জুবায়ের সিদ্দিকী-
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প গ্রহন, চসিক, চউক ও বন্দরের সমন্বিত পরিকল্পনায় জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২৩ মে নগর ভবনে চসিকের সাথে সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও সরকারী প্রতিষ্টানের অনুষ্টিত সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে কথা হয়। এ ছাড়া যানজট, রাস্তা খোঁড়াখুড়ি, পৌরকর, হকার সহ বেশকিছু সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এবং সমাধানের পরামর্শ আসে। সভায় নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক মেয়রকে গতি বাড়ানোর কথাও বলেন।
এদিকে নগরীর মহেশখালের মুখে স্ল্যুইস গেইট নির্মানে চট্টগ্রাম বন্দরকে সম্মতি দিলেন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন। সভায় উপস্থিত বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এ্যডমিরাল খালেদ ইকবাল মেয়রকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মহেশখালের মুখে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করেছিলাম। এতে ওই এলাকায় কিছু সমস্যা দেখা দেয়। এখন পাম্পহাউজ সহ স্ল্যুইস গেইট নির্মানে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। চুয়েট থেকে ডিজাউনও নিয়েছি। এদিকে আবার কর্পোরেশনও নগরীর খালগুলোর মুখে স্ল্যুইস গেইট নির্মানের প্রকল্প নিচ্ছে।
তাই আমরা মেয়রের কাছ থেকে সম্মতি চাচ্ছি, অনুমতি দিলে আমরাই স্ল্যুইস গেইট নির্মান করব। এ সময় মেয়র বলেন, ঠিক আছে, আমাদের আপত্তি নাই। আমি সম্মতি দিলাম। তখন বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, মেয়রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে মহেশখালে স্ল্যুইস গেইট নির্মিত হবে। এ গেট নির্মানে প্রায় ৩০ কোটি টাকা খরচ হতে পারে। নগর উন্নয়নের স্বার্থে আয়োজিত সমন্বয় সভাগুলোতে কোন সংস্থার প্রধান অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করবেন বলে জানিয়েছেন আ.জ.ম নাছির উদ্দিন।
তিনি বলেন, নাগরিক চাহিদা ও সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে সরকার পরিপত্রের মাধ্যমে মেয়রকে সমন্বয়ের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। সরকারের সদিচ্ছা ও উন্নয়ন কার্যক্রম গতিশীল ও ত্বরান্বিত করার জন্য একে অপরের সহযোগিতা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্যে সকলকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে। সরকারী সংস্থা বা সেবা প্রতিষ্টানের প্রধানগন চট্টগ্রামে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও না এলে তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে রিপোর্ট করব। মেয়র আরও বলেন, কর্পোরেশন এ্যাক্ট অনুযায়ী আমাদের নির্দিষ্ট কাজ করার এখতিয়ার আছে। কিন্তু নগরবাসীর মধ্যে একটা ধারনা আছে সকগুলো কাজই কর্পোরেশনকে করতে হবে।
এ সংস্থার নিকট নাগরিক প্রত্যাশা বহুবিধ। মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি মানুষের নানাবিধ চাহিদা পুরন করার জন্য জনগন মেয়রের নিকট আসেন। নির্দিষ্ট সেবার বাইরে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সহ সকল বিষয়ে মেয়রকে জবাবদিহি করতে হয়। সভায় মেয়র বিভিন্ন সংস্থার কাছে চসিকের পাওনা পৌরকর প্রসঙ্গে বলেন,’এখানে অপরাজনীতি আছে। তাই সরকারী প্রতিষ্টান সহযোগিতা না করলে অন্যরা সুযোগ পাবে। মেয়র চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ শাহিনুল ইসলামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যেভাবে ভবন নির্মামের অনুমোদন নেয় হয় সেভাবে করে না। আপনারাও নকশা অনুমোদনের পর তদারকি করেন না। নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করার পর তা পেতেও দেরি হয় বলে জানান মেয়র। তিনি বলেন, ভবন নির্মানে নকশা মানা হচ্ছে কি না তা মনিটরিংয়ে চসিকের প্রতিনিধি প্রয়োজন। এ সময় শাহিনুল ইসলাম বলেন,’ মনিটরিং এর সুযোগ আছে। এটা আন্ত: মন্ত্রনালয়ে আলাপের মাধ্যমে সম্ভব। তবে আপাতত নকশা অনুমোদনের কপি আমরা স্থানীয় কাউন্সিলরকে দিতে পারি। এ সময় মেয়র বলেন, ফ্লাইওভার অনেক আগে নির্মান শেষ করেছেন।
কিন্তু এখনো হস্তান্তর করেননি। এ সময় চসিকের সচিব আবুল হোসেন বলেন, চিঠি দিয়েছিলাম। ৬ মাস হলেও জবাব দেয়নি। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো: জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন,’ আমরা জনগনের সেবক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ও বিশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন সর্বাত্তক সহযোগিতা দিতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন,’ মেয়র আপনার বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ বা অনুযোগ আছে। এই গতি হবে না। আরো গতি বাড়ান। আমরা অবশ্যই সহযোগিতা করব। গতি, মেন্টালিটি ও কাজের ধরন সবকিছুই চেঞ্জ করতে হবে। চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, সমন্বয় ছাড়া কিছুই হবে না।
প্রতিটি সংস্থাকে একজন করে প্রতিনিধি করতে হবে। যিনি চসিকের সাথে সমন্বয় করবেন। তিনি বলেন, শহরের ৮০ ভাগ সমস্যা অন্যান্য সংস্থার দ্বারা সৃষ্ট। মাত্র ২০ শতাংশ চসিকের দ্বারা। তিনিও সিডিএ প্রতিনিধিকে বলেন, ৪৫ কার্যদিবস বলা হলেও ৯০ দিনেও নকশার অনুমোদন পাওয়া যায় না। এটাই বাস্তবতা। বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এ্যাডমিরাল খালেদ ইকবাল বলেন, দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর হিসেবে আমরা কন্টেইনার ও কর্গোতে ১৬-২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি মোকারেলা করছি। ইমার্জেন্সি মেজার হিসাবে ২০১৯ সালের মধ্যে আমাদের পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) চালু করতে হবে। এ লক্ষ্যে দু’এক মাসের মধ্যে কাজ শুরু করতে হবে। ড্রাইডক ও বোট ক্লাবের মাঝখানে পিসিটি হবে। সেখানে ৬ লেনের সড়ক হবে।
বিমানবন্দরমুখী যানবাহনের জন্য একটি ফ্লাইওভার থাকবে। সড়কের উপর চাপ কমানোর জন্য আমরা রেললাইনের সর্বোত্তম ব্যবহার দেখতে চাই। তিনি বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে ডিমান্ডের আগেই ফ্যাসিলিটি তৈরী করতে হবে। প্রকল্প নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদের জন্য, সুদুর প্রসারী। সত্যিকারের পোর্টসিটি হিসেবে চট্টগ্রামকে গড়ে তোলার জন্য সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলীদের সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। তিনি বলেন,বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয় বেসরকারী কন্টেইনার ডিপোগুলো ২০ কিলোমিটার দুরে সরিয়ে নিতে। এটি হলে যানজট অনেকটা সহনীয় হবে। কর্নফুলী দুষনের শিকার হচ্ছে উল্লেখ করে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, দুই শতাধিক শিল্প কারখানার বর্জ্য, খাল বেয়ে নামা সুয়ারেজ ও গৃহস্থালী বজ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোড়ের নিজের বক্স ড্রেনের বজ্য বন্দরের ১নম্বর জেটির কাছে পড়ছে।
শহরের সবচেয়ে বেশি জায়গা রেলওয়ের অধীনে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্দরে আসা প্রাইম মুভার, ট্যাংক লরির জন্য রেলয়ে জায়গা বরাদ্দ দিলে আমরা নির্জস্ব অর্থায়নে একটি টার্মিনাল করে দেব। এটি হলে গাড়িগুলো রাস্তার দুই পাশে দাড়িয়ে থেকে যানজট সৃষ্টি করবে না। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার দেবদাশ ভট্টাচাযকে যানজট কমাতে কার্যকরী ভুমিকা রাখার নির্দেশ দিয়ে মেয়র বলেন, যানজটের জন্য অনেক কারন আছে। ইচ্ছেমত গাড়িগুলো পার্কিং করে, গলির মুখ ব্লক করে যাত্রী উঠানামা করান। অনেক জায়গায় হকাররা রাস্তায় বসে ব্যবসা করেন। তিনি বলেন, ৬ জুলাই থেকে আমি হকার উচ্ছেদ কবর। রমজানে একটু সুযোগ দিচ্ছি। এ সময় দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, হক্সিরহাটে হকাররা রাস্তা দখল করে থাকে।
ওয়াসার খোঁড়াকুড়ির জন্য যানজন হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। তিনি বলেন, মাঝিরঘাট-কদমতলীসহ কিছু জায়গায় সড়ক বেদখল করে ফেলা হয়েছে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে হবে। চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপেক্ষর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন,’পানির পাইপ লিক হয়ে রাস্তায় ক্ষয় ক্ষতির বিষয়টি সুনজরে আছে। যেখানে লিকেজ সেখানেই মেরামত কার্যক্রম করার নির্দেশ দেওয়া আছে। কর্নফুলী গ্যাস ডিষ্ট্রিভিউশন লি এর মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আনিস উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিটি কর্পোরেশনের সাথে সমন্বয় করে গ্যাস লাইন স্থাপন করা হবে।
নালা ও খাল থেকে পাইপ লাইন অপসারন ও পুন:স্থাপনের কাজ চলমান আছে। রেলওয়ে পুর্বাঞ্চলের অতি: মহাব্যবস্থাপক চৌধুরী মো: ইসা ই খলিল বলেন, পুরাতন রেলষ্টেশনের পানি বর্ষা মৌষুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। এ জটিলতা নিরনে কালভাট করার জন্য তিনি চসিককে অনুরোধ জানান। বাসাবাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট বরাদ্দ চেয়ে পত্র পেরনের কথা মেয়রকে অবহিত করেন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতি: প্রধান প্রকৌশলী মো: আফতাব হোসেন খান বলেন, ৩য় কর্ণফুলী সেতু নির্মান প্রকল্প চলমান আছে।
বহদ্দারহাট থেকে কর্নফুলী সেতুর উত্তর প্রান্তে অ্যাপ্রোস চার লেইনে এবং অবশিষ্ট অংশ ৬ লেইনে উন্নীতকরন কাজ, কর্নফুলীর দক্ষিণ এ্যাপোস থেকে ত্রিমোহিনি পর্যন্ত চার লেইন উন্নীতকরন, উত্তর পাশে ৪টি ব্রিজ ও ২টি আন্ডারপাস, উত্তর ও দক্ষিন পাশ মিলে ৮টি কারভাট ও সড়কের ড্রেন নির্মান কাজ চলছে। পাউবির প্রধান প্রকৌশলী একেএম শামসুল করিম বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রন, জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিস্কাশন উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প সংশোধন করে পরিকল্পনা পরিষদের মতামতের লক্ষ্যে ডিপিপি পুন:গঠন করা হয়েছে।
