আবদুল মজিদ,সিটিনিউজ :: পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র তিন দিন বাকি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা হওয়ায় এবারে কোরবানির পশুর সংকট হবে এমন ধারণা ছিল ক্রেতাদের মধ্যে।
তবে প্রতিবেশী দেশ ভারত আর মিয়ানমার থেকে গরু আসছে এমন খবরে কোরবানির পশু ক্রেতারা অপেক্ষা করছিলেন। দাম নিয়েও ছিল ক্রেতাদের বিস্তর অভিযোগ। তবে সময় ঘনিয়ে আসায় আর অপেক্ষা করছেননা ক্রেতারা।
চট্টগ্রাম নগরের প্রতিটি গরুর বাজারে জমতে শুরু করেছে বেচাকেনা।
বুধবার নগরীর নুরনগর হাউজিং মাঠে দেখা যায়, মানুষ সাধ ও সাধ্যমতো গরু কিনে বাড়ি ফিরছেন। অনেকেই ছেলেমেয়ে নিয়ে গরু কিনে হাসিমুখে যাচ্ছেন।
শুধু নূরনগর হাউজিং মাঠ নয় নগরীর সবকটি বাজারে বেচাকেনা জমে ওঠেছে। বিকেল থেকে সবকটি বাজারে ক্রেতাদের ভিড় পরিলক্ষিত হয়।
কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ভেটেরিনারি চিকিৎসক টিম, বিভিন্ন ব্যাংকের জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ ও আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত রয়েছেন।
আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে হাট–বাজার ইজারাদারের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করছেন।

কর্ণফুলী গরুর বাজার থেকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে গরু নিয়ে ফিরছিলেন আমেরিকা প্রবাসী আবদুল আজিজ। স্বজনেরা গরুটি নিয়ে হই–হুল্লোড় করে আনন্দ–উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেন।
দামের ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটিনিউজকে তিনি বলেন,পশু বিক্রেতারা কয়েকগুণ বেশি দাম হাঁকছেন। তবে সময় ঘনিয়ে আসায় টেনশনমুক্ত থাকার জন্য কোরবানি পশু কিনে ফেললেন বলে জানান তিনি।
নুরনগর হাউজিং মাঠ ছাড়াও দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ গরুর বাজার সাগরিকা বাজারে বেচাকেনা বেশি জমে উঠছে। গরু নিয়ে আনন্দ–উচ্ছ্বলতায় বাড়ি ফিরছেন শত শত লোক।
কেউ হেঁটে, দৌড়াদৌড়ি করে কেউবা পিক–আপ ভ্যানে করে গরু নিয়ে ফিরছেন। গরু কিনতে পেরে যেন সবার মুখে তৃপ্তির হাসি। উৎসুখ জনতা বা গরু কিনতে আসা লোকজনও দর–দাম আর দেখাদেখিতে রয়েছেন।
সাগরিকা বাজারের ইজারাদার সাইফুল হুদা জাহাঙ্গীর বলেন, বিকেলে থেকে বেচাকেনা জমে উঠেছে। প্রায় দুই হাজার গরু বিক্রি হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে মানুষ বাজারমুখী হয়েছেন।
আজ–কাল পুরোদমে জমে উঠবে। তিনি আরও বলেন, সাগরিকা বাজারে গতকাল সাত লাখ ও সাড়ে সাত লাখ টাকা দামে দুটি বড় আকারের গরু বিক্রি হয়েছে।
একই কথা বললেন, কর্ণফুলী বাজারের ইজারাদার মো. সোলায়মান। তিনি বলেন, দুইদিন ধরে ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। ঈদুল আজহার সময় ঘনিয়ে আসায় লোকজন এখন বাজারমুখী হয়েছেন।
কর্ণফুলী বাজারে কথা হয় কুষ্টিয়ার গরু ব্যবসায়ী আবদুর রহিমের সঙ্গে। তিনি ও তাঁর স্বজনেরা ৪৫টি গরু এনেছেন বাজারে। গতকাল পর্যন্ত ১৭টি গরু বিক্রি করেছেন।
বগুয়ার ঠা–া মিয়া ২২টি এনেছিলেন। ১৩টি গরু রয়েছে। যশোরের রহিম ও আকবর হোসেন বলেন, ২০ বছর ধরে চট্টগ্রামে গরুর ব্যবসা করে আসছেন। এবার ৪০টি গরু বিক্রি এনেছেন। আরও ২৮টি গরু রয়েছে।
সাগরিকা বাজারে সিরাজগঞ্জের মো. নিজাম উদ্দিন বেপারী বলেন, তিনি এবার ১০টি গরু এনেছেন। সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা দামের গরু রয়েছে। আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত তিনটি গরু বিক্রি করেছেন।
চাপাইনবাবনগঞ্জ থেকে চারদিন আগে সাগরিকা বাজারে ৬০টি গরু নিয়ে এসেছেন বেপারি রহমত আলী। তিনি ৬–৭ বছর ধরে এই বাজারে গরু আনছেন। এ পর্যন্ত ১৬টি গরু বিক্রি করেছেন।
একই কথা বললেন পাবনা থেকে আসা মো. মোস্তাফিজ। তিনি ১৩টি গরুর মধ্যে ৭টি বিক্রি করেছেন।

এই দুটি বাজার ছাড়াও নগরীর স্থায়ী গরুর বাজার বিবিরহাট ও অন্যান্য বাজারেও ভালো বেচাকেনা হচ্ছে বলে জানান ইজারাদাররা। বিবিরহাট বাজারের ইজারাদার জামশেদ খান বলেন, গতকাল এক থেকে দেড় হাজার গরু বিক্রি হয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত সোমবার থেকে ধীরে ধীরে কোরবানির পশুর বাজার জমে উঠেছে। ক্রেতা–বিক্রেতাদের ভিড়ে বাজার এখন জমজমাট। বেচাকেনায় ফিরেছে বাজারগুলো।
ক্রেতাদের দাবি, বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরু দামও বেশি চাইছেন বেপারিরা। বাজারে যেমন ছিল কোরবানির পশু, তেমনি ক্রেতাদেরও ভিড় ছিল। ক্রেতা আর পশুর ভিড়ে ঠেলে ট্রাকে ট্রাকে গরু আসতে দেখা যায়।
সাগরিকা বাজারে ইজারাদার সাইফুল হুদা জাহাঙ্গীর বলেন, সাগরিকা বাজার হচ্ছে দেশের একটি নামকরা বাজার। বিভিন্ন জেলার খামারি, বেপারি ও গরু লালন–পালনকারীরা কোরবানিতে এই বাজারের আসার জন্য উন্মুখ থাকেন। ক্রেতারাও সাগরিকা বাজার থেকে গরু কেনায় স্বাচ্ছন্দবোধ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, পাহাড়তলী, ফইল্যাতলীসহ আশপাশের এলাকায় অবৈধভাবে গরু বেচাকেনা চলছে। প্রশাসন অবৈধ গরু বাজার উচ্ছেদের প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
প্রতি বছরের ন্যায় এবারও নগরীর সবচেয়ে বড় গরুর এই বাজারে প্রচুর গরু এসেছে। আরও গরু আসছে। মূল বাজার ছাপিয়ে আশেপাশের মাঠ, খালি জায়গা, অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো ছোট ছোট বাজারে পরিণত হয়েছে। চারিদিকে গরু আর গরু।
টিন, ত্রিপল আর শামিয়ানা টাঙিয়ে যত্রতত্র বাজার বসেছে। চলছে খুঁটি বাণিজ্য। স্থানীয় প্রভাবশালী ও সন্ত্রাসীরা প্রভার খাটিয়ে ব্যবসায়ী ও বেপারিদের জিম্মি করে খুঁটি বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।
চট্টগ্রামে স্থানীয় লালন–পালনকারী ও খামারিদের গরু ছাড়াও রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, কুষ্টিয়াসহ উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাট–বাজারে গরু আনেন।
ডেক্সি, পাতিল, বালতি, চাল, ভূষি, খড়–খুটোসহ কয়েকদিনের রান্নাবান্নার সরঞ্জামাদি নিয়ে এসেছেন বেপারিরা।
আরও তিনদিন বাকি থাকায় অনেকেই দরদাম ও দেখাদেখিতে রয়েছেন। বাজার যাচাই–বাছাই করে গরুর কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কোরবানিরা। নগরবাসী মূলত দুই–তিন আগেই গরু কিনেন। কারণ নগরীতে গরু রাখার জন্য পর্যন্ত জায়গা নেই।
নগরীর বড় এ দুটি স্থায়ী গরু বাজার ছাড়াও সিটি কর্পোরেশন ৬টি অস্থায়ী পশুর হাটের অনুমোদন দিয়েছে। সবকটি হাটেই কোরবানির পশু বেচাকেনা চলছে।
