বেশ কিছু উদ্যোগ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দুর্ভোগ কমাতে পারে। তারা যেসব সুপারিশ করেছে এর মধ্যে আছে কর্মী বাছাই, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ প্রদান; শ্রম অভিবাসনসংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া; প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শ্রম উইংয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি; দালালদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য তাদেরকে রিক্রুটিং এজেন্টদের সাব এজেন্ট বা নিবন্ধিত প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা; সরকারি নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের ন্যূনতম পাঁচ গুণ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা; অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রভৃতি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান এম হাফিকউদ্দিন খান। গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন মনজুর ই খোদা, শাহাজাদা এম আকরাম।
