চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা মার্ডার এবং উত্তপ্ত রাজনীতি
জুবায়ের সিদ্দিকী-
চট্টগ্রাম মহানগরের চন্দনপুরার বাসা থেকে ২৯ মার্চ বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নুরুর লাশ পাওয়া গেছে রাউজান উপজেলার বাগোয়ান এলাকায় কর্নফুলী নদীর পাড়ে। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের স্বজন ও বিএনপি নেতারা। স্থানীয় লোকজনের কাছে খবর পেয়ে পরদিন বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ২টার দিকে নুরুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রাউজান থানা পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, নুরুর লাশের মাথায় গুলির চিহ্ন আছে। হাত পা রশি দিয়ে বাঁধা। পরণে লুঙ্গি। শার্ট দিয়ে চোখ বাঁধা। মুখের ভেতরে ওড়না ঢোকানো পাওয়া গেছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ সম্পাদক নুরুল আলম নুরুর বাড়ি রাউজান উপজেলার গুজরা ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামের কমলার দিঘীর পাড় এলাকায়। তবে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন নগরের চন্দনপুরা এলাকায়। এ ছাত্রনেতা বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ট অনুসারী হিসেবে পরিচিত। নুরুর পরিবারের সদস্য নাম প্রকাশ না করে অভিযোগ করে বলেছেন, বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাস (হাইস) করে জেলা পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত তিনজন পুলিশ এবং সাদা পোশাকধারী ১০-১২ জন লোক বাসায় প্রবেশ করেন।
তিনজন পোশাকধারী পুলিশের মধ্যে একজনের নেমপ্লেটে জাবেদ নাম লেখা ছিল। তারা কোন কথা না বলে মিনিট পাঁচেক সময়ের মধ্যে নুরুকে চোখ বেঁধে হাতকড়া পরিয়ে ওই গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। জানা গেছে, এ সময় নুরুর বাসায় তার স্ত্রী, বড়বোন ও ভাগ্নে ছিলেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কাজী আব্দুল্লাহ আল হাসান অভিযোগ করে বলেছেন,’ রাউজান থানার নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাবেদের নেতেৃত্বে নুরুকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। রাউজানে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক গোষ্টি পরিকল্পিতভাবে নুরুকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ এ দুই বিএনপি নেতারা।
রাউজান উপজেলা বিএনপির একজন দায়িত্বশীল নেতা একটি গোপন সুত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ করে বলেন,’নুরুকে হাইসে করে রাত দুইটার দিকে নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরে তাকে সেখান থেকে সাদা পোশাকধারী লোকজন নিয়ে যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাউজান থানার ওসি কেফায়েত উল্লাহ প্রথমে বলেন,’ নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জাবেদ বুধবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে পৌনে ২ পর্যন্ত রাউজানে মুনিরিয়া কাগতিয়া একটি জঙ্গি বিরোধী অভিযানে আমার সাথে ছিলেন। পরক্ষনে তিনি বলেন,’ পৌনে ১১টা না, দুইটা পর্যন্ত তিনি আমাদের সাথে অভিযানে ছিলেন। ছাত্রদল নেতা নুরুর বাসায় রাউজান থানা পুলিশের কোন সদস্য যায়নি বলে তিনি দাবী করেন। ওসি জানান,’নুরুল আলম নুরু বিএনপি ক্যাডার। তার বিরুদ্ধে রাউজান থানায় দুইটি হত্যা, একটি বিস্ফোরকসহ চারটি মামলা আছে।
বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অভিযোগ,’ নুরুর বিরুদ্ধে মামলা থাকতে পারে। তাকে গ্রেফতার করতে পারত। প্রয়োজনে বিচারের মুখোমুখি করা যেত। কিন্তু একজন স্বাধীন দেশের নাগরিককে পুলিশ রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে মেরে ফেলবে, এটা কেমন দেশ। এর নিন্দা করার ভাষা আমার জানা নেই। ওসি বলেন,’ কারা তাকে তুলে নিয়েছে , আমরা এখনও নিশ্চিত নই। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোন অভিযোগ করা হয়নি। অবশ্য নিহত ছাত্রদল নেতা নুরুর ভাগ্নে রাশেদুল ইসলাম জানান,’রাত ১২টার দিকে ৬ থেকে ৭ জন সাদা পোশাকে এবং দুই-তিনজন জেলা পুলিশের পোশাক পরা লোক এসে নুরুকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়।
যারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা কোন কথা বলেনি বলে তিনি জনানা। রাশেদুলের দাবী, সাদা পোশাকে থাকা উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদবীর একজন কর্মকর্তাকে তারা চিনতে পেরেছেন। এদিকে ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নুরুর হত্যাকান্ডের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান। তিনি বলেন,’ সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের যেভাবে গুম হত্যা করা হচ্ছে ঠিক একইভাবে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ন আহবায়ক নুুরুকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি এ হত্যাকান্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবী করেন। নগর বিএনপি সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন,’নুরুল আলম নুরু একজন ছাত্রনেতা। ছাত্রদলের তৃনমুল থেকে নেতৃত্ব দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তার মত একজন ছাত্রনেতাকে ঘর থেকে পুলিশের পোশাক পরা লোকেরা তুলে নিয়ে বিচার বহির্ভুতভাবে হত্যা করে নদীর পাড়ে ফেলে রাখার মধ্য দিয়ে সরকার জঙ্গিবাদকে উস্কে দিচ্ছে। আমরা অতীতে যে কথা বলে এসেছি, এই সরকারের আমলে ঘরে বাইরে কেউ নিরাপদ নয়, সেটি আজকে আবারও প্রমান হয়েছে। ঘটনার পর চট্টগ্রামে নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। অপরদিকে, ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম নুরুকে হত্যার অভিযোগে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নির্দেশে ২ এপ্রিল রোববার অর্ধ দিবস হরতাল পালিত হয় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম নগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল এ হরতাল আহবান করেন। সাতদিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসুচী ঘোষনা করেছে চট্টগ্রামের ছাত্রদল। জানা গেছে, রাজনীতিতে অনেকটা ঝিমিয়ে থাকা বিএনপি ছাত্রদল নেতা নুরুর হত্যাকান্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ চাঙ্গ হয়ে উঠেছে। চাঞ্চল্যতা ফিরে এসেছে তৃনমুলের ছাত্রদল ও যুবদলের মাঝে। এ ঘটনায় সব মহলেই বইছে নিন্দার ঝড়।
এদিকে আচমকাই চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অপ্রতিরোধ্য গতিতে খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। নগরে ডিবি পরিচয়ে একই পরিবারের তিনজনকে তুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে তাদের পরিবার। ২৪ মার্চ খুলশি থানার আলফালাহ গলির বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পরিবহন ব্যবসায়ী এস এম শফিকুর রহমান, তার দুই শ্যালক মো: হাসান তারেক ও মোয়াজ্জেম হোসেন সাথীকে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তারেকের মা বলেন,’ঘরে ঢ়ুকে প্রথমে তিনজনের আটটি মোবাইল কেড়ে নেয় তারা। এরপর সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে শফিকুর রহমানের উপর চাপ প্রয়োগ করেন তারা। স্বাক্ষর দিতে না চাইলে আমার মেয়ের জামাই শফিকুর এবং ছেলে মোয়াজ্জেমকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেয় তারা। এ সময় তাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে মোটরসাইকেল নিয়ে মাইক্রোবাসের পেছনে পেছনে অনুসরন পাঁচলাইশ থানার সামনে যায় আমার ছেলে তারেক। সেখান থেকে মোটরসাইকেল সহ তাকেও তুলে নিয়ে যায় তারা।
শফিকুলের স্ত্রীর টুম্পা জানায়,’সেদিন বাসায় একটি অনুষ্টান চলছিল। বেলা ১১টার দিকে আকস্মিকভাবে ছয়জন লোক বাসায় ঢুকে। এ সময় তারা বলে,’ আমরা ঢাকা থেকে এসেছি। শফিকুরকে একটু আমাদের সাথে যেতে হবে। একজন লোককে চিনিয়ে দিয়ে ফিরে আসবে। এরপর মা তাদের বলেন,’ ওকে কেন আপনারা নিয়ে যাচ্ছেন। তারা মাকে বলল,’উনারা একসাথে চলেন’। টুম্পা জানায়, স্বামী শফিকুরের সঙ্গে তার ভাই মোজাম্মেলকেও মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় তারা। নম্বর প্লেট বিহীন মাইক্রোবাসটির রং ছিল সাদা, গ্লাসও ছিল সাদা। ওইদিন রাতে মোবাইল থেকে শফিকুর টুম্পাকে ফোন করে কান্নাকাটি করেন।
এ সময় শফিকুর তার স্ত্রীকে বলেন,’ আমাদের যারা তুলে এনেছে তারা নাকি সরকারের বিশেষ টিমের লোক। আমার এখানে খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এখান থেকে আমাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা কর।’আমার স্বামী ও ভাইদের কোন অপরাধ থাকলে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হোক। ছয়দিন ধরে তাদের থানায় সোপর্দ না করে যেভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে এটা কোন আইনে পড়ে’ প্রশ্ন রাখে টুম্পা।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তারেকের সন্তান সম্ভবা স্ত্রী ফৌজিয়া আইনুন নাহার রুমি। স্বামীসহ তিনজনকে ফিরিয়ে দেয়ার আকুতি জানান তিনি। শফিকুর নগরের সল্টগোলা ঈশান মিস্ত্রিহাট এলাকার এস এস ট্রান্সপোর্টের মালিক। তারেকের বায়েজিদ এলাকায় টিআর মোবাইল টেকনোলজি নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্টান আছে। আরেক ভাই মোয়াজ্জেম মধ্যপ্রাচ্য থেকে কিছুদিন আগে বেড়াতে এসেছেন। এদিকে এসব ঘটনায় নগরবাসীর মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরে বাইরে সর্বত্র নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মহলের মতে,’ সরকারকে বেকয়াদায় ফেলার জন্য কোন মহল এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
