আগ্রাবাদ এক্সেস রোড : পানিবন্ধী মানুষের আর্তনাদ

0

গোলাম শরীফ টিটু,সিটি নিউজ : মাত্র দুয়েক ঘন্টার বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের পানিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে নগরীর নিম্নাঞ্চল। আজ বৃহস্পতিবার ৩১মে সকাল থেকে বৃষ্টি শুরু হলে আগ্রাবাদসহ এক্সেস রোডের আশপাশে মানুষ পানিবন্ধী হয়ে পড়ে। গত ১৯ মে শনিবার বেলা ১২টার পর থেকে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহর ও বাকলিয়া সহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। এতে করে পবিত্র রমজান মাসে চরম দুর্ভোগ-দুর্দশায় পড়েছেন এসব এলাকার শত-শত বাড়িঘরের লোকজন ও ব্যবসায়ীরা। এ সময় বৃষ্টি ছিল প্রচন্ড গতীতে। ইফতারের পর পর্যন্ত থাকে এ জোয়ারের পানি।

বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে পড়ে পথচারীদের ও যান চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গত কয়েকদিন ধরেই এসব এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে জলদুর্ভোগ নিরসনে গত ১৯ মে সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনকে স্মারকলিপি দিয়েছে প্রজন্ম সংগঠন নামে একটি সামাজিক সংগঠন। ২৪নং উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের মুহুরীপাড়া, গুলবাগ, দাইয়াপাড়া ও উত্তর আবাসিক এলাকায় নাগরিকদের জলদুর্ভোগ নিরসনে দাইয়াপাড়ায় একটি অনুষ্টানে ৫ দফা দাবী সংবলিত এ স্মারকলিপি দেয়া হয়।

স্মারকলিপিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের একেবারে শেষ ও নিম্নাংশে মুহুরীপাড়া, গুলবাগ, দাইয়াপাড়া ও উত্তর আবাসিক এলাকা অবস্থিত। আগ্রাবাদ এক্সেস রোড়, সিডিএ আবাসিক এলাকা, বেপারী পাড়া, ছোটপুল এলাকাও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়।

ফলে এসব এলাকাবাসীর দুর্বিষহ কষ্ট বর্ষাকাল জুড়ে লেগে থাকে। জলদুর্ভোগ থেকে রক্ষা করার জন্য স্মারকলিপিতে মেয়রের নিকট উত্থাপিত দাবীতে তারা বলেন.’ মুহুরীপাড়ার দক্ষিনাঞ্চল অর্থাৎ মুহুরীপাড়ার মোড় থেকে গুলবাগ আবাসিক এলাকা ফুলকলির মোড় পর্যন্ত বিধ্বস্ত সড়কটি সংস্কারকরন এবং নতুন এক্সেস রোড়ের উচ্চতার সমন্বয় করে পুননির্মান করন, মুহুরীপাড়া, উত্তরা আবাসিক এলাকা, দাইয়াপাড়া ও গুলবাগ আবাসিক এলাকার ড্রেনগুলো বৃহদাকারে পুননির্মান করন, মুহুরীপাড়া রোড়ের পার্শস্থ বাইলেনগুলোকে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় সংস্কার ও উন্নয়ন সাধন।

মুহুরীপাড়ার দক্ষিনাংশে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত সরকারী বাড়ি রয়েছে। সে বাড়িতে দুইটি পরিবার নামমাত্র ভাড়ায় বসবাস করছে। যার কোন বৈধতা নেই। স্মারকলিপিতে তারা সেই বাড়িটি সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এনে একটি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ স্থাপন করার দাবী জানান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে,’ এই পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠে। যার নেতৃত্ব দেন মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা কমান্ডার মৌলভী ছৈয়দ। যার কাহিনী এখনো মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ছাত্রনেতাদের মুখে মুখে। যে কারনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা কমান্ডার মৌলভী ছৈয়দকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার।

মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন স্মারকলিপি গ্রহন করে স্মারকলিপিতে বার্ণিত দাবীসমুহ যুক্তিসংগত উল্লেখ করে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহনের আশ্বাস দিয়ে বলেন,’ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আয়ের উপর ভিত্তি করে নগরীর নালা নর্দমা থেকে মাটি ও আবর্জনা উত্তোলনের ক্রাশ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করছে। যাতে নালাগুলো সচল থাকে। জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, প্রধানমন্ত্রী জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার অধিক মেগাপ্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ৫শত কোটি টাকার কাজ করছে সিডিএ।

সেনাবাহিনীর মাধ্যমে চলমান নালা থেকে মাটি উত্তোলন কার্যক্রম শেষ হলে চলতি বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি নালা নর্দমা, খালে-বিলে ও যত্র-তত্র আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকার জন্য নগরবাসীর প্রতি আহবান জানান। প্রজন্ম সংগঠনের স্মারকলিপি হস্তান্তরের সময় উপদেষ্ঠা মো: বেলাল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা মো: আবদুল লতিফ, মো: আবু মুছা চৌধুরী, সংগঠনের সভাপতি মো: গোলাম সরওয়ার খোকন, সাধারন সম্পাদক এম.এনাম কবির রাব্বী সহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ২৭নং দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের বেপারী পাড়া, সিডিএ আবাসিক এলাকা, বিল্লাপাড়া ও ছোটপুল এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই প্লাবিত হচ্ছে রাস্তাঘাট সর্বত্র।

জানা গেছে, বিগত বছরের ১৯ নভেম্বর শুরু হওয়া আগ্রাবাদ এক্সেস রোড়ের ত্রুটিপুর্ন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারনে পানি প্রবাহে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। যে কারনে মানুষের বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ছে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি। আগ্রাবাদ এক্সেস রোড়ের সম্প্রসারন ও সংস্কার কার্যক্রম পর্যবেক্ষন করে দেখা যায়,’ উন্নয়ন কার্যক্রমের কোন সুষ্ট পরিকল্পনা করা হয়নি।

নালা নর্দমা থেকে জোয়ারের পানি নিয়ে নির্মানসামগ্রীতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্সেস রোড়ের উত্তরপাশ্বের নালাটির তুলনায় দক্ষিণ পাশ্বের নালটি খুঁবই ছোট। যে কারনে দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের বেপারী পাড়া, সিডিএ আবাসিক এলাকা ও ছোটপুল এলাকাবাসী এর কোন সুফল পাবে কিনা তা নিয়ে সংশয়ে আছেন। তাদের মতে,’ দুই থেকে তিন ফুট প্রশস্ত এই নালা বিশাল এলাকার পানি প্রবাহে সক্ষম হবে না। এ ছাড়া অনেকাংশে অবৈধ দখলদারদের কারনে এক্সেস রোড়টি ছোট হয়ে গেছে।

এই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নালাটি আরও প্রশস্ত করা এখন সময়ের দাবীতে পরিনত হয়েছে। এক্সেস রোড়ের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে,’ ছয়মাস গত হচ্ছে এখনো এক্সেস রোড়ের কাজ শেষ হচ্ছে না। সড়কটি এতবেশি উঁচু করা হয়েছে, যার ফলে উভয় পাশের ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্টানগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। সড়কের পাশের বাসাবাড়ির নিচতলা সম্পুর্ন নর্দমায় পরিনত হবে। কারন হিসেবে বলা হচ্ছে, বিভিন্ন সংযোগ সড়কের নালার চেয়ে এক্সেস রোড়ের নালাটি উপরে হওয়ায় পাড়া ও মহল্লার নালা-নর্দমার পানি প্রবাহে বাধাগ্রস্থ হবে। ফলশ্রুতিতে অর্ধশত কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিতব্য এ সড়ক তেমন সুফল বয়ে আনবে না। বরং পাড়া ও মহল্লার জলাবদ্ধতাকে ভয়ংকর অবস্থায় নিয়ে যাবে।

এলাকার সচেতন মহলের মতে,’ এক্সেস রোড়ের উত্তরপাশের মত দক্ষিণপাশের নালাকেও বড় করে পুন:নির্মান না করা না হলে কোন সুফল আশা করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজনে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করতে হবে। তাদের মতে, এখনো সড়কের অনেক জায়গা দখল করে আছে স্থানীয়দের অনেকেই। অনেক ভবন নির্মান করা হয়েছে নালার উপর। সিডিএর কোন নজরদারী ছিল না।

সড়কটি পাশে ১২০ফুট প্রশস্ত থাকার কথা থাকলেও বেপারী পাড়া মোড় থেকে আগ্রাবাদ বাদামতলী পর্যন্ত ক্রমশ সংকোচিত হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার কোথাও ১০০ থেকে ১০৫ ফুট আবার কোথাও ৮৫ থেকে৯০ ফুট রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে,’সড়কটি নির্মানকালে চসিকের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী তার এক আত্বীয়ের জায়গা বাঁচাতে গিয়ে সড়কের এ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তন করে সড়কটিকে উত্তর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এ অপকর্মে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক, প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার ও কানুনগো সবাই জড়িত ছিলেন। যে কারনে উত্তরাংশের একাধিক ভুমি মালিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দক্ষিনাংশের নালায় একাধিক বাঁক সৃষ্টি করে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। এসব কারনে স্থানীয় অধিবাসীদের দাবী, অবিলম্বে এক্সেস রোড়ের ম্যাপ অনুয়ায়ী দক্ষিনপাশের নালাকে বড় করা হলে দ্রুত পানি সরবরাহ হবে এবং জলাবদ্ধতা কমবে। এ বিষয়ে তারা চসিকের মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.