সৈয়দ শিবলী ছাদেক কফিল : দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কমর্কা-ে জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট একটি অত্যাবশ্যকীয় নীতি নির্ধারণী বিষয় যেখানে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ এবং তাদের নির্বাচিত আইনপ্রণেতা ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ অতি প্রয়োজনীয়। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ার নীতিগত সমস্যা এবং বাজেটে জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে জাতীয় সংসদে কথা বলে যাচ্ছে। উন্নয়ন অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার জন্য জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরীর কাজ শুরু করা দরকার। বিশেষতঃ অনুন্নত অঞ্চলের প্রতি বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য দুর করতে সরকারকে আরো কিছু উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।
সেইসাথে বাজেট ডকুমেন্টকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে উপস্থাপন করার প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনার সময়সীমা আরো বাড়ানো উচিত যাতে সংসদ সদস্যগণ দীর্ঘ সময় নিয়ে সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে পক্ষে কিংবা বিপক্ষে মতামত দিতে পারেন সেজন্য ‘কার্যপ্রণালী বিধি’তে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যেতে পারে। বাজেটে জনমতামতের কার্যকরী প্রতিফলন ঘটাতে ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ বা পিপিপি’র নামে রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্পকারখানার বেসরকারিকরণ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পিপিপি’র আওতায় নতুন প্রকল্পে তহবিল যোগানের নামে জনগণের ঘাড়ে প্রকল্প খরচের দায় চাপানো যাবে না। নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, উপকূল-চর-হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীসহ অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ কর্মসূচী থাকা দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বাজেট বাড়ানো দরকার।
এক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ এর আলোকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের মূল্যায়ন হওয়া জরুরী। কর্ণফুলীকে রক্ষার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। কর্ণফুলীর দূষণ ও দখল রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ ও বরাদ্ধ রাখতে হবে। কারণ কর্ণফুলী বাঁচলে বন্দর বাঁচবে এবং বন্দর বাঁচলে দেশ বাঁচবে। বিশ্বের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীকে রক্ষার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।
জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস, সেন্টার অন বাজেট এন্ড পলিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন-এর ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাজেট শুনানী ২০১৬-১৭ অনুষ্ঠানে বক্তাগণ উপরোক্ত মতামত প্রদান করেন। জাতীয় পরিকল্পনা ও বাজেট সম্পর্কিত সংসদীয় ককাস’র সহসভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা এমপি’র সভাপতিত্বে উক্ত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন আলহাজ্ব মো: নজরুল ইসলাম চৌধুরী এমপি, কাজী রোজী এমপি, নাজমুল হক প্রধান এমপি, টিপু সুলতান এমপি, ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম এবং গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ, আর, আমান।
বাজেট শুনানীর শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন-চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি প্রফেসর ডা. এ, কিউ, এম, সিরাজুল ইসলাম। গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ, আর, আমান’র সঞ্চালনায় উক্ত অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন-চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও ইপসা’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন দাবী ও বাজেট প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা করেন দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশের নগর সম্পাদক এম. নাসিরুল হক, জাপানের অনারারী কনসাল জেনারেল উন্নয়ন চিন্তক মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর আবিদা আযাদ, কাউন্সিলর ফারজানা পারভিন, সীতাকুন্ড উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজমুন নাহার নেলী, রাঙ্গুনীয়া উপজেলা পরিষেদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট রেহেনা আকতার, জাতীয় শ্রমিক পার্টির সাবেক সভাপতি শ্রমিক নেতা এম, এ, সাত্তার, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি আহমদ কবির, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তফা কামাল যাত্রা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নুরজাহান খান, নারী উন্নয়ন কর্মী জেসমিন সুলতানা পারু, গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন-কুমিল্লা জেলা কমিটির ইকরাম রানা, ইউনেস্কু ক্লাবের আহসান ফারুক, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেজ ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)’র মোহাং মুসা বাদশা, চিটাগং রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’র নোমান বাহার, মাইশা’র ইয়াসিন মঞ্জু প্রমূখ।
আগামী জুন মাসে ২০১৬-১৭ সালের জাতীয় বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে তারই প্রস্তুতি হিসেবে জাতীয় ককাসের সদস্যরা গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন-চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহযোগিতায় স্থানীয় অঞ্চলের মানুষের সাথে বাজেট বিষয়ক শুনানী অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
ককাসের সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা এমপি বলেন, দেশের সুষম ও সমন্বিত উন্নয়নের জন্য বাজেটকে জনকেন্দ্রীক ও জনবান্ধব করার জন্য সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করেছে এবং বাজেটের গনতন্ত্রায়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নসহ বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ বরাদ্ধ রাখা প্রয়োজন। তিনি চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য কাকসের পক্ষ থেকে সংসদে কথা বলবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন।
মোহাং নজরুল ইসলাম চৌধুরী এমপি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নের জন্য আমাদেরকে আরও বেশী সচেষ্ট হতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষার জন্য কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হবে। কর্নফুলীর দূষণ ও দখল রোধে আমাদের সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। উক্ত বাজেট শুনানীতে গণমাধ্যম কর্মী, উন্নয়ন কর্মী, শিক্ষাবিদ, তৃণমূল প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিধি অংশগ্রহন করেন।

Comments are closed.