চন্দনাইশ বরকল উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বাণিজ্য ভবন,সচেতন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
নিজস্ব সংবাদদাতা, চন্দনাইশ : উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরকল এস জেড উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ সীমানায় শহীদ মুরিদুল আলম সড়কের পাশে বাণিজ্য ভবন নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। আজ ৮ জানুয়ারি সকালে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকের যৌথ উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষনা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বরকল এস জেড উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এ বিদ্যালয়ে দেড় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১০ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও ১৫ জন ননএমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়মিতভাবে পাঠদান করে যাচ্ছে। বিদ্যালয় মাঠের দক্ষিণ পাশে শহীদ মুরিদুল আলম সড়কের পাশ ঘেঁষে একটি বাণিজ্য ভবন নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১৭ ডিসেম্বর স্থানীয় সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরী ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ২৮ ডিসেম্বর’১৬ স্থানীয় চেয়ারম্যান ও দক্ষিণ জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি হাবিবুর রহমান বেইজ ঢালাইয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মার্কেট নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করে। সে সাথে ইসলামাবাদীর নাতী গাজী ইসলামাবাদীকে আহ্বায়ক, মাঈনুদ্দীন জুয়েলকে সদস্য সচিব করে মাঠ রক্ষা কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির উদ্যোগে গত ৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে মানবন্ধন, সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করা হয়। এ সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনি, কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব, পরিবেশবিদ ইদ্রিস আলী, কবি অভিক ওসমান সহ বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের প্রাক্তন সচিব কবি অভিক ওসমান বলেছেন, যেহেতু এ মাঠে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, ঈদের নামাজের জন্য ঈদগাঁর জন্য ব্যবহৃত হয়, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নামাজে জানাযা হিসেবে মাঠটি ব্যবহৃত হয়। সর্বোপরি বরকল উচ্চ বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলার জন্য মাঠটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
এ ঐতিহ্য রক্ষা করতে মার্কেট করে মাঠ নষ্ট করা কোনভাবে সমীচীন হবে না বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ রক্ষার জন্য বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। তাই এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করে বিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীন পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখার দাবী জানান। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মুরিদুল আলমের ছেলে দক্ষিণ জেলা আ’লীগের নির্বাহী সদস্য মাহবুর রহমান শিবলী বলেছেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ বিষয়ে ভুষিত হয়েছেন। মাঠের সংরক্ষণের জন্য কোনভাবেই মার্কেট করা সমীচীন হবে না।
এলাকার লোকজনকে নিয়ে আয়বর্ধক বিষয়টিকে বিবেচনার মাধ্যমে আলোচনা সাপেক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ রক্ষা করার লক্ষ্যে মার্কেট নির্মাণের ব্যাপারে অসম্মতি জানান। সাবেক উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান খালেদা আক্তার চৌধুরী বলেছেন, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর প্রতিষ্ঠানে ঐতিহ্য রক্ষা করতে বাণিজ্য ভবন নির্মাণ করা যথার্থ হবে না। তাছাড়া দোকানপাট হলে ছাত্রীদের আসার পথে দোকানে বসে থাকা বখাটেরা বিভিন্ন রকম কটুক্তি করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দক্ষিণ জেলা আ’লীগের সহ-সভাপতি ও স্থানীয় চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেছেন, বিদ্যালয়ের মাঠ যতটুকু আছে, তা যথার্থ রেখে আয়বর্ধকের জন্য বরকল এস জেড উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বেতনের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বর্তমানে ১৩ শতাধিক শিক্ষার্থী থাকায় ১৫ জন শিক্ষক স্কুল বেতনে নিতে হচ্ছে। এদের বেতন-ভাতা দিতে পরিচালনা পরিষদকে হিমশিম খেতে হয়। ফলে এ আয়বর্ধক প্রতিষ্ঠান করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন পরিচালনা পরিষদ।
প্রধান শিক্ষক জাফর আহমদ বলেছেন, বিদ্যালয়ের মাঠ যথাযথভাবে রেখে পরিবেশ রক্ষা করে আয়বর্ধক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ বাণিজ্য ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সে সাথে অতিরিক্ত ক্লাস করার কয়েকটি কক্ষ নির্মাণের উপর গুরুত্বারোপ করে ম্যানেজিং কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় রাখার জন্য তিনি অভিভাবক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয়দের প্রতি অনুরোধ জানান।
বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ সভাপতি শাহাদাত হোসেন চৌধুরী জসিম বলেছেন, বিদ্যালয়ের ব্যয় নির্বাহ করতে আয়বর্ধক দোকান নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের লক্ষ্যে পরিচালনা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষানুরাগী, পরিচালনা পরিষদ সহ সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
উল্লেখ্য যে, গত ২ জানুয়ারি মাঠ রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসকের বরাবরে আবেদন করার প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লুৎফুর রহমান বিষয়টি শুনানী না হওয়া কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। যা ৮ জানুয়ারি শুনানীর কথা রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়।
