এম আনোয়ার হোসেন, মিরসরাই : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই অংশে বর্তমান সময়ের আতঙ্কের নাম সেইফ লাইন সার্ভিস। মিরসরাইয়ে প্রতিনিয়ত সেইফ লাইন সার্ভিসের হিউম্যান হলার গাড়িগুলোতে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা, অকালেই ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। সেইফ লাইন সার্ভিসের গাড়ীগুলো যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। দুর্ঘটনারোধে সিএনজি অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল কমে আসবে।
প্রকৃতপক্ষে কমার চেয়ে মৃত্যুর এ মিছিল আরো দীর্ঘতর হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিনিয়ত যে দুর্ঘটনা ঘটছে তার সিংহভাগই সেইফ লাইন সার্ভিসের হিউম্যান হলার গাড়ীগুলোতে। সরকার মহাসড়কে সিএনজিঅটোরিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ করলে এই সার্ভিসটি চালু হয় ২০১৫ সালের ২৭ আগষ্ট থেকে বারইয়ারহাট থেকে বড় দারোগারহাট পর্যন্ত।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সেইফলাইন দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ট্রফিক আইন অমান্য করে গাড়ি চালানো। এছাড়া ঘুমচোখে গাড়ি চালানো, চালকদের নিজেদের মধ্যে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সংযোগ সড়ক থেকে দ্রুতগতিতে মহাসড়কে উঠা, হেলপারবিহীন গাড়ী, যত্রতত্র স্টপেজ, মহাসড়কের পাশে ছোট গাড়ীর জন্য আলাদা লেইন না থাকা, চালকরা গাড়ী চালানোর পাশাপাশি যাত্রী উঠানামা, ভাড়া সংগ্রহ, অদক্ষ চালক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহকারী হাতে গাড়ি থাকা) কর্তৃক গাড়ি চালানোর ফলে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে।
জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৭ আগষ্ট সেইফ লাইন সার্ভিসটি চালু হওয়ারপর থেকে মহাসড়কের মিরসরাই অংশে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটে। তম্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর দুপুর ১২ টার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিনকি আস্তানা মঈন উদ্দিন পেট্টোল পাম্পের সামনে সেইফলাইনকে চাপা দিলে সেইফলাইনের সহকারি আব্দুল আলীম প্রকাশ আব্দুল ড্রাইভার ঘটনাস্থলে মারা যায় এবং সেইফলাইনের ৫ যাত্রী গুরুতর আহত হয়।
২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল রাত ১০ টার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পান্তার পুকুর এলাকায় সেইফ লাইন ও ট্রাকের সংঘর্ষে মিরসরাই সদর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি রবিউল হোসেন রবিসহ ৫ জন আহত হয়। ২০১৬ সালের ১৩ মে বিকেল সাড়ে ৩ টায় মিরসরাই পৌরসদরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি সেইফ লাইন মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ভেতর ঢুকে ৫ জন আহত হয়েছে। এসময় ৫টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আহত হয় ৩ জন।
২০১৭ সালের ১০ জুন দুপুর সাড়ে ১২ টার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের বড় কমলদহ এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় সেইফলাইনের ২ যাত্রী নিহত ও আহত হয়েছে ১০ যাত্রী। ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সুফিয়া রোড এলাকায় মালবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও যাত্রীবাহী সেইফলাইনের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত হয় ৪ জন, আহত হয় ১১ জন। নিহতদের ৪ জনই ছিল সেইফলাইনের যাত্রী। ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ের কমলদহ এলাকায়ও একটি সেইফলাইন নিয়ন্ত্রন হারিয়ে মহাসড়কের পাশের পুকুরে ডুবে যায় এতে গুরুতর আহত হয় ৫ জন যাত্রী।
২০১৭ সালের ৯ অক্টোবর দুপুর ২ টার সময় বড়তাকিয়া বাইপাসে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় সেইফলাইন মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছে ৫ যাত্রী। ২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর সকাল ৯ টার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই থানার উত্তরে অছি মিয়ার পোল এলাকায় একটি লেগুনায় যন্ত্রাংশের ক্রটির কারণে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। তবে এতে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দেখতে নিজামপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দিকে রওনা হন প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুর রসুল।
গন্তব্য থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার আগে তাকে বহনকারী সেইফ লাইন সার্ভিসের একটি হিউম্যান হলার গাড়ী দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হলেন তিনি। ২০১৮ সালের ৩ এপ্রিল দুপুর সাড়ে ১২ টার সময় বড়তাকিয়ায় মিরসরাই ফিলিং স্টেশনের উত্তর পাশে একটি সেইফলাইন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে এক মহিলা ব্যাংক কর্মকর্তাসহ ২ জন গুরুতর আহত হয়।
২০১৮ সালের ৫ এপ্রিল ইকোনোমিক জোন এলাকায় সেইফলাইনের ধাক্কায় ইছাখালী ইউনিয়নের কালামিয়া হাজীর পুরাতন বাড়ির ইউছুফের ছেলে সাফায়েত হোসেন গুরুতর আহত হয়। পরে স্থানীয়রা এসে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা সদরে অবস্থিত মাতৃকা হাসপাতালে ভর্তি করে। দুর্ঘটনার পরপরই গাড়ির চালক পালিয়ে যায় এবং এলাকার জনগণ গাড়িটি আটক করে। তবে হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যে দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশই ঘটেছে সেইফ লাইন সার্ভিসের গাড়ীগুলোতে।
সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে অহরহ সড়ক দুর্ঘটনার কারণে নিরাপদ সড়কের দাবীতে নিজামপুর বিশ^বিদ্যালয় কলেজের সামনে ৩ এপ্রিল মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করেন প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২০১৮ ব্যাচের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এরপর ৪ এপ্রিল প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে এবং স্বেচ্চাসেবী সংগঠন হিতকরী’র সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপজেলার বড়তাকিয়া বাজার মাজারের সামনে অপর একটি মানববন্ধন কর্মসূচী পালিত হয় নিরাপদ সড়কের দাবীতে।
অন্যদিকে নিরাপদ সড়কের দাবীতে ৭ এপ্রিল পাশর্^বর্তী উপজেলা সীতাকুন্ডেও ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন করেছে সীতাকুন্ডের সর্বস্তরের মানুষ। ইতিমধ্যে মিরসরাই ও সীতাকুন্ড উপজেলার মহাসড়ক অংশে অতিমাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় যাত্রীদের।
সামাজিক সংগঠন হিতকরী’র প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল ইসলাম রয়েল জানান, সেইফ লাইন সার্ভিসের গাড়ীগুলো অদক্ষ ড্রাইভার দ্বারা পরিচালিত হয়। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না।
আকবর হোসেন নামের সেইফলাইন যাত্রী বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে সেইফ লাইন সার্ভিসে উঠি। প্রথম দিকে এসব গাড়ীর হেলপার থাকলেও এখন একজন ড্রাইভার গাড়ী চালানো এবং ভাড়া নিয়ে থাকেন। এসব ড্রাইভারদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অনেকেই নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স। ফলে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত এসব গাড়ীতে যাতায়াত করতে হয়।
বারইয়ারহাট-চট্টগ্রামের সিটি গেইট রুটের সেইফলাইন মালিক সংগঠন চট্টগ্রাম জেলা হিউম্যান হলার মালিক সমিতির সভাপতি রফিক উদ্দিন বলেন, অদক্ষ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ী চালনো প্রতিরোধ করতে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার গাড়ীর মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জোরারগঞ্জ চৌধুরীহাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সোহেল সরকার জানান, ২০১৭ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলা অংশে মোট ২৭ টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ২৬ জন, আহত ২৩ জন এবং দুর্ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে ১৯ টি। ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬ টি। নিহত হয়েছে ৬ জন, আহত ১ জন এবং মামলা হয়েছে ৩ টি। ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় মামলা দায়ের করা হয়েছে ২১৫ টি।
তিনি আরো বলেন, শীঘ্রই মহাসড়কে সেইফলাইনের অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
