চসিক বাজেট ২৩২৭ কোটি টাকা : জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬৭ কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিনিধি,সিটিনিউজ : দুই হাজার ৩২৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন,যেখানে প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে (২০১৭-১৮ অর্থবছরের) পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩৪ কোটি ৩১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৭ কোটি টাকা ।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের জন্য ২ হাজার ৩২৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। রোববার নগর ভবনে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। একই সাথে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ৬৬২ কোটি ৬৬ লাখ ১৮ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেটও ঘোষণা করা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে নিজস্ব উৎস থেকে মোট প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৯৯৪ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা, গত অর্থবছরে এ খাতে আয় হয়েছে ৩৬৬ কোটি ৫১ লক্ষ টাকা। উন্নয়ন অনুদান হিসাবে প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ১২৯০ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরে এ খাতে চসিক পেয়েছে ২৬২ কোটি ২৪ লক্ষ ৬৮ হাজার টাকা।
মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের ঘোষিত তৃতীয় বাজেটে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন-ভাতা ও পারিশ্রমিক ব্যয় বাবদ। এখাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭৫ কোটি ৮৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর পর মেরামত-রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ১০০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে খাল ও ছরা খনন এবং নালা-নর্দমা পরিস্কারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বহদ্দার হাট থেকে বারইপাড়া কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খননে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা। চসিকের আওতাধীন বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাসমূহের উন্নয়ন এবং নালা প্রতিরোধ দেয়াল ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। তবে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প একনেকে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
সংশোধিত বাজেটে অর্জন প্রস্তাবনার এক তৃতীয়াংশেরও কম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২২২৫ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের বিপরীতে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। যা মোট অংকে দাঁড়ায় ৬৬২ কোটি ৬৬ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা। অথচ প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে (২০১৭-১৮ অর্থবছরের) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩৪ কোটি ৩১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা। যা গত অর্থবছরের অর্জিত মোট বাজেটের প্রায় সম পরিমানের।
প্রস্তাবিত বাজেটে জলাবদ্ধতা নিরসনসহ মোট পাঁচটি খাতে ৪৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় বরাদ্দ ৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।এছাড়া খনন কাজের জন্য এস্কেভেটর, ট্রাক ও যন্ত্রপাতি ভাড়া বাবদ ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
মেয়র বাজেট বক্তৃতায় নগর উন্নয়নে ভবিষ্যত ২১ টি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, নগর ভবন নির্মাণ, মহানগরীতে মেট্রোরেল স্থাপন, মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন সড়ক নির্মাণ, ফিরিঙ্গি বাজার থেকে বারিক বিল্ডিং মোড় পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ, মুরাদপুর, ঝাউতলা, অক্সিজেন ও আকবর শাহ রেলক্রসিং এর উপর ওভারপাস নির্মাণ, ঢাকামুখী ও হাটহাজারী মুখী বাস টার্মিনাল নির্মাণ, টোল রোডের পাশে কনটেইনার ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ, নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত নতুন ড্রেন সমূহ নির্মাণ, শীতল ঝরণা থেকে নোয়াখাল পর্যন্ত প্রস্তাবিত নতুন খাল খনন, চাক্তাই ও মহেশ খালের সম্প্রসারণসহ উভয় পাশে সড়ক নির্মাণ এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণ ইত্যাদি।
বাজেট বক্তব্যে মেয়র জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গৃহনির্মাণ খাতে ২ কোটি টাকা, বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটাতে বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য ৫ কোটি টাকা, অটিজম শিশুদের জন্য ২ কোটি টাকা, মাদক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দূষণনিরোধী ভস্মীভূতকরণ প্লান্টসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৫৫০ কোটি টাকা ও বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সেবক নিবাস নির্মাণ বাবদ ৭১৯ কোটি টাকা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৭১৮ কোটি টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণসহ জাইকার অধীনে ৩২৪ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথে।
এবারের বাজেট ব্যতিক্রমী ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট জানিয়ে মেয়র বলেন, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে নতুন নগর ভবন স্থাপন করা হবে। ২৫ তলা বিশিষ্ট এ নগর ভবনে সকল ধরনের নাগরিক সুবিধার সন্নিবেশ ঘটানো হবে। তাছাড়া আমরা যে সকল পরিকল্পনা নিয়েছি তা একে একে বাস্তবায়ন করা হবে।
জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, জলাবদ্ধতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অতিদ্রুত, কম সময়ে কিভাবে এ সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়া যায় সেটা চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এটা দ্রুত সময়ে সমাধানের বিষয় নয়। কিছু কিছু এলাকা ধরে হয়তো ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে পারবো, বা নিরসন করতে পারবো।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ১৯৮৮ সালের সরকার অনুমোদিত একটি জনবল কাঠামো রয়েছে। উক্ত জনবল কাঠামোতে বিভিন্ন পদের সংখ্যা ৩১৮০টি। ফলে ১৯৮৮ সালের জনবল কাঠামোতে অনুমোদিত জনবল দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বসবাসকারী ৬০ লক্ষ লোকের যথাযথ নাগরিকসেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না বিধায় বিভিন্ন সময়ে অস্থায়ীভিত্তিতে লোক নিয়োগ করে কর্পোরেশনের বিশাল কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে। নাগরিকদের সেবা জনগনের তাঁদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে ইতোমধ্যে সিটিজেন চার্টার প্রস্তুতপূর্বক কর্পোরেশনের ওয়েব- সাইটে প্রচার করা হয়।
মেয়র বলেন, পরিচ্ছন্নতা-কর্মীগণ ডোর টু ডোর গমন করে বিন-এর মাধ্যমে ময়লা আবর্জনা সংগ্রহ করে নির্দিষ্টস্থানে রাখার জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপ্রাপ্ত ২০০০ জন পরিচ্ছন্ন-কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেয়া হয় এবং ইতোমধ্যে ঘোষণা অনুযায়ী ১৬৮৩ জন পরিচছন্ন-কর্মী নিয়োজিত করা হয়েছে।
দুইবছরের মধ্যে পুরো নগরী এলইডি বাতি দ্বারা আলোকায়ন করা হবে জানিয়ে মেয়র বলেন, সম্মানিত নাগরিকগণের দোরগোড়ায় বিদ্যুৎ-সেবা পৌঁছানোর জন্য ১৩৭৭টি সুইচিং পয়েন্টের মাধ্যমে ৫১ হাজার এনার্জি, টিউব-লাইট, হাই-প্রেসার সোডিয়াম, এলইডি ও অন্যান্য বাতিদ্বারা সড়ক আলোকায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নগরীর সৌন্দর্যবৃদ্ধি, সড়কে পর্যাপ্ত আলোকায়ন এবং নগরবাসীর রাত্রিকালীন নিরাপত্তা ও চলাচলের সুবিধার্থে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কাজির দেউড়ি হতে ইস্পাহানি মোড় হয়ে টাইগারপাস মোড় পর্যন্ত এবং ডি.টি. রোড (আংশিক) পাইলট প্রকল্প হিসাবে ৫৬.০০ লক্ষ টাকায় ১১৬টি এলইডি বাতি স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া সৌর শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সোলার ও নন সোলার লাইট স্থঅপনের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
চসিকের বাজেট অধিবেশনে অর্থ ও সংস্থাপন স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর শফিউল আলম, চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা, সচিব মো. আবুল হোসেন, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান সহ চসিকের কাউন্সিলর ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
