অবৈধ স্থাপনা গিলে খাচ্ছে কর্ণফুলী নদীকে : দুর্ভোগে নগরবাসী
জুবায়ের সিদ্দিকী :: বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে বলা হয় দেশের বানিজ্যিক রাজধানী। দেশের আমদানী-রপ্তানী ও বানিজ্যের অন্যতম প্রানকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। এই সমুদ্র বন্দরের প্রানপ্রবাহ হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। লুসাই পাহাড় থেকে উৎসারিত খরাস্রোতা পাহাড়ী নদী কর্নফুলী এখন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বেপরোয়া দখল-বেদখল, দুষণ ও ভরাটে বিপন্ন হয়ে উঠেছে কর্নফুলী নদী। এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের উপর। জলাবদ্ধতায় ভুগছে নগরবাসী। কর্নফুলীর মোহনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সীমানার আশপাশে ও বাইরে নদীকে গিলে খাচ্ছে ২ হাজার অবৈধ বাড়িঘর ও স্থাপনা। দখলদারের তালিকায় রয়েছে ক্ষমতাসীন ও সহযোগী সংগঠনের ভুমিদস্যুদের সিন্ডিকেট।
এসব অবৈধ স্থাপনার সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরী করা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে উচ্ছেদ কার্যক্রম। চাপা পড়েছে উচ্ছেদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সরকারী প্রশাসনের আশ্বাস ও পরিকল্পনা। কর্নফুলী নদীর উভয় তীরকে ঘিরে চলছে ভরাট ও নদী দখলের প্রতিযোগিতা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কর্নফুলী নদী তীরবর্তী ১৫৮ দশমিক ৪৫ একর ভুমিতে অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে। এ জমির আনুমানিক বাজার মুল্য অন্তত ৩৪০ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ চলাচলের চ্যানেল ঘেঁসে কর্নফুলী নদীর মোহনায় বিস্তীর্ণ ভুমি বেদখল হয়ে আছে। গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। কর্নফুলীর উভয় তীরের অবৈধ দখল হওয়া জমি উদ্ধার করে অচিরেই সরকারের আয়ত্তে আনার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা বলা হলেও এখন কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।
অপরিকল্পিতভাবে বালি তোলার কারনেও নদীর স্বভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাক্তাই রাজাখালী, চর পাথরঘাটা, সিডিএ মাট এলাকার কাছে নতুন চলের জমির দাবীদার সেজে, আবার কেউ নদীর বালি তুলে ডুবোচর ভরাট করে কর্নফুলী দখলে মেতে উঠেছে। এসব নিয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রান সহ নিত্যনতুন অপরাধমুলক কর্মকান্ড প্রকাশ্যে মাথাচাড়া দিয়েছে।
নদীর উভয় তীরে কমপক্ষে ৫শ ছোট-বড় শিল্প কারখানা, প্লান্ট, অবৈধ ডক জেটি-ইয়ার্ড, দেশি বিদেশি জাহাজ কোস্টার নৌযান ট্রলারের বিষাক্ত বর্জ্য ময়লা জঞ্জাল ও আবর্জনার ভাগাড়ে পরিনত হয়েছে কর্নফুলী নদী। নৌ চলাচললের মুল চ্যানেল, বহির্নোঙ্গরসহ সমগ্র বন্দর এলাকায় অব্যাহত দুষনে চলছে শোচনীয় অবস্থা। ক্রমেই বিষিয়েউঠেছে কর্নফুলী নদী। নদীর পানির স্বাভাবিক রঙ, গন্ধ ও স্বাদ আর নেই। ৬০ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত চট্টগ্রাম নগরী ও শহরতলীর বিশাল অংশের নগর বর্জ্য সরাসরি গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলীতে।
বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এ নদীর হাজারো জীববৈচিত্র্য। এককালে হরেক প্রজাতির চিংড়িসহ সুস্বাদু মাছের খনি কর্ণফুলী নদী এখন বলেতে গেলে প্রায় মাছ শুন্য হয়ে পড়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সুত্র জানায়, একসময় কর্ণফুলী নদীতে মিঠা পানির ৬৬ প্রজাতির, মিশ্র পানির ৫৯ প্রজাতির এবং সামুদ্রিক পরিযায়ী ১৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। ভয়াবহ দুষনের কারনে মিঠা পানির অন্তত ২৫ প্রজাতির এবং মিশ্রপানির ১০ প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তপ্রায়। এ ছাড়া আরও ১০ থেকে ২০ প্রজাতির অর্থকরী মাছ বিপন্ন। ডলফিন শুশক সহ বিভিন্ন জলজ প্রানী হারিয়ে যাওয়ার সম্মুখীন।
কর্নফুলী নদী নিয়ে গবেষকরা বলেন,দেশের অন্য কোন নদনদীর তুলনায় কর্নফুলীর রয়েছে আলাদা ভু-প্রাকৃতিক অবস্থান ও বিছু বৈশিষ্ট্য। এসব দিক অটুট রেখে কর্নফুলী রেখে কর্নফুলী রক্ষার জন্য নদীর তীররেখা চিহ্নিত করা এবং তীর বাঁধানো প্রয়োজন। কর্নফুলী বাঁচলেই চট্টগ্রাম বন্দর বাঁচবে। নদীর উভয় তীরে নগরায়নের ধারা, ব্যবসা বানিজ্য ছাড়াও হাজার বছর ধরে মানবসভ্যতা বিকশিত হয়েছে। মাথা উঁচু করে দায়িড়েছে বানিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। কাপ্তাইয়ে রয়েছে পানিবিদ্যুৎ মহাপ্রকল্প। নদীটির দুই তীরজুড়ে ৭৫ লাখ মানুষের বাস।
বিস্তার লাভ করেছে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ, মাঝিরঘাট, সরঘাটসহ বিশাল সওদাগরী পাড়া। সভ্যতার মেলা। প্রকৃতির অপার দান কর্ণফুলী। এ নদীটি মানুষকে সবই দিয়েছে উদারভাবে। কিন্তু সেই নদী দিন দিন ভরা যৌবহন হারিয়ে ফেলছে। তাই কর্নফুলী নদীর সুরক্ষায় নমন্বিতভাবে ও কার্যকর উদ্যোগ সময়ের দাবী। একদিকে প্রভাবশালী ভুমি দস্যুরা গ্রাস করে নিচ্ছে নদীতীরের জমি, পলি ভুমি, সদ্য জেগে ওঠা চর, তলদেশের বালি-মাটি। আর অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৪ টি খাল দিয়ে আবর্জনা নিস্কাশন, ৫শ কল কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও শত শত জাহাজের তেলবর্জ্য বা পোড়াতেল নি:সরনের কারনে কর্নফুলী পরিনত হয়েছে অঘোষিত এক ভাগাড়ে। বিষিয়ে উঠছে নদীর পানি। বাড়ছে লবনাক্ততার মাত্রা।
এহেন নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালে হাইকোর্ট কর্তৃক জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ রাজস্বের যোগানদাতা কর্নফুলী নদী সুরক্ষায় কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়। নদীজুড়ে দখল, মাটি ভরাট ও যে কোন ধরনের স্থাপনা নির্মান বন্ধ রাখার জন্য সরকারের প্রতি এবং কর্নফুলী নদীর প্রকৃতক সীমানা নির্ধারন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচলাক ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি কর্নফুলী সুরক্ষা সংক্রান্ত সুর্নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো আজ অবধি পরিপুরন করা হয়নি।
কর্নফুলীর বুক প্রতিনিয়ত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বন্দরের লাইটারেজ জেটির ঘাট ও বার্থিও মুরিংয়ের পয়েন্টগুলো প্রতিনিয়ত নদীর বুকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, অর্থাৎ সংকুচিত হয়ে আসছে। নাব্যতা ও গতিপথ রক্ষায় নদীশাসন, নিয়মিত ড্রেজিং ও দুষনরোধ জরুরী হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা উপেক্ষিত। বরং জমির দাম বাড়ার সাথে সাথে চলছে ভরাট ও দখলের প্রতিযোগিতা। চওডায় ও গভীরতায় নদীটি ছোট হয়ে আসছে। পানিপ্রবাহ ও ধারনক্ষমতা হারিয়ে বর্ষায় কাদা পানির জোয়ারে ডুবে যাচ্ছে বন্দরনগরী এবং ব্যবসা-বানিজ্য ও শিল্পাঞ্চল।
এককালে বন্দরের কর্মব্যস্ত বন্দর এলাকা ওমরআলী ঘাট, অভয়মিত্র ঘাট, মনোহরখালী মৎস্য অবতরন কেন্দ্র ও এর আশপাশে চর গেজে নদী ভরাট ও মরা বন্দরের রুপ নিয়ে সম্পুর্ন পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। জাপানি সহায়তায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ বছর আগে নির্মিত মহোরখালী মৎস্য অবতরনকেন্দ্রে এখন আর মাছের ট্রলার নৌকা ভিড়তে পারে না। বন্দরের মুল ১নং জেটি অতিক্রম করে ক্রমেই পলিবালির আস্তর বিস্তার লাভ করেছে। কর্নফুলী নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ পুর্বাঞ্চল তথা পাহাড়ি অববাহিকার একটি প্রধান নদী। আসামের পাহাড় থেকে ২৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর উৎপত্তি। ভারতেক এর বিস্তৃতি খুবই কম। এ নদীর মোহনায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর সুবিধা গড়ে উঠেছে।
চট্টগ্রাম মাহনগরীকে অর্ধচন্দ্র আকারে বেষ্টন করে রেখেছে কর্নফুলী নদী। তীরজুড়ে বিস্তিীর্ন ভু সম্পত্তির মালিক চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিগত ১/১১ সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বন্দর ও বিভিন্ন প্রশাসন কর্তৃক অবৈধ দখলদারদের কঠোরভাবে উচ্ছেদের ফলে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা মুল্যের জমি উদ্ধারে যে সাফল্য আসে তারও কিছু কিছু ফের বেদখল হয়ে গেছে। বন্দরের মুল্যমান জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। জোরারে প্লাবিত ভুমি থেকে ৫০ গজ দুর পর্যন্ত পোর্ট লিমিট হিসেবে গন্য করা হয়। সেখানে কৃর্তপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোন স্থাপনা নির্মান বেআইনি। কিন্তু গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। নদীর গতিপথ বদল ও নদী ভাঙ্গনের সাথে মিল রেখে সঠিক ও নিয়মিতভাবে তীরভুমি রেখা চিহ্নিত করা হয়নি। এর পুরো সুযোগ নিচ্ছে ভুমিগ্রাসী চক্র। আবার অনেকে অনুমোদনের আড়ালে জায়গা বাড়িয়ে অবৈধ কাঠামো বানাচ্ছে। রায় ঘোষনার ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো উচ্ছেদ কার্যক্রম শরু হয়নি।
প্রশাসনের নজরদারির অভাবে কর্নফুলী নদীর অবৈধ দখল থামছে না বলে দাবী পরিবেশবাদীদের। তাদের অভিযোগ, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও চলছে নতুন দখল। প্রশাসনের দুর্বলতার কারনে দখলকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ২০১১ সালের জুলাই মাসে নদী ড্রেজিং শরু করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। নৌ পরিবহনমন্ত্রী মো: শাহজাহান খান ড্রেজিং কাজের উদ্বোধন করেন। ২০১৩ সালের মার্চ মাস থেকে বন্ধ হয়ে যায়। কর্নফুলী নদীর ডেজিং কাজ বন্ধের পর দখলদারিত্ব চলে আসছে। অবৈধ দখলদার ও ভুমিখেকোদের জন্য ড্রেজিং প্রকল্প আর্শিবাদ হয়ে দাঁড়ায়। গেল ৫-৬ বছর ধরে নতুন নতুন এলাকা দখল হচ্ছে। বন্দর বাঁচাতে হলে কর্নফুলী নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিকল্প নেই।
উপরন্তু বন্দরের বিরুদ্ধেও রয়েছে নদীর তীর দখল করে মৎস্য অবতরন কেন্দ্র নির্মানের অভিযোগ। জেলা প্রশাসন ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নজরদারীর অভাবে অবৈধ দখলদারদের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ২০১৫ সালের রিটের প্রেক্ষিতে ৫ বছর পর জেলা প্রশাসন ২ হাজার ১৮৭ টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে। গত বছরের ১৬ আগষ্ট কর্নফুলীর অবৈধ স্থাপনা অপসারনের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। উচ্ছেদের জন্য আদালত ৯০ দিন সময়সীমা বেঁধে দেন। রায়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কে অবসারনের ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দিয়েছেন। তদুপরিও কোন তৎপরতা নেই এসব সংস্থার।
