ফসলি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায় : বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ
জাহেদুল হক,আনোয়ারা : দেশে বিভিন্ন আইন ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কিছুতেই কমছে না ইটভাটার দৌরাত্ম্য। মালিকরা মানছেন না কোনো নিয়মকানুন; ক্রমেই বন উজাড়,কৃষির ক্ষতি ও দেশের ভূ-প্রকৃতি ধ্বংস করে মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। আর ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ,বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি,কমছে চাষাবাদ জমি। আনোয়ারা উপজেলার দুটি ইটভাটায় পরিবেশ আইন অমান্য করে তিন ফসলি জমির মাটি কেটে ভাটায় ইট তৈরি করা হচ্ছে। অভাবি কৃষকরা এ মাটি বিক্রি করছেন। এতে মাটির উর্বরা শক্তি কমে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জমির মাটি আনা নেয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রাকের দানবীয় চাকায় পিষ্ট হচ্ছে উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাঘাট। সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করে ইটভাটা মালিকগণ তাদের এহেন কর্মকান্ড দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসলেও দেখার যেন কেউই নেই। এতে করে একদিকে যেমন ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশ, অন্যদিকে সংস্কার না হওয়া রাস্তাঘাটগুলো বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থারও চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইটভাটাগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে উপজেলার বটতলী গ্রামের পরীর বিলে তিন ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে দুটি ইটভাটা। নগরীর হালিশহর এলাকার মো.সিরাজুল ইসলামের মালিকানাধীন কর্ণফুলী ব্রিকস ওয়ার্ক্স নামের ভাটাটি গড়ে উঠে প্রায় ১০ বছর আগে। একই স্থানে গত দু‘বছর আগে মেসার্স মোহছেন আউলিয়া ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারিং নামের ভাটাটি স্থাপন করা হয়। সাতকানিয়া উপজেলার মো.আবু তাহের ও স্থানীয় সামশুল আলম এই ভাটার যৌথ মালিক। তবে কোনটিরই পরিবেশ অধিদফতরের অনুমোদন নেই। সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে ইট। আশপাশের জমি থেকে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে উর্বর মাটি। একই সঙ্গে ভাটা দুটির জ্বালানি হিসেবে কয়লার পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে কাঠ। এতে করে বনজসম্পদও উজাড় হচ্ছে।
জানা যায়,উপজেলার বরৈয়া,সরেঙ্গা,বরুমচড়া,আইরমঙ্গল,বটতলী,তুলাতলী,গুন্দ্বীপ ও বারশত গ্রামের আবাদি জমির উপরিভাগ এক থেকে দুই ফুট গর্ত করে কাটা হচ্ছে। কোথাও কোথাও কোমর সমান গর্ত করে মাটি তুলে নেয়া হচ্ছে ইটভাটায়। খননযন্ত্র দিয়ে গভীরভাবে মাটি খননের ফলে এসব জমি পুকুরে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে আবাদি জমির পরিমাণ দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। আর এসব কাজে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছেন স্থানীয় দুই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। জমির মালিকদের কাছ থেকে মাটি কেনা,প্রশাসন ম্যানেজ করাসহ ইটভাটায় মাটি পৌঁছানোর দায়িত্ব সিন্ডিকেটের। বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকার কমিশন।
এ ব্যাপারে উপজেলার বেশ কয়েকজন মাটি ব্যবসায়ী জানান,গত কয়েক বছর ধরে ইটভাটা ও নিচু জায়গা ভরাটে মাটির চাহিদা বেশি থাকায় তারা মাটি বিক্রির দিকে আগ্রহী হয়েছেন। কারণ জমির চেয়ে মাটির দাম বেশি। তাছাড়া কৃষকরা জমির মাটি না বেচলে জোর করে মাটি নিতে পারতাম না আমরা। বর্তমানে জমি বিক্রি না করে মাটি বিক্রি করলে তাদের অভাব দূর হয়ে জমির জায়গায় জমি থেকে দুই ধরনের লাভ হয়। তবে কর্ণফুলী ব্রিকস ওয়ার্ক্সের ব্যবস্থাপক সিরাজুল হক সাংবাদিকদের কোন তথ্য না দিয়ে বলেন,আমরা যথাযথ নিয়ম মেনে ইটভাটা স্থাপন ও মাটি কাটছি পারলে কিছু করেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মজা পুকুর,খাল-বিল,নদ-নদী,চরাঞ্চল,পতিত ও আবাদি জমি থেকে মাটি কাটা নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানছেন না কেউই। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের অধীনে নির্মিত উপজেলা,ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়ক ব্যবহার করে কোনো ভারী যানবাহন দিয়ে ইট বা ইটভাটার কাঁচামাল আনা নেয়া নিষিদ্ধ থাকলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষ আর্থিক সুবিধা পেয়ে তা বন্ধ করছেন না। ইটভাটায় কাঠের পরিবর্তে কয়লা ব্যবহারের কথা থাকলেও কোনো ভাটা মালিকই তা তোয়াক্কা করছেন না। ইটভাটার প্রভাব সম্পর্কে চমেক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা.লক্ষীপদ দাশ বলেন,ইটভাটার কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষ শ্বাসকষ্ট ও চোখের রোগে বেশি আক্রান্ত হন।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন,২০১৩তে উল্লেখ আছে,ইটভাটায় ফসলি জমির উপরের মাটি (টপ সয়েল) ব্যবহার করলে প্রথমবারের জন্য দুই বছরের কারাদন্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধের জন্য ভাটা কর্তৃপক্ষকে ২ থেকে ১০ বছরের জেল এবং ২ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। অনুমোদন না নিয়ে ইটভাটা স্থাপন করলে এক বছরের কারাদন্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। কিন্তু এখনো আইন বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। ফলে ইটভাটার আগ্রাসনও বন্ধ করা যাচ্ছে না।
আনোয়ারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো.একরাম উদ্দিন বলেন,একবার মাটি কাটা জমিতে আগের মতো উর্বরা শক্তি ফিরে আসতে কমপক্ষে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। আর এভাবে মাটি বিক্রি অব্যাহত থাকলে এক সময় ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কৃষকদের মাটি বিক্রি না করার বিষয়ে সচেতন করার পরও তারা কথা শুনছেন না। নগদ টাকার আশায় কৃষকরা জমির মাটি বিক্রি করছেন। এতে সাময়িক তাদের অভাব দূর হলেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গৌতম বাড়ৈ জানান,সরকারি আইন অনুযায়ী ইটভাটায় ফসলি জমির মাটি ব্যবহার করা যায় না। বেশ কয়েকবার ইটভাটা মালিকদের এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। তারপরও যদি কোথাও তা হয়ে থাকে সরেজমিনে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
