গার্মেন্টস কর্মীদের সহায়তায় কেন্দ্রীয় তহবিল

0

                                                                               মোঃ আকতারুল ইসলাম –

২০২১ সালে মধ্যআয়ের দেশ ও ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশে পরিণত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশ দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে। মধ্যআয়ের দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে আমাদের দেশের অবস্থান থাকবে ওপরের দিকে, কল-কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, রপ্তানি আয় হবে শত বিলিয়ন ডলার; প্রতিটি কারখানা শ্রমিকের জন্য নিরাপদ কর্মক্ষেত্র হবে ও শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি পাবে- এ ধরনের অনেক স্বপ্ন আমাদের। কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনায় পড়লে, অসুস্থ হলে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে অথবা চাকুরি শেষে অবসরকালে বোনাস পাবে; প্রভিডেন্ট ফান্ড আর বীমা সুবিধার আওতায় আসবে; শ্রমিকের জন্য তৈরি হবে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ, সহজে সকল সুবিধা দেওয়া যাবে এ স্বপ্নগুলোর প্রতিফলন দেখা যায় আমাদের অর্থনীতিতে। স্বপ্ন বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। আর এসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের অন্যতম সফল একটি উদ্যোগ হচ্ছে শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের কল্যাণে গঠিত কেন্দ্রীয় তহবিল। প্রাথমিকভাবে এ তহবিল গঠন করা হয়েছে গার্মেন্টস কর্মীদের সহায়তার জন্যই।

২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইন এর ২৩২(৩) ধারা এবং ২০১৫ সালের ২১৮ বিধির আলোকে পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়। অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণ ও আদায়ের পদ্ধতি এবং তহবিলের অর্থের ব্যবহারের বিধানসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধান করার ক্ষমতা এ পরিচালনা বোর্ডকে প্রদান করা হয়েছে।

শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত সুবিধাভোগীদের জন্য ক্রেতা ও মালিকের সমন্বয়ে সেক্টরভিত্তিক কেন্দ্রীয়ভাবে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শ্রম আইন এবং শ্রমবিধির আলোকে এক প্রজ্ঞাপন দ্বারা সরকার ৯ সদস্য বিশিষ্ট গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরের কেন্দ্রীয় তহবিল পরিচালনা বোর্ড গঠন করেছে। সোনালী ব্যাংক এর ঢাকাস্থ রমনা কর্পোরেট শাখায় ঈবহঃৎধষ ঋঁহফ (জগএ ঝবপঃড়ৎ) শিরোনামে একটি ঝঘউ হিসাব খোলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় তহবিলের আওতায় নিয়ম অনুযায়ী আরো দু’টি হিসাব খোলা হবে। ১) সুবিধাভোগী কল্যাণ হিসাব ও ২) আপদকালীন হিসাব। দুটি হিসাবেরই অর্থের ব্যবহার এবং শ্রমিকদের সহায়তার কাজটি সহজতর করার জন্য গার্মেন্টস সেক্টরে কর্মরতদের ডাটা বেজের আওতায় আনতে হবে। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ এর আওতাভুক্ত কারখানাসমূহে কর্মরতদের ডাটাবেজের অর্ন্তভুক্ত করার কাজ শেষ পর্যায়ে আছে।

বর্তমান বছরের জুলাইয়ে এ তহবিলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মোট রপ্তানি মূল্যের ০.০৩ ভাগ হারে জুলাই থেকে ১৫ অক্টোবর ১৬ পর্যন্ত এ তহবিলে জমা হয়েছে প্রায় ১১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ গত বছর ২৮ বিলিয়ন ডলার তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এ বছর যদি ২৮ থেকে ৩০ বিলিয়ন রপ্তানি আয় ধরা হয় তবে আগামী এক বছরে এ তহবিলে জমা হবে ৭২ থেকে ৭৫ কোটি টাকা। আশা করা যায়, আগামী জানুয়ারি নাগাদ এ তহবিল থেকে গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমিকদের সহায়তা প্রদান করা করা যাবে।

শুধু এই কেন্দ্রীয় তহবিল নয়, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ, উৎপাদনবৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের জন্য সরকার শ্রমিককল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিল থেকে শ্রমিকদের মৃত্যুজনিত, দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শ্রমিকদের, শ্রমিকদের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষাসহায়তা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনেও সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শিশুশ্রম নিরসনেও গ্রহণ করেছে প্রকল্প। ইতোমধ্যে দেশের চারটি বিভাগীয় শহরে শিশু জরিপের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড খোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর বিজিএমইএ এবং বিকেএমই এর নেতৃবৃন্দের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় তহবিল গঠন করা সম্ভব হয়েছে। দেশের অর্থনীতির চিত্রই পাল্টে দিয়েছে এই খাত। আর এ খাতে নিয়োজিত প্রায় ৫০ লক্ষ শ্রমজীবী খেটে খাওয়া মানুষের কল্যাণে এ ধরনের একটি তহবিল গঠন বড়ো অর্জন। এমন একটি পদ্ধতি চালু হয়েছে যে, পণ্য রপ্তানি হবে আর এ তহবিলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা জমা হবে। আর এ অর্থ থেকেই লক্ষ লক্ষ গার্মেন্টস কর্মীদের সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হবে। এ তহবিল গার্মেন্টস কর্মীদের অবসরে, আপদ-বিপদে সেফগার্ড হিসেবে কাজ করবে’।

শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে নিয়োজিত কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তার স্বজনরা কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে পাবে ৩ লক্ষ টাকা। কোনো শ্রমিক স্থায়ীভাবে পঙ্গু হলে পাবে ২ লক্ষ টাকা। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য পাবে ১ লক্ষ টাকা। কোনো শ্রমিকের সন্তান সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় অথবা মেডিকেল কলেজে পড়ালেখা করলে তাকে সর্বোচ্চ তিন লক্ষ টাকা এবং সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করলে তবে তাকে ৫০ হাজার টাকা শিক্ষা সহায়তা প্রদান করা হবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শ্রমিকের বীমার অর্থও পরিশোধ করা হবে এ তহবিল থেকে। শ্রমিকের কল্যাণ আরো সহজতর করার বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। বীমার বদলে প্রোভিডেন্ট ফান্ড খোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ১৫/২০ বছরের সময় নির্ধারণ করে প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে অর্থ প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমার ব্যবস্থা করা হবে। একজন শ্রমিক প্রতিমাসে যে পরিমাণ অর্থ জমা দিবে প্রতিমাসে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে সে পরিমাণ অর্থ তার একাউন্টে জমা দেওয়া হবে। চাকুরি শেষে জমানো অর্থ লভ্যাংশসহ যা হবে তার সাথে এ তহবিল থেকে আরো ২ লক্ষ টাকা যোগ করে প্রদান করা হবে। আর কোনো শ্রমিক যদি তার আগে মারা যায় তাহলে যত টাকা জমা হবে তার লভ্যাংশসহ এ তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা যোগ করে তার পরিবারকে প্রদান করা হবে।

শতভাগ রপ্তানিমুখী এ শিল্পের প্রতিটি শ্রমিকের অবসর সময়ে কিংবা আপদে-বিপদে এ তহবিল পাশে থাকবে। প্রতিটি শ্রমিকের পাশে থাকবে কেন্দ্রীয় তহবিল নামে আর্থিক নিরাপত্তা আর নির্ভরতার একটি প্রসারিত হাত। সে দিন বেশি দূরে নয় যেদিন প্রতিটি শ্রমিক অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হবে। তাদের জীবনমানের উন্নয়ন হবে। হাসি ফুটবে প্রতিটি শ্রমিকের মুখে।  পিআইডি ফিচার  

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.