সরকারীভাবে জেলা পর্যায়ে নিলু বড়ুয়া জয়িতা নির্বাচিত

0

নিজস্ব প্রতিনিধি,চন্দনাইশ : দীর্ঘ ২৫ বছর পর জীবন সংগ্রামে জয়ী নিলু রানী বড়ুয়াকে সরকারীভাবে চলতি বছর জয়িতা নির্বাচিত করেন চন্দনাইশের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। তিনি জেলা পর্যায়েও জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন।

জানা যায়, চন্দনাইশ পৌরসভার হারলা বড়ুয়া পাড়ার বিশিষ্ট সমাজ কর্মী, দানবীর সুর্দশন বড়ুয়া ঐ এলাকার একজন স্বনাম ধন্য ব্যক্তি ছিলেন। তার সাথে এলাকার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, সবার সাথে সুসম্পর্ক ছিল।তিনি এলাকার মানুষকে ভাল কাজের জন্য সুসংগঠিত করতেন। এক বাক্যে তাকে সবাই শ্রদ্ধা করতেন।

তিনি নিজ ভিটায় দ্বিতল বিশিষ্ট মাটির তৈরি দোকান করে নিজের সংসার জীবন চালাতেন। তার সংসারে সে সময় স্ত্রী নিলু রাণী বড়ুয়া (নিরুপমা বড়ুয়া) সুশান্ত বড়ুয়া (২৫), শিখা বড়ুয়া (২২), সুমিতা বড়ুয়া (২০), সুব্রত বড়ুয়া (১৮), অমিতা বড়ুয়া (১৬), বনিতা বড়ুয়া (১৪) সহ আট জনের সংসার ছিল। সুখে শান্তিতে ছিল তার সে সংসার। ছেলে-মেয়েরা সবাই অধ্যায়নরত ছিল। ১৯৯২ সালে ২৩ অক্টোবর দিবাগত গভীর রাতে ডাকাত সেজে এলাকার একটি কুচক্রী মহল সুর্দশন বড়ুয়ার দোকানে এসে ডাকাডাকি করে।

তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্বিতল বিশিষ্ট মাটির তৈরি দোকানের দ্বিতীয় তলায় উঠে যায়। সেখানে থাকা এসিডের বোতল নিয়ে দুষ্কৃতিকারীদের ভয় দেখান। তখন দুষ্কৃতিকারীরা তাকে দোকান ঘরে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে মারার হুমকি দেয়। কিন্তু সুর্দশন বড়ুয়া তাদের হুমকিকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তিনি দোকানের পাশে ঘরে থাকা স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের ডাকতে শুরু করে। এসময় দুষ্কৃতিকারীরা তার ঘরের বাহিরে তালা দিয়ে সবাইকে বসত ঘরে আবদ্ধ করে রাখে।

অবশেষে ডাকাত বেশে এলাকার এসকল দুষ্কৃতিকারীরা দোকান ঘরের চালে কেরোসিন দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। দোকান ঘরে আগুন লাগার পর আগুনের লেলিহান শিখা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসতে থাকে। কিন্তু ডাকাতবেশী দুষ্কৃতিকারীরা গুলি করে সাধারণ মানুষকে আতংকিত করে আসতে দেয়নি।

ঘন্টাকাল ব্যাপী আগুন জ্বলে দোকান ঘরটি সম্পূর্ণ ভষ্মিভূত হয়। ফলে দোকান ঘরের দ্বিতীয় তলায় আগুনে পুড়ে মারা যায় সুর্দশন বড়ুয়া। তার মৃত্যু নিশ্চিত করে দুষ্কৃতিকারীরা পালিয়ে যায়। সকালে সুর্দশন বড়ুয়ার লাশ দেখতে গিয়ে সাধারণ মানুষ দেখে একটি মুর্তির মত দেখা যায় সুর্দশন বড়ুয়ার মৃত দেহকে।

কথা হয়েছিল চন্দনাইশে জয়িতাদের সংবর্ধনা অনুষ্টানে আসা সুর্দশন বড়ুয়ার স্ত্রী নিলু রানী বড়ুয়ার সাথে। তিনি এ কথা গুলো বলতে বলতে আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, স্বামী হারিয়ে সেদিন মামলা করতে পারিনি। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলেও বিএনপি ক্ষমতায় থাকার কারণে দীর্ঘ নয় বছর পর আসামীরা খালাস পেয়ে যায়। তৎকালীন বি এন পি সরকারের একজন প্রভাবশালী নেতার ছত্র ছায়ায় থেকে খুনীরা পার পেয়ে যায়। সে ব্যাথা ও বিবেশিখাময় স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেনি নিলু রাণী বড়ুয়া ও তার ছেলে মেয়েরা।

হত্যাকারীদের মধ্যে একজন এখন ও তার নাতনিকে দেখে বলে তোর দাদুকে আমি হত্যা করেছি। এ কথা গুলো নাতনি যখন বাসায় এসে বলে তখন তার বুক কান্নায় ফেটে যায়। দীর্ঘ ২৫ বছর নির্যাতনের স্মৃতি বুকে নিয়ে অনেক কষ্টে ৬ জন ছেলে মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিবাহ দিয়ে সংসারী করেছেন। মেয়ে শিখা বড়ুয়াকে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারী পাশ করিয়েছেন। চন্দনাইশে এবারের জয়িতা নির্বাচনে “নির্যাতনের বিবেশিখা মুছে ফেলে, নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী” এই শৃঙ্খলায় এসেছে নিলু রানী বড়ুয়া।

তিনি জেলা পর্যায়ে ১৪টি উপজেলায় এ ক্যাটাগরীতে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। এ ব্যাপারে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা গীতা চৌধুরী বলেছেন, নিলু রানী বড়ুয়া একজন নির্যাতিত মহিলা। তবে তিনি সাহসী এবং কর্মবীর। তিনি তার সেই নির্যাতনের বিবেশিখাময় ঘটনাকে মুছে ফেলে নিজের ছেলে মেয়েদেরকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.