জেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরগরম চন্দনাইশ

0

মো. দেলোয়ার হোসেন, চন্দনাইশ : দেশে প্রথম বারের মত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জেলা পরিষদ নির্বাচন। আগামী ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হওয়ায় সরগরম হয়ে উঠেছে চন্দনাইশ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার, মহিলা মেম্বারদের নিকট তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। সে সাথে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে উর্দ্ধতন নেতৃবৃন্দের কাছে।

ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। ঐ সময় নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান সহ পূর্ণাঙ্গ পরিষদ গঠনের কথাও সরকারের শীর্ষ মহল থেকে বলা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ ছিল না। গত ২৭ জুলাই জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে ছয় মাসের মধ্যে জেলা পরিষদ নির্বাচন দেয়ার ঘোষণা দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেন। এ সময় জেলা পরিষদ আইনটিও সংশোধনের কথা বলেন তিনি। গত আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সীমানা নির্ধারণ করে তালিকা প্রকাশ করেছিল জেলা প্রশাসন। এতে ১৫ ওয়ার্ড ও ৫টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়েছিল।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মিরসরাই উপজেলায় ২টি পৌরসভা, ১২টি ইউনিয়নকে নিয়ে ১নং ওয়ার্ড, একই উপজেলার মায়ানী, হাইতকান্দি, ওয়াহেদপুর, শাহেরকালি ইউনিয়কে সীতাকুন্ড উপজেলার সাথে যুক্ত করে ২নং ওয়ার্ড, সন্দ্বীপ উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নকে নিয়ে ৩নং ওয়ার্ড, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৪১ ওয়ার্ডের সাথে হাটহাজারী উপজেলার মেখল, গড়দুয়ারা, উত্তর মাদার্শা, ফতেহপুর, চিকনদন্ডী, দক্ষিণ মাদার্শা, শিকারপুর, বড়িশ্চড়ি ইউনিয়নকে যুক্ত করে ৪নং ওয়ার্ড, হাটহাজারী পৌরসভা ও বাকী ইউনিয়নের সাথে ফটিকছড়ির সুয়াবিল, ভক্তপুর, জাফতনগর, ধর্মপুর, সমিতিরহাট, আবদুল্লাহপুরকে ৫নং ওয়ার্ড, ফটিকছড়ির ২টি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নকে ৬নং ওয়ার্ড গঠন করা হয়েছে।
রাউজান পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে ৭নং ওয়ার্ড, রাঙ্গুনিয়া পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়নকে নিয়ে ৮নং ওয়ার্ড, বোয়ালখালী পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নের সাথে পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ, ধলঘাট, কেলিশহর, কুলাগাঁও, দক্ষিণ ভুর্ষিকে নিয়ে ৯নং ওয়ার্ড, পটিয়া পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে ১০নং ওয়ার্ড, চন্দনাইশ পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়নের সাথে পটিয়া উপজেলার ছনহরা, কচুয়াই, খরনা, শোভনদন্ডী ইউনিয়নকে যুক্ত করে ১১নং ওয়ার্ড, আনোয়ারা উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের সাথে বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া, সাধনপুর ইউনিয়কে ১২নং ওয়ার্ড, বাঁশখালী পৌরসভা ও অপর ১২ ইউনিয়নকে নিয়ে ১৩নং ওয়ার্ড, সাতকানিয়া পৌরসভা ও ১৭ ইউনিয়নের মধ্যে ১৩টি ইউনিয়নকে ১৪নং ওয়ার্ড, লোহাগাড়া উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন ও সাতকানিয়া উপজেলার সোনাকানিয়া, ছদাহা, কেওচিয়া, বাজালিয়া ইউনিয়নকে নিয়ে ১৫নং ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি তিন ওয়ার্ডকে সংযুক্ত করে ৫টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদ হবে ২১ সদস্যের। যার মধ্যে ১ জন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য, ৫ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠন করা হবে। চেয়ারম্যান ও ঐ ২০ জন সদস্যকে নির্বাচন করবেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে একটি স্তর। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ) ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের অনুরোধে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আয়োজন করে থাকে। এক্ষেত্রে এ সকল জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কেউ প্রার্থী হতে চান, তাহলে তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করে প্রার্থী হতে পারবেন। তবে পদে থেকে কেউ প্রার্থী হতে পারবে না বলে আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ সংশোধন অধ্যাদেশ-২০১৬ এ এমপিও যদি কেউ নির্বাচন করতে চান, তাদেরকেও পদত্যাগ করে নির্বাচন করতে হবে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদকে ১৫টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগে ১ জন সদস্য, প্রতি তিনভাগে ১ জন সংরক্ষিত সদস্য নির্বাচিত হবেন।
আইনের ১০(ক) ধারামতে জেলা পরিষদের কোন সদস্য ফৌজদারী মামলায় চার্জশীট প্রাপ্ত হলে, গ্রেফতার হলে, তার নামে ওয়ারেন্ট জারী হলে তিনি বরখাস্ত হবেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে এ বরখাস্তের কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে। জেলা পরিষদ হবে ২১ সদস্যের। যার মধ্যে ১ জন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য ও ৫ জন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য। তিন পার্বত্য জেলায় ১৯৭৯ সালে একবারই সরাসরি নির্বাচন হয়েছিল। এ সকল পার্বত্য জেলা বাদে দেশের ৬১টি জেলায় জেলা পরিষদে একযোগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের শাসন আমলে প্রণীত স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইনে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে সরকার কর্তৃক নিয়োগ দেয়ার বিধান ছিল। পরে আইনটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। ২০০০ সালে তৎকালীন আ’লীগ সরকার নির্বাচিত জেলা পরিষদ গঠনের জন্য নতুন আইন তৈরি করে। পাঁচ বছর মেয়াদী জেলা পরিষদ গুলোতে বর্তমানে অনির্বাচিত প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছে। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন নভেম্বরের মাঝামাঝি তফসিল ঘোষনা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। স্থানীয় সরকারের চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬৭ হাজার নির্বাচিত প্রতিনিধি এ নির্বাচনে ভোট দেবেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার ইউনিয়ন পরিষদে। দেশে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা সাড়ে ৪ হাজার। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে গড়ে ১৩ জন করে প্রায় ৬০ হাজারের অধিক প্রতিনিধি রয়েছে। ৪৮৮টি উপজেলা পরিষদে দেড় হাজার, ৩২০টি পৌরসভায় সাড়ে ৫ হাজার, ১১টি সিটি কর্পোরেশনে প্রায় সাড়ে ৫শ নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছে। নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশের যেকোন ভোটার জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারলেও ভোট দিতে পারবে না। জনপ্রতিনিধিরা ভোটার হলেও প্রার্থেী হতে পারবে না। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদে দলীয়ভাবে ভোট হলেও উপজেলা পরিষদের ন্যায় জেলা পরিষদে তা দলীয়ভাবে হচ্ছে না।
আগামী ২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে জেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী প্রথম বারের মত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জেলা পরিষদ নির্বাচন। স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সব প্রার্থীই থাকছেন স্বতন্ত্র। সংশোধিত জেলা পরিষদের আইনে দলীয় মনোনয়নের সুযোগ নেই। নির্দলীয় প্রতীকে হবে নির্বাচন। অনেকটা উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচনের আদলেই এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কোন ভোটার প্রার্থী হতে পারবেন না। ১৫টি ওয়ার্ডে ১৫টি কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সে হিসেবে প্রতিটি উপজেলায় ভোট কেন্দ্র থাকবে।
অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিল: নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিতব্য জেলা পরিষদের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র সরাসরি বা অনলাইনে দাখিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যে কোন প্রার্থী নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ওয়েবসাইটে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারবে। এক্ষেত্রে প্রার্থী প্রথমে ইসি সচিবালয়ের ওয়েবসাইটের লিংকে প্রবেশ করবেন। পরে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্ম তারিখ, বিভাগ, জেলা, উপজেলার নাম এন্ট্রি করে নিবন্ধন করবেন। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রার্থী সাথে সাথেই একটি ইউজার নেইম ও পাসওয়ার্ড পাবেন। প্রাপ্ত ইউজার নেইম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করার পর সংশ্লিষ্ট যেকোন পদের মনোনয়ন ফরম পাওয়া যাবে। প্রার্থী অনলাইনে সংশ্লিষ্ট মনোনয়নপত্রটি পূরণ করবেন। মনোনয়নপত্র ফরমটি পূরণ সম্পন্ন হওয়ার পর পূরণকৃত তথ্যাদি সঠিক আছে কিনা তা যাচাই করে পূরণকৃত মনোনয়ন ফরমটি প্রিন্ট করে সংশ্লিষ্ট স্থানে প্রস্তাবকারী, সমর্থনকারী ও প্রার্থীর স্বাক্ষর প্রদান করবেন। স্বাক্ষরিত মনোনয়ন ফরম, জামানতের প্রমাণ স্বরূপ ট্রেজারী চালান, হলফনামা সম্পর্কিত প্রত্যয়নপত্র সহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি যথাযথ স্থানে স্বাক্ষর করার পর স্ক্র্যানিং করে পিডিএফ আকারে দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনলাইনে মনোনয়ন ফরম দাখিলের পর প্রার্থীর প্রদত্ত মোবাইল ফোনে সক্রিয়ভাবে এসএমএসের মাধ্যমে দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। রিটার্নিং অফিসার অনলাইনে প্রাপ্ত প্রত্যেকটি মনোনয়ন লিপিবদ্ধ করে ক্রমিক নম্বর প্রদান করবেন। অনলাইনে দাখিলকৃত মনোনয়নপত্র সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্রাদির মূলকপি মনোনয়ন পত্র বাছাইয়ের নির্ধারিত দিনে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করবেন। অনলাইনে একজন প্রার্থী একাধিক মনোনয়ন ফরম দাখিল করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি একাধিক মনোনয়ন ফরম দাখিল করলে রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক প্রাপ্ত প্রথম মনোনয়ন ফরম ব্যতিত অন্যান্য সকল মনোনয়ন ফরম বাতিল বলে গণ্য হবে।
নির্বাচন পরিচালনা বিধি অনুযায়ী জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ১ জন প্রার্থী ৫ লাখ টাকার বেশী ব্যয় করতে পারবে না, ব্যক্তিগত খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা, সদস্য ও সংরক্ষিত পদে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা খরচ করা যাবে, ব্যক্তিগত খরচ ১০ হাজার টাকা। জামানত হিসেবে চেয়ারম্যান পদে ৫০ হাজার টাকা, সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কোন প্রার্থী দুর্নীতি বা নির্বাচনী অপরাধ করলে ৭ বছরের সাজার বিধান রাখা হয়েছে। সে সাথে আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা ৬ মাসের কারাদন্ড বা উভয়দন্ডে দন্ডিত করার বিধান রাখা হয়েছে।
জেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠেছে। ২৮ ডিসেম্বর জেলা পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পর মাঠে নেমে পড়েছে আ’লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। সে সাথে এলাকা ভিত্তিক সদস্য ও মহিলা সদস্যরাও চষে বেড়াচ্ছে। তবে মাঠে নেই বিএনপি এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরা। বিএনপি ও এলডিপি নেতৃবৃন্দরা জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে এখনো পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা করছে না বলেও জানা গেছে।

এ বিভাগের আরও খবর
আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.