জুবায়ের সিদ্দিকী/ গোলাম সরওয়ার : দেশে গত চার বছরে ৩০ হাজারের রেশি জামায়াত শিবির, বিএনপির তৃনমুল নেতাকর্মী আনুষ্টানিকভাবে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগে যোগদান করেছেন। অতীত অপকর্ম থেকে রেহাই পাওয়া, দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, আগামী নির্বাচনে জনগন থেকে দলকে বিচ্ছিন্ন করতে টার্গেট নিয়ে তারা ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়েছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে স্থানীয় এমপিরা নিজেদের আলাদা বলয় সৃষ্টি করতে বিএনপি জামায়াত থেকে অনুপ্রবেশকারীদের দলে গুরুত্বপুর্ন পদও দিয়েছেন। মাঠ এখন হাইব্রীডদের দখলে। এতে দলের ত্যাগী নেতারা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
এ কারনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের এত উন্নয়নের পরও তৃনমুলে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৃনমুল আওয়ামী লীগের সম্মেলনে গুরুত্বপুর্ন পদ পেয়েছেন জামায়াত বিএনপির নেতাকর্মীরা। উপজেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে পদ বেচাঁ কেনার ঘটনা অনেকটা ওপেন সিক্রেট। অর্থের বিনিময়ে এসব পদে এসেছে বিএনপি, জামায়াতের নেতাকর্মীরা। শিক্ষা প্রতিষ্টান, পুলিশে নিয়োগ সহ স্থানীয় গুরুত্বপুর্ন সরকারী চাকরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপিদের ছত্রছায়ায় অনুপ্রবেশকারীরাই মুল কলকাঠি নাড়ছেন। তারা নেমপ্লেট ব্যবহার করে নানা বানিজ্যে লিপ্ত।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা চট্টগ্রামে মনিটরিং করে উল্লেখিত চিত্র পেয়েছে। অবিলম্বে এসব হাইব্রীড় ও পরগাছা নেতাদের দল থেকে বের করে না দেওয়া হলে মারাত্বক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গোয়েন্দা রিপোর্ট আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে অবহিত করেছে যে, হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জমি দখল, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, দখলবাজি, নিয়োগ বদলী বানিজ্য, টিআর খাবিকা প্রকল্পে লুটপাটসহ নানা কর্মকান্ডে মুল ভুমিকা পালন করছে এসব অনুপ্রবেশকারী। জামায়াত বিএনপির নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে প্রবেশের ক্ষেত্রে দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা অধিকাংশ জেলার তৃনমুলে মানা হয়নি।
বিষয়টিকে ভালভাবে নেননি দলের সভানেত্রী। বেশ কয়েকবার শেখ হাসিনা দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগে যথেষ্ট নেতাকর্মী ও সমর্থক রয়েছেন। নতুন করে দলে লোক নেওয়ার দরকার নেই। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের এমন নির্দেশনার পর নতুন কৌশল অবলম্বন করে জামায়াত। চিহ্নিত নেতাদের না ঢুকিয়ে যারা জামায়াত কর্মী ও সমর্থকদের আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করিয়ে দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে. জামায়াত বিএনপির নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য তৃনমুল আওয়ামী লীগের উগ্যোগে যেসব অনুষ্টানের আয়োজন করা হয়েছিল তাতে প্রধান অতিথি হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দলকে শক্তিশালী করতে ২০১১ সালে সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করে আওয়ামী লীগ। সারাদেশে দুই টাকা মুল্যের সদস্য ফরম পাঠানো হয়। কিন্তু পরে তা আর বেশি দুর এগোয়নি। আওয়ামীলীগের তৃনমুলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, অভিযান শুরুর পর তা বাস্তবায়নে আর আগ্রহ দেখায়নি দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। এই পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীনতা বিরোধী ও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দল জামায়াত ও বিএনপি নেতাকর্মীদের দলে ভিড়ানো হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এতে মদদ দেন। চট্টগ্রামে বিএনপি জামায়াত হতে ডিগবাজি দেওয়া নব্য আওয়ামী লীগের লোকরাই চাকরী পাচ্ছে বেশি। জামায়াতের টাকায় তারা চাকরি পাচ্ছে।
শিক্ষা প্রতিষ্টানগুলোতেও আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের একক আধিপত্য বিরাজ করছে। স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে নির্বাচনে অযোগ্য জামায়াত নেতাদের এভাবে আওয়ামী লীগে বরণ করে নেওয়ার ঘটনায় চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। অনেকটা প্রকাশ্যে জামায়াতের সন্ত্রাসীরা আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছে। দাগী খুনী সন্ত্রাসীরাই আওয়ামী লীগে এখন কতৃত্ব করছে। এটা দলের জন্য দু:খজনক ও আত্বঘাতি। সরিকদলের নেতারা প্রতিবেদককে বলেন, আওয়ামী লীগের বিপদ আওয়ামী লীগ নেতারাই ডেকে আনছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও নগরীর বন্দর-ডবলমুরিং আসনে অনেক জামায়াত-বিএনপি নেতা এখন আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে গেছেন। বৃহত্তর চট্টগ্রামে অনেক উপজেলায় আওয়ামী লীগের কমিটিতে রয়েছেন জামায়াতের অথবা শিবিরের নেতাকর্মীরা। এরা এখন নব্য আওয়ামী লীগার।
এদের কর্মকান্ডে বার বার বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে আওয়ামী লীগের তৃনমুলের নেতাকর্মীদের। কোন সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন না এমন অনেক নেতাকর্মীরা এখন আওয়ামী লীগের ত্যাগী কান্ডারী প্রতিষ্টিত হচ্ছে। এ ছাড়া হাইব্রীড নেতাকর্মী ছাড়াও কোন কোন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এর শীর্ষ নেতাকর্মী আঙ্গুল ফুলে হয়েছেন কলাগাছ। এবার দাপট ও এভাবে অতীষ্ট হয়ে উঠেছেন মাঠ পর্যায়ের নেতারা। বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতকারী সাংসদ এম. এ লতিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলেও কোন বিচার হয়নি। জাময়াত থেকে ডিগবাজি দিয়ে আনা এক এমপি দক্ষিণ চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের বিভাজন সৃষ্টি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করছেন।
সাধারন মানুষ এসব এমপিদের সহজে নাগাল পায় না। নাগাল যদি পাওয়া যায় তবে নিজের এলাকার অনেককে আবার চেনেনও না। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্লাটফরমে রাজনীতিকদের অনেকের গায়ে এত মেদ হয়েছে যে, সালামের জবাব দেওয়ার কোন ফুসরত যেন তাদের নেই। ক্ষমতায় দল যাওয়ার আগে ব্যবহার, আচার আচরন যখন ছিল মাধুর্য্যভেরা সেই মানুষগুলো এখন অনেক বদলে গেছেন। টেম্পু ও রিকশাযাত্রী এসব নেতারা এখন নামী দামী একের অধিক গাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যবসা জাঁকিয়ে বসেছেন। রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিনত করে কুক্ষিগত করেছে এরা সম্পদের পাহাড়। দলের দু:সময়ে এরা যেভাবে ছিলেন নিরাপদ, এখনও তারা নিরাপদ। দলকে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে কখনো জনপ্রতিনিধি হয়ে, কখনো নেতা হয়ে এরা সমাজে দাপিয়ে বেড়ায় সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ সেজে মাঠে ও মঞ্চে। দলকে বারোটা বাজিয়ে নিজেদের উদুরপুর্তি করা এসব নেতারাই এখন চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা। বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙ্গিয়ে, দলের নাম ভাঙ্গিয়ে তথাকথিত রাজনৈতিক নেতারা রাজনীতি ব্যবসায় শুধু সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।
